default-image

পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনায় নিয়ে সরকারের নীতিনির্ধারকেরা অনুধাবন করতে পেরেছেন যে ঢিলেঢালা লকডাউন বা বিধিনিষেধ আরোপ করে সংক্রমণ ঠেকানো যাচ্ছে না। ৫ এপ্রিল শুরু হওয়া এক সপ্তাহের বিধিনিষেধে প্রথমে গণপরিবহন ও দোকানপাট বন্ধ থাকার কথা বলা হয়েছিল। বিভিন্ন মহলের দাবির মুখে পরে দুটোই খুলে দেওয়া হয়। ফলে তা কার্যকারিতা হারায় এবং এ সময়ে করোনায় মৃত্যু ও সংক্রমণের হার লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকে।

এই প্রেক্ষাপটে সরকার ১৪ থেকে ২১ এপ্রিল পর্যন্ত যে সর্বাত্মক বিধিনিষেধে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা ছাড়া আর কোনো পথ ছিল বলে মনে হয় না। ইঙ্গিত রয়েছে, প্রয়োজনে এর মেয়াদ আরও বাড়তে পারে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ–ঘোষিত বিধিনিষেধে বলা হয়, সব সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি অফিস ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকবে, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নিজ নিজ কর্ম এলাকায় অবস্থান করবেন, সব ধরনের পরিবহন (সড়ক, নৌ, রেল, অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ফ্লাইট) বন্ধ থাকবে এবং শপিং মলসহ অন্য দোকানগুলো বন্ধ থাকবে। তবে শিল্পকারখানাগুলো স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় চালু থাকবে। কাঁচা বাজারও নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত খোলা রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সরকারি নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, অতি জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বাড়ির বাইরে বের হওয়া যাবে না।

বর্তমানে পরিস্থিতি যেখানে এসে দাঁড়িয়েছে, তা আসলে উভয়সংকট হিসেবেই বিবেচনা করতে হচ্ছে। সংক্রমণ বন্ধ করতে কঠোর কিছু পদক্ষেপ যেমন প্রয়োজন, তেমনি সে রকম কিছু করতে গেলে মানুষের জীবিকার ওপর চরম আঘাত পড়ে। এর আগেও দীর্ঘ লকডাউনে যেতে হয়েছিল এবং যার প্রভাব দেশের একটি বড় জনগোষ্ঠীর ওপর পড়েছে। আবার বিধিনিষেধ জারির লক্ষ্য হচ্ছে নতুন করে ছড়িয়ে পড়া সংক্রমণ ঠেকাতে যতটা সম্ভব মানুষকে ঘরে রাখা, অহেতুক জমায়েত বন্ধ রাখা এবং সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করার মাধ্যমে করোনার সংক্রমণ কমানো। আবার জনজীবন সচল রাখতে যেহেতু অতি প্রয়োজনীয় সেবা চালু রাখার বিকল্প নেই, তাই এসব সেবা চালু রাখার ক্ষেত্রে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা ও প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করাই হচ্ছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

বিজ্ঞাপন

গত বছর সাধারণ ছুটির মধ্যে তৈরি পোশাকশিল্প খোলা রাখা না–রাখা নিয়ে এক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির তৈরি হয়েছিল। এবার শুরু থেকেই পোশাকশিল্প ও কলকারখানাকে লকডাউনের বাইরে রাখা হয়েছে। ফলে এ ক্ষেত্রে কর্মীদের আসা-যাওয়া ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা নিশ্চিত করার দায়িত্ব পুরোটাই এসে পড়বে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ওপর। সরকারি প্রজ্ঞাপনে কারখানার নিজস্ব পরিবহনে কর্মীদের নিয়ে আসতে বলা হয়েছে। কিন্তু খুব কম কারখানাতেই কর্মী আনা–নেওয়ার জন্য নিজস্ব যানবাহন আছে। এসব ক্ষেত্রে কী হবে, সেগুলোর ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা থাকা প্রয়োজন।

করোনা মহামারি একটি জাতীয় দুর্যোগ। সরকার বা প্রশাসনের একার পক্ষে এ দুর্যোগ মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। সে ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দল, সংগঠন, স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান, জনপ্রতিনিধি—সবার সম্মিলিত প্রয়াস থাকতে হবে।

আরেকটি জরুরি বিষয় হচ্ছে লকডাউনের কারণে যেসব প্রান্তিক ও শ্রমজীবী মানুষের রুটি–রুজির পথ বন্ধ হয়ে যাবে, তাঁদের ঘরে আর্থিক সহায়তা পৌঁছানো নিশ্চিত করতে হবে। এ বিষয়ে কেবল স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের ওপর নির্ভর না করে নির্ভরযোগ্য বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোর সহায়তা নেওয়া যেতে পারে। জীবন বাঁচাতে গিয়ে গরিব মানুষকে আরও বেশি অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দেওয়া যাবে না।

সরকার কিছু পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে, কিন্তু তার কার্যকারিতা নির্ভর করবে নাগরিকের সম্মিলিত সচেতনতার ওপর। আমরা দেশের এই দুর্যোগময় পরিস্থিতিতে সব নাগরিকের কাছে দায়িত্বশীল আচরণ প্রত্যাশা করছি।

সম্পাদকীয় থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন