শুক্রবার মধ্যরাতে কুড়িগ্রামের সাংবাদিক আরিফুল ইসলামকে তাঁর বাড়ি থেকে যেভাবে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, তার বিবরণ ডাকাত ও অপহরণকারীদের দুর্বৃত্তপনার চিত্র স্মরণ করিয়ে দিতে পারে। কিন্তু যেসব লোক তাঁর বাড়ির দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে তাঁকে বেদম পিটিয়ে চোখ ও হাত বেঁধে নিয়ে গেছেন, দুর্বৃত্তপনা তাঁদের পেশা নয়। বরং তাঁরা সরকারি স্থানীয় প্রশাসন ওই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী কর্তৃপক্ষের লোকজন; তাঁদের পেশাগত দায়িত্ব সমাজকে অন্যায়–অপরাধ থেকে মুক্ত রাখা, অপরাধীদের হাত থেকে নাগরিকদের সুরক্ষা দেওয়া।

আরিফুল ইসলামকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যাওয়ার পর ৪৫০ গ্রাম মদ ও ১০০ গ্রাম গাঁজা রাখার অভিযোগে মধ্যরাতে ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে তাঁকে এক বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত করে কারাগারে পাঠানোর ঘটনায় ‘আপাতত মনে হচ্ছে আইন ভঙ্গ হয়েছে’ বলে রোববার সকালে মন্তব্য করেছেন জনপ্রশাসনসচিব। আর আমাদের মনে হচ্ছে শুধু আইন ভঙ্গ নয়, আরিফুল ইসলাম ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের ওপর গুরুতর অন্যায় করা হয়েছে। সাত বছর ও দুই বছরের শিশুসন্তান ও তাদের মায়ের সামনে বাবাকে পেটানো হয়েছে; তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তারপর তাঁকে আরও পেটানো হয়েছে। রোববার সকালে জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর কারাগার থেকে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করাতে হয়েছে—খবর থেকে স্পষ্টই বোঝা যায়, তাঁর ওপর এমন নির্যাতন চালানো হয়েছে যে তাঁর হাসপাতালে চিকিৎসার প্রয়োজন হয়েছে। ‘মাদকবিরোধী অভিযানে’ আরিফুলকে মধ্যরাতে তুলে নিয়ে গিয়ে যে সাজা দেওয়া হয়েছে, তাঁর পরিবারের দাবি, সেই অভিযোগ মিথ্যা। কিন্তু তা যদি সত্য হতোও, তবু কি তাঁর ওপর এই নির্যাতন চালানোর অধিকার আইন প্রয়োগকারীদের আছে? না, নেই। বরং এটা অপরাধ।

রোববার সকালে আরিফুল জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। কিন্তু আরিফুলের স্ত্রী বা অন্য কোনো স্বজন জামিনের আবেদন করেননি। আমাদের অনুমান, এই ধিক্কারজনক ঘটনায় জাতীয় সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র নেতিবাচক প্রতিক্রয়ার ফলে আরিফুলকে জামিনে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। রোববার দুপুরে জানা গেল, কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক সুলতানা পারভীনকে প্রত্যাহার করা হচ্ছে। সরকারি প্রশাসন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কোনো সদস্য আইন লঙ্ঘন ও ক্ষমতার অপব্যবহার করলে সংশ্লিষ্ট কর্মকতাকে কর্মস্থল থেকে প্রত্যাহার, অন্যত্র বদলি কিংবা সাময়িকভাবে বরখাস্ত করার মধ্য দিয়ে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়া হয়। আইনানুগভাবে শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নেওয়ার দৃষ্টান্ত অত্যন্ত বিরল। সাংবাদিক আরিফুল ইসলামের এ ঘটনার কারণ, তিনি তাঁর পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসনের, বিশেষত ডিসির রোষের শিকার হয়েছেন। সেই রোষ চরিতার্থ করতে তাঁকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে নির্যাতন চালানো এবং তাঁকে মাদকদ্রব্য রাখার মিথ্যা অভিযোগে তাৎক্ষণিকভাবে দণ্ড দেওয়া স্পষ্টতই ক্ষমতার গুরুতর অপব্যবহারের মাধ্যমে অপরাধ সংঘটন। এর প্রতিকার হিসেবে শুধু ডিসির প্রত্যাহার যথেষ্ট নয়, তাঁর ও সংশ্লিষ্ট অন্যদের বিরুদ্ধে আইনানুগ পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।

শুধু কুড়িগ্রামের আরিফুল ইসলাম নয়, বাংলাদেশের আরও অনেক সাংবাদিক সাম্প্রতিক কালে নানা রকমের নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন। শফিকুল ইসলাম নামের ঢাকার এক সাংবাদিক কয়েক দিন ধরে নিখোঁজ। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে হয়রানিমূলক মামলা দায়ের হয়েছে মানবজমিন–এর প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরীসহ ৩২ জনের বিরুদ্ধে। অবিলম্বে এসব বন্ধ করা হোক।

বিজ্ঞাপন
সম্পাদকীয় থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন