ইউরোপীয় পার্লামেন্টের মানবাধিকারবিষয়ক উপকমিটির একটি প্রতিনিধিদল সম্প্রতি ঢাকায় এসেছিল এ দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে তাদের উদ্বেগ তুলে ধরতে। সফর শেষে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ঢাকা দূতাবাস একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে, যার সারকথা হলো: বাংলাদেশে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে নাগরিকদের মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক অধিকার খর্ব করা চলবে না। অর্থাৎ নাগরিক স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক অধিকার বিসর্জন দিয়ে শান্তি-স্থিতিশীলতা নয়, বরং প্রথমটি অক্ষুণ্ন রেখেই দ্বিতীয়টি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। শান্তি-স্থিতিশীলতার মাশুল গণতন্ত্র নয়।
এ বক্তব্যের মধ্যে একটি বাস্তব পর্যবেক্ষণ আছে: এ দেশের শান্তি-স্থিতিশীলতা নষ্ট হয়ে গেছে এবং তা ফিরিয়ে আনার চেষ্টায় সরকারপক্ষ নাগরিক স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক অধিকার এমন মাত্রায় খর্ব করছে, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। চলমান রাজনৈতিক সহিংসতার বিরুদ্ধে জনমত প্রবল—এ কথা যেমন সত্য, তেমনই এটাও সত্য যে সরকার সব গণতান্ত্রিক রীতিনীতি ও সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা অগ্রাহ্য করে চলেছে।
সরকার প্রকাশ্যেই বলছে, তারা যেকোনো মূল্যে শান্তি-স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় সংকল্পবদ্ধ। এবং সেটা করতে গিয়ে হেন কোনো জবরদস্তিমূলক আচরণ নেই, যার আশ্রয় সরকার নিচ্ছে না। একটি জটিল ও সহিংস রাজনৈতিক সংকটকে অপরাধবৃত্তি বা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মতো করে দমন করতে গিয়ে সরকার নিজের সাংবিধানিক দায়িত্ব-কর্তব্য বিসর্জন দিচ্ছে। আচরণ করছে স্বৈরতান্ত্রিক পুলিশি ব্যবস্থার মতো। একদিকে প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলগুলোর সংবিধানপ্রদত্ত রাজনৈতিক অধিকার হরণ, অন্যদিকে তাদের নেতা-কর্মীদের পাইকারি গ্রেপ্তার, গণহারে মামলা ও তথাকথিত ‘বন্দুকযুদ্ধে’র নামে বিচারবহির্ভূত হত্যার মাধ্যমে সম্পূর্ণভাবে পর্যুদস্ত করার চেষ্টা চলছে। ফলে সংকট নিরসনের পরিবর্তে তা ক্রমেই আরও জটিল ও সহিংস হয়ে উঠছে।
বাংলাদেশের মানুষ অবশ্যই চলমান রাজনৈতিক সহিংসতা থেকে মুক্তি চায়। সরকারের চাওয়াও যদি তা-ই হয়, তবে তাকে অগণতান্ত্রিক, জবরদস্তিমূলক পন্থা ত্যাগ করতে হবে। রাজনৈতিক সংকট নিরসনের প্রয়াস নিতে হবে যথাযথ রাজনৈতিক পন্থায়।

বিজ্ঞাপন
সম্পাদকীয় থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন