২০১৭ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদে দ্বিতীয় মেয়াদে নিয়োগ পাওয়া অধ্যাপক আবদুস সোবহানের বিরুদ্ধে প্রথম মেয়াদেই অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ ছিল। কিন্তু এবার অনিয়ম ও দুর্নীতির মাত্রা এতটাই প্রকট যে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬৩ জন শিক্ষক প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাছে তাঁর বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ করেছেন। এই শিক্ষকেরা ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সমর্থক। তাই এ কথা বলার সুযোগ নেই যে বিএনপি ও জামায়াতের শিক্ষকেরা তাঁর ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আবদুস সোবহান রোববার সংবাদ সম্মেলন করে তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগকে ‘তুচ্ছ’ বলে উড়িয়ে দিতে চেয়েছেন। এসব অভিযোগের যদি ভিত্তিই না থাকে, তাহলে তিনি ইউজিসির তদন্তকাজে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনকে (ইউজিসি) সহায়তা করলেন না কেন? উপাচার্য বলেছেন, তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ তদন্ত করার এখতিয়ার ইউজিসির নেই। ইউজিসি হলো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর তদারককারী প্রতিষ্ঠান। বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়ে থাকলে সেটি তদন্ত করার এখতিয়ার অবশ্যই তাদের আছে। দুর্বলতা আছে বলেই তিনি ইউজিসির গণশুনানিতে হাজির হননি।

বিজ্ঞাপন

উপাচার্যের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ এসেছে, তার মধ্যে গুরুতর হলো মেয়ে ও মেয়ের জামাতাকে শিক্ষক পদে নিয়োগ দিতে শিক্ষক নিয়োগের নীতিমালা শিথিল করা, নির্দিষ্ট বিভাগের স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী প্রার্থী থাকা সত্ত্বেও অন্য বিভাগের স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী নিয়োগ। নীতিমালা শিথিল করার পক্ষে তিনি অদ্ভুত যুক্তি দাঁড় করিয়েছেন। বিএনপির আমলে এসব শিক্ষার্থী এসএসসি ও এইচএসসিতে ‘কষ্ট করে’ পাস করেছেন। এর মাধ্যমে উপাচার্য কি স্বীকার করে নিলেন, আওয়ামী লীগ আমলে কষ্ট না করে সবাই এসএসসি ও এইচএসসি পাস করেছেন? বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বা অন্য কোনো পদে নিয়োগ করার ক্ষেত্রে একটি নীতিমালা থাকে। কোনো প্রার্থীবিশেষকে নিয়োগের জন্য তা শিথিল করা যায় না।

নিজের ক্ষমতা নিরঙ্কুশ করতে উপাচার্য আরও কিছু কূটকৌশলের আশ্রয় নিয়েছেন বলে অভিযোগ আছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে যোগ্য শিক্ষকদের বাদ দিয়ে নিজের পছন্দের লোকদের নিয়োগ দিয়েছেন। ইউজিসির এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন করার আগে উপাচার্যের আত্মজিজ্ঞাসা করা উচিত, তিনি যা করেছেন, তা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের লঙ্ঘন কি না। তাঁর এ স্বেচ্ছাচারী আচরণের কারণে অনেক বিভাগে অমেধাবীরা নিয়োগ পেয়েছেন এবং মেধাবীরা বঞ্চিত হয়েছেন। উপাচার্য ইউজিসির তদন্তকে একপেশে ও পক্ষপাতমূলক অভিহিত করে বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবি করেছেন। অনেক ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্তের প্রতি অনাস্থার কারণে বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবি করা হয়। কিন্তু উপাচার্যের তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ তদন্ত করেছে ইউজিসি। কোনো উপাচার্যের বিরুদ্ধে এটি তাদের প্রথম তদন্ত নয়। এর আগে অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বিরুদ্ধে ইউজিসি তদন্ত করেছে এবং তাদের সুপারিশ অনুযায়ী সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের মেয়াদ আছে মাত্র দুই মাস। এর মধ্যে বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবি করা সময়ক্ষেপণ ছাড়া কিছু নয়।

তাই ইউজিসির তদন্ত ও সুপারিশকে অগ্রাহ্য করার কোনো সুযোগ আছে বলে মনে হয় না। বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিমালা শিথিল করে যেসব নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, সেগুলো অবিলম্বে বাতিল করা হোক। কেননা, উপাচার্য যতই ক্ষমতাধর হোন না কেন, তিনিও আইনের ঊর্ধ্বে নন।

মন্তব্য পড়ুন 0