অন্যায়ের দায়মুক্তি বাঞ্ছিত নয়

সরকারি কর্মকর্তাদের জবাবদিহি

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্বশীলতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার কোনো ব্যবস্থা যদি থেকে থাকে, তবে তা আছে কাগজে-কলমে। বাস্তবে তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগের ব্যাপকতা লক্ষ করে প্রতীয়মান হয়, তাঁদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বিরাট ঘাটতি রয়েছে। জনপ্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি বড় অংশের মধ্যে অনিয়ম-দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহারসহ নানা অভিযোগ রয়েছে, কিন্তু সেগুলোর প্রতিকার হয় না বললেই চলে।

এ পরিস্থিতিতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ গত মঙ্গলবার আইন ও বিচার বিভাগের সচিবের কাছে একটি চিঠি পাঠিয়ে এমন একটি পুরোনো বিধানের প্রতিপালন নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে বলেছে, যেখানে সরকারি দায়িত্ব পালনসংক্রান্ত কাজের জন্য কোনো সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে সরকারের অনুমতি ছাড়া কোনো মামলা গ্রহণ করা যাবে না। যখন একশ্রেণির সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর অনৈতিকতার চর্চায় প্রশাসনযন্ত্র তথা সরকারের জনমুখিতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে, তখন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এই চিঠির তাৎপর্য কী হতে পারে, তা একটা প্রশ্ন বটে। পরিপ্রেক্ষিতটা জানা গেল সংবাদমাধ্যম থেকে। আইন ও বিচারসচিবের ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, সম্প্রতি দেখা যাচ্ছে, বিভিন্ন জেলার জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও অন্যান্য সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর সরকারি দায়িত্ব পালনের জন্য তাঁদের ব্যক্তিগতভাবে দায়ী করে মামলা দায়ের করা হচ্ছে। এতে আইনের ব্যত্যয় ছাড়াও মাঠপর্যায়ে শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষা ও অপরাধ প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থায় গ্রহণ প্রায়ই বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

কিন্তু মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ কি বাস্তবতার অন্য পিঠটার দিকে তাকিয়েছে? জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের কার্যালয়গুলোসহ জনপ্রশাসনের কোথায় ঘুষ-দুর্নীতি ‘ওপেন সিক্রেটে’ পরিণত হয়নি? এসব সরকারি কার্যালয় থেকে সেবাপ্রার্থী সাধারণ নাগরিকদের কাছে বার্তা চলে যায় যে উৎকোচ ছাড়া কোনো সেবা পাওয়া সম্ভব নয়; এমনকি অনেক ন্যায্য অধিকার থেকেও নাগরিকেরা বঞ্চিত হন, যদি সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পেছনে ‘উপরি’ খরচ করা না হয়। দৃষ্টান্তস্বরূপ, সরকার নাগরিকদের ভূমি অধিগ্রহণের বিনিময়ে তাঁদের অর্থ প্রদান করবে, কিন্তু মোটা অঙ্কের ঘুষ ছাড়া ভূমির মালিক সেই অর্থ হাতে পাবেন না—এমন ঘটনা সবার জানা বিষয়ে পরিণত হয়েছে। উপজেলা ভূমি অফিসগুলোর ঘুষ-দুর্নীতি সাধারণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে। এসবের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সরকারি কমকর্তা-কর্মচারীদের উপলব্ধিতেই থাকে না যে তাঁরা অন্যায় করছেন।

চলমান কোভিড-১৯ মহামারির সময়ে সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগে ‘দায়িত্ব- কর্তব্য’ পালনের নামে সরকারি কর্মকর্তাদের ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির যেসব ঘটনা দেশ-বিদেশের মানুষ প্রত্যক্ষ করল, সে বিষয়ে আমাদের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের বক্তব্য কী হতে পারে, তা আমরা জানি না। তবে আমরা নিশ্চিত যে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্বশীলতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার কার্যকর ব্যবস্থা থাকলে এসব ন্যক্কারজনক ঘটনা এমন মাত্রায় ঘটতে পারত না কিংবা সম্ভব হতো না। দৃষ্টান্তস্বরূপ, তিতাস গ্যাস করপোরেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বছরের পর বছর ধরে লাগামহীন অনিয়ম-দুর্নীতিতে লিপ্ত থাকা। যেদিন প্রথম আলোয় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের ওই চিঠির খবর ছাপা হয়েছে, সেদিনই প্রথম পাতায় ছাপা হয়েছে তিতাসের অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ে বিশদ প্রতিবেদন, ‘ঘুষে জ্বলে চুলা, বিল ভাগাভাগি’।

জবাবদিহি নেই বলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর ‘দায়িত্ব পালনের’ নামে বিচারবহির্ভূত হত্যা, নিরাপত্তা হেফাজতে নির্যাতন,
কিংবা ক্রসফায়ারে দেওয়ার হুমকি দিয়ে নিরীহ সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের অন্যায় চর্চা চলে আসছে বছরের পর বছর ধরে। কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভে সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা হত্যাকাণ্ডও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের জবাবদিহির অনুপস্থিতির পরিণাম।

সুতরাং, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের চিঠিটি আইন ও বিচার বিভাগে আমলে নেওয়া হলে দেশ ও জাতির উপকার হবে না, বরং সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যে অংশটি অনিয়ম-দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের সুযোগ ভোগ করে চলেছেন, তাঁদের সব অন্যায়-অপরাধের দায়মুক্তির ব্যবস্থা করা হবে। এটা কোনোভাবেই বাঞ্ছিত নয়।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন