বিদ্যুৎ বিভাগ বাড়তি বিল করে—এ অভিযোগ কমবেশি সব সময়ই ছিল। করোনা সংকটের সময় সেটি আরও বেড়েছে। এর কারণ, করোনার সময় সরবরাহ প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে আবাসিক ভবনে গিয়ে মিটার পরীক্ষা করার সুযোগ ছিল না। যৌক্তিক কারণেই আবাসিক ভবনের বাসিন্দারা সেটি অনুমোদন করেননি।

এই প্রেক্ষাপটে বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে বলা হয়েছিল, করোনাকালে কারও বিদ্যুৎ বিল বকেয়া পড়লে সে জন্য জরিমানা বা অতিরিক্ত মাশুল দিতে হবে না। ৩০ জুনের মধ্যে বিল পরিশোধ করলেই হবে। মার্চ ও এপ্রিল মাসের বিলে কোনো অসংগতি থাকলে মে মাসের বিলে তা সমন্বয় করা হবে। বাস্তবে সেটি করা হয়নি বলেই গ্রাহকদের কাছ থেকে বহু অভিযোগ এসেছে।

কর্তৃপক্ষ অবশ্য দাবি করেছে, তারা কোনো ভুতুড়ে বা বাড়তি বিল করেনি। করোনাকালে মানুষ বেশি সময় ঘরে থেকেছে বলে বিদ্যুৎ ব্যবহার বেশি করেছে। এ জন্য বিলও বেশি হয়েছে। কিন্তু ঢাকা ও ঢাকার বাইরের বিভিন্ন স্থানে খাঁজখবর নিয়ে যেসব তথ্য পাওয়া গেছে, তাতে কর্তৃপক্ষের যুক্তি ধোপে টেকে না।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ অবশ্য বলেছেন, পাঁচ লাখ গ্রাহক অযৌক্তিক বিল পেয়েছেন। বিদ্যুৎ বিতরণকারী কর্তৃপক্ষ তা ঠিক করার কাজ করছে। গড় বিল করতে গিয়ে এ ভুল হয়েছে।

ঢাকার সার্কুলার রোডের একজন বাসিন্দার অভিযোগ, করোনার আগে যেখানে তাঁর গড়ে ১ হাজার ৮০০ টাকা বিল আসত, সেখানে গত তিন মাসে বিল এসেছে তিন গুণ। বেসরকারি সংস্থার একজন কর্মকর্তা বলেছেন, তিনি প্রিপেইড গ্রাহক হওয়া সত্ত্বেও এক মাসে তাঁর মিটার পরীক্ষা না করেই ১ হাজার ২০০ টাকা বিল করা হয়েছে। চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার বাসিন্দা মোহান্মদ হানিফ জানিয়েছেন, গত তিন মাসে কর্তৃপক্ষ তাঁর বাসাবাড়ির বিল নির্ধারণ করেছে ১১ হাজার ৪৯২ টাকা। একটি উপজেলা সদরের একজন বাসিন্দা মাসে প্রায় চার হাজার টাকার বিদ্যুৎ ব্যবহার করবেন, এটা বাস্তব নয়।

ঢাকার বাসিন্দাদের জন্য বিদ্যুৎ সরবরাহ করে থাকে ঢাকা ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেড (ডেসকো) এবং ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ডিপিডিসি) এবং গ্রামাঞ্চলে পল্লী বিদ্যুৎকেন্দ্র (বিইআরসি)। তিনটি সংস্থাই গ্রাহকসেবাকেন্দ্র বাড়িয়েছে। আবার ভুতুড়ে বিল করার অভিযোগও বেড়েছে। তাহলে বাড়তি সেবাকেন্দ্র করে লাভ কী হলো?

সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, সরকারের সঙ্গে চুক্তির ভিত্তিতে বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাগুলো কাজ করে থাকে এবং একটি লক্ষ্যমাত্রাও ধরা থাকে। অর্থ বছরের শেষ দিকে এসে সংস্থাগুলো ঘাটতি মেটাতে গ্রাহকদের ওপর বেশি বিল চাপিয়ে দেয়। হয়রানির আশঙ্কা ও প্রতিকার না পাওয়ার হতাশা থেকে অনেক গ্রাহক আপত্তি করেন না। ফলে ভুতুড়ে বিল করেও সংস্থাগুলো মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেয় গ্রাহকদের কাছ থেকে। এটি খুবই উদ্বেগজনক। সংস্থার ঘাটতির দায় গ্রাহকদের ওপর চাপানো, এ কৌশল থেকে সরে আসতে হবে।

স্বাভাবিক সময়ে ভুতুড়ে বিল হলে গ্রাহক অফিসে গিয়ে দেনদরবার করতে পারেন। কিন্তু এই সময়ে তা কঠিন। কিন্তু এরপরও লোকজনকে বিদ্যুৎ অফিসে হাজির হয়ে এ নিয়ে দেনদরবার করতে হচ্ছে। গ্রাহকদের যত দ্রুত সম্ভব এ ভোগান্তি থেকে মুক্তি দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী যেহেতু পাঁচ লাখ অযৌক্তিক বিলের কথা স্বীকার করেছেন, তাই বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়ে এসব বিল স্থগিত করতে হবে। জনগণের দুর্ভোগ ও দুশ্চিন্তা দূর করতে এর বিকল্প নেই।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0