হয় বদল ঠেকাও, নয়তো বদলের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নাও—টিকে থাকতে হলে এটাই শেষ কথা। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব যেহেতু ঠেকানো যাচ্ছে না, সেহেতু টিকে থাকার প্রশ্নে শেষোক্ত পন্থা অনুসরণ করা অনস্বীকার্য। পরিবর্তিত প্রতিবেশের সঙ্গে কৃষি খাতকে খাপ খাওয়ানো এবং এই লক্ষ্য অর্জনে চাষাবাদে অভিনবত্ব আনা এখন সময়ের দাবি। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষিজমি লবণাক্ত হয়ে পড়ছে। তীব্র লবণাক্ততার কারণে রোপা আমন ধান এ অঞ্চলের একমাত্র ফসল। কিন্তু খুলনার কৃষি গবেষকেরা আমন ধান কাটার পরপরই সেখানে সূর্যমুখী চাষ সম্ভব—এমনটি হাতে-কলমে দেখিয়ে দিয়েছেন। এতে গোটা দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চলের চাষিরা নতুন সম্ভাবনা ও আশায় বুক বাঁধা শুরু করেছেন।

প্রথম আলোর প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, লবণাক্ত জমিতে কীভাবে একাধিক ফসল ফলানো যায়, তা নিয়ে গবেষণা করছিলেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মো. এনামুল কবীর ও বিধান চন্দ্র সরকার। শেষ পর্যন্ত তাঁরা প্রমাণ করেছেন, আমন ধান কেটেই ওই কর্দমাক্ত জমিতে সূর্যমুখী কিংবা গম চাষ করা সম্ভব। এর জন্য নতুন করে জমি চাষ দেওয়ার প্রয়োজন হবে না।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পরামর্শ মেনে দাকোপ উপজেলার স্থানীয় কয়েকজন চাষি আমন ধান কাটার পরপরই সূর্যমুখীর চাষ করছেন। লবণসহিষ্ণু ফসল সূর্যমুখীর ফলন ভালোই হয়েছে। এ অবস্থা দেখে স্থানীয় সব চাষির মধ্যেই সূর্যমুখী আবাদের বিষয়ে আগ্রহ দেখা গেছে।

চাষিরা বলছেন, সাধারণত আমন ধান কাটার সময় মাটি ভেজা থাকে। এতে সেখানে অন্য কোনো ফসল হয় না। জমি শুকিয়ে যেতে যেতেই মাটির লবণাক্ততার মাত্রা বেড়ে যায়। এ কারণে তখন কোনো ফসল চাষ করা সম্ভব হয় না। তবে সূর্যমুখীর চাষ তাঁদের নতুন করে আশার আলো দেখাচ্ছে। সূর্যমুখী এমন একটি ফসল, যার বড় হওয়ার ওপর মৌসুমের প্রভাব থাকে না। দেরিতে লাগালেও অসুবিধা হয় না। স্থানীয় গবেষকদের এই আবিষ্কার দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষির চেহারা বদলে দেবে বলে আশা করা যায়। যেখানে হাজার হাজার একর জমি বছরের একটি নির্দিষ্ট সময় বেকার পড়ে থাকত, সেখানে সেই সময়ে আরেকটি ফসল পাওয়া দেশের জন্য অনেক বড় ইতিবাচক খবর।

রাস্তাঘাট, বাড়িঘর নির্মাণ ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের কারণে একদিকে ফসলি জমি কমছে, অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে জমির উৎপাদন ক্ষমতা নষ্ট হচ্ছে। কিন্তু মানুষ বাড়ছে বলা যায় জ্যামিতিক গতিতে। এ অবস্থায় বিদ্যমান জমিতে সর্বোচ্চ উৎপাদন নিশ্চিত করা জরুরি। এ বিষয়ে খুলনার গবেষকেরা যে সাফল্য দেখিয়েছেন, তা প্রশংসার যোগ্য। দেশের অন্যান্য কৃষিজমিতে অধিক ফসল উৎপাদনের জন্য একই ধরনের গবেষণা চালানোয় জোর দেওয়া উচিত।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0