default-image

সরকারি বিপণন সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) গতকাল বৃহস্পতিবার থেকে সয়াবিন তেলের দাম লিটারপ্রতি ১০ টাকা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছে। এ নিয়ে সংস্থাটি গত দুই মাসে এই নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের দাম দুই দফায় মোট ২০ টাকা বাড়িয়ে দিল। দুই মাস আগে এক লিটার সয়াবিন তেল টিসিবির কাছ থেকে কেনা যেত ৮০ টাকায়; এখন তা কিনতে হবে ১০০ টাকায়। কেজিপ্রতি চিনির দামও ৫ টাকা বাড়ানো হয়েছে। এর আগে সংস্থাটি মসুর ডাল ও পেঁয়াজের দামও বাড়িয়েছে। এক বছরের বেশি সময় ধরে চলমান কোভিড-১৯ মহামারির নেতিবাচক প্রভাবে মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় যে বাড়তি আর্থিক চাপ সৃষ্টি হয়েছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে সরকারি তরফে এসব ভোগ্যপণ্যের দাম এমনভাবে বাড়ানোর সিদ্ধান্ত অসমীচীন ও অগ্রহণযোগ্য। জাতীয় দুর্যোগের কালে সরকারের এমন অসংবেদনশীল সিদ্ধান্তে জনমুখিতার বিপরীত অবস্থানের প্রতিফলন ঘটেছে।

প্রথম আলোর পক্ষ থেকে দাম বাড়ানোর কারণ জানতে চাওয়া হলে টিসিবির একজন মুখপাত্র বলেছেন, খোলাবাজারে এসব পণ্যের দাম এখন বেশি, তাই টিসিবি ‘মূল্য সমন্বয়’ করতে গিয়ে দাম বাড়িয়েছে; অন্যথায় টিসিবির পণ্য নিয়ে ‘অসাধু কাজ’ হওয়ার আশঙ্কা থাকে বলে তিনি মন্তব্য করেছেন। টিসিবির মুখপাত্রের এই ব্যাখ্যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। মুক্তবাজার অর্থনীতির এই দেশে খোলাবাজারের অনিয়ন্ত্রিত আচরণের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সরকারি বিপণন সংস্থাকে চলতে হবে—এই যদি হয় সরকারি দৃষ্টিভঙ্গি, তাহলে এমন সংস্থা থাকার প্রয়োজন কী? বরং আমরা মনে করি, দেশে যখন দুর্যোগ চলছে, যখন মানুষের আয়-রোজগার কমে গেছে, তখন তাদের আর্থিক চাপ যাতে যথাসম্ভব লাঘব হতে পারে, সেই লক্ষ্যে প্রধান ভোগ্যপণ্যগুলোর দাম কম রাখার জন্য দরকার প্রয়োজনে ভর্তুকি দেওয়া।

বিজ্ঞাপন

দ্বিতীয়ত, খোলাবাজারের তুলনায় টিসিবির পণ্যের দাম কম রাখাই যখন সরকারি উদ্যোগে ভোগ্যপণ্য বিপণনের মূল লক্ষ্য, তখন তো টিসিবিকেই নিশ্চিত করতে হবে যেন তাদের পণ্য নিয়ে ‘অসাধু কাজ’ না হয়। বাজারের তুলনায় অপেক্ষাকৃত কম মূল্যে টিসিবির পণ্য বিক্রি হলে সেই পণ্য কালোবাজারে বেচাকেনা হবে, তা যাতে হতে না পারে, সে জন্য টিসিবির পণ্যের দাম বাড়িয়ে ‘মূল্য সমন্বয়’ করতে হবে—এটা একটা অক্ষম, খোঁড়া যুক্তি। টিসিবির এভাবে দায়িত্ব এড়ানোর সুযোগ নেই। টিসিবিকে জনস্বার্থে স্বল্পমূল্যেই ভোগ্যপণ্য বিক্রি করতে হবে এবং তাদের পণ্য নিয়ে সব ধরনের ‘অসাধু কাজের’ সুযোগ বন্ধ করতে হবে। এই কাজে ব্যর্থ হলে তাদের শাস্তির পদক্ষেপ নিশ্চিত করতে হবে।

তৃতীয়ত, রমজানের আগে এসে সরকারি সংস্থার ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়ানোর ফলে বাজারে ওই সব পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ার যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, সরকারকেই সেই শঙ্কা দূর করার উদ্যোগ নিতে হবে। এমনিতেই ভোগ্যপণ্যের বাজারে সিন্ডিকেটগুলোর কারসাজির অভিযোগ থাকে, রমজান মাসে তাদের দৌরাত্ম্য আরও বেড়ে যায়। এই পরিস্থিতিতে টিসিবির পণ্যের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্তের ফলে বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি হতে পারে। মহামারির মধ্যে এটা হবে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘায়ের শামিল।

তা ছাড়া কোভিড-১৯ মহামারির অভিঘাতে বিপুলসংখ্যক মানুষের আয়-রোজগার কমে গিয়ে দারিদ্র্য বেড়েছে; নতুন দরিদ্র জনগোষ্ঠীর তালিকায় কত মানুষ যুক্ত হয়েছে, তা সুনির্দিষ্টভাবে কেউ জানে না এবং এই নতুন দারিদ্র্যকরণ অব্যাহত আছে। এই বিপুলসংখ্যক মানুষের জন্য সরকারের বিদ্যমান সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিগুলো আরও বিস্তৃত করতে হবে, আরও অর্থ বরাদ্দ করতে হবে। তবে সে জন্য নতুন দরিদ্রদের সঠিক সংখ্যা ও তালিকা নিরূপণ করা একান্ত প্রয়োজন। জেলা-উপজেলা পর্যায়ে সরকারি প্রশাসন ও স্থানীয় সরকারের সম্মিলিত উদ্যোগে তাদের সম্পর্কে একটি তথ্যভান্ডার গড়ে তোলা এখনই শুরু করা উচিত।

সম্পাদকীয় থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন