যেখানে প্রত্যেক নাগরিকের জানমাল হেফাজত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব, সেখানে রাষ্ট্রীয় বাহিনী বা সংস্থার সদস্যরাই যদি গুমের কারণ হয়ে থাকেন, তার চেয়ে দুর্ভাগ্যজনক আর কী হতে পারে? সরকার যখন দাবি করছে কেউ গুম হচ্ছে না, তখন তার দায়িত্ব প্রতিটি নিখোঁজ ব্যক্তিকে খুঁজে বের করা।

বাস্তবতা হলো বাংলাদেশে গুম-অপহরণের ঘটনা ঘটে আসছে বহু বছর ধরে। কেবল আওয়ামী লীগ নয়, বিএনপি-জাতীয় পার্টির সরকারের আমলেও গুমের ঘটনা ঘটেছে। আমাদের যে রাজনৈতিক নেতারা বিরোধী দলে থাকতে গুম-অপহরণের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকেন, ক্ষমতায় গেলে তাঁরাই নিশ্চুপ হয়ে যান। কেন এই স্ববিরোধিতা? কখন কোন দল ক্ষমতায় আছে, তা দিয়ে মানবাধিকারের সংজ্ঞা নিরূপিত হয় না। মানবাধিকারের আন্তর্জাতিক যে মানদণ্ড আছে, সরকারকে তা মানতে হবে।

গভীর উদ্বেগের বিষয় হলো দেশের ভেতরে ও বাইরে মানবাধিকার সংস্থা, সংগঠন ও নাগরিক সমাজ গুমের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক প্রতিবাদ করলেও পরিস্থিতির উন্নতির কোনো লক্ষণ নেই। এর জন্য সরকারের স্বীকৃতির সংস্কৃতিও অনেকটা দায়ী। কোনো অপরাধের ঘটনা তখনই নিয়ন্ত্রণ বা রোধ করা সম্ভব, যখন তা স্বীকার করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়। গুমের ঘটনায় আমরা তিন ধরনের পরিণতি লক্ষ করি। কেউ কেউ গুম হওয়ার তিন-ছয় মাস পর ফিরে এলেও তাঁরা কোথায় ছিলেন, কীভাবে ছিলেন, সে সম্পর্কে কিছু বলেন না। গুম হওয়ার অনেক দিন পর কাউকে কাউকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে হাজির করার ঘটনা ঘটে। আবার কেউ একেবারেই ফিরে আসেন না। সব মিলিয়ে দেশে এক ভয়ের সংস্কৃতি বিরাজ করছে।

জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের গুমবিষয়ক ওয়ার্কিং গ্রুপের চিঠি প্রসঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এম এ মোমেন বলেছেন, তাদের চিঠির জবাব দেওয়া হবে। সেই সঙ্গে তিনি একটি অনভিপ্রেত মন্তব্যও জুড়ে দিয়েছেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, ‘আমরা এদের পাত্তা দিই বলে এরা পেয়ে বসেছে।’ এর মাধ্যমে তিনি যে বার্তা দিয়েছেন, তা খুবই বিপজ্জনক। বাস্তবতা হচ্ছে বাংলাদেশে গুম-অপহরণের ঘটনা ঘটছে বলেই বিদেশি সংস্থাগুলো বারবার বলার সুযোগ পাচ্ছে। সে ক্ষেত্রে সরকারের উচিত অস্বীকারের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে গুম বন্ধে কার্যকর ও টেকসই পদক্ষেপ নেওয়া। সরকার যদি এতই স্বচ্ছ হয়ে থাকে, তাহলে কেন তারা আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিদের তদন্ত করার অনুমতি দিচ্ছে না? প্রতিটি গুম-অপহরণ হওয়ার ঘটনার সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও স্বাধীন তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।

সম্পাদকীয় থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন