রায় দ্রুত কার্যকর হোক

গত সোমবার কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক মোহাম্মদ ইসমাইল চাঞ্চল্যকর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান হত্যার রায় ঘোষণা করেছেন। যেখানে অনেক মামলার তদন্তকাজ বছরের পর বছর ফেলে রাখা হয়, সেখানে দেড় বছরের মধ্যে মামলার বিচার শেষ করা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। ২০২০ সালের ৩১ জুলাই কক্সবাজার মেরিন ড্রাইভ সড়কে টেকনাফের শামলাপুর তল্লাশিচৌকিতে পুলিশের গুলিতে খুন হন সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত এই কর্মকর্তা। তিনি সেখানে গিয়েছিলেন নিজের ইউটিউব চ্যানেল জাস্ট গোর জন্য শুটিং করতে।

মামলার রায়ে টেকনাফ থানার সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার দাশ ও শামলাপুর চৌকির পরিদর্শক লিয়াকত আলীকে মৃত্যুদণ্ড এবং ছয়জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের মধ্যে নন্দদুলাল রক্ষিত, সাগর দেব ও রুবেল শর্মা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন স্তরের সদস্য। অপর তিন আসামি পুলিশের সোর্স হিসেবে কাজ করতেন।

মামলার পর্যবেক্ষণে যেসব তথ্য-উপাত্ত উঠে এসেছে, তা ভয়ংকর। টেকনাফ থানার সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার দাশ ও তঁার সহযোগীরা মাদকবিরোধী অভিযানের নামে নির্বিচার মানুষ খুন করেছেন, ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে বহু মানুষের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা আদায় করেছেন। এমনকি টাকা পরিশোধ করার পরও অনেকে কথিত ক্রসফায়ার ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। মামলার সাক্ষ্য–প্রমাণে দেখা যায়, ওসি প্রদীপ কুমার দাশ নিজের অপরাধ ঢাকতেই পরিকল্পিতভাবে সিনহাকে হত্যা করেন। সিনহা স্থানীয় ভুক্তভোগীদের সঙ্গে আলাপ করে তঁার অনেক অপকর্ম রেকর্ড করেছিলেন। বিচারক তঁার পর্যবেক্ষণে বলেছেন, সিনহাকে হত্যা করতে ওসি প্রদীপ কুমার অন্য অপরাধীদের ষড়যন্ত্রমূলক অপরাধে যুক্ত করেছেন। পরিদর্শক লিয়াকত আলী ওসি প্রদীপের নির্দেশে সিনহাকে গুলি করেন। পরে প্রদীপ সিনহার মৃত্যু নিশ্চিত করতে তঁার বুকে লাথি মারেন।

সিনহা হত্যার ঘটনা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একশ্রেণির কর্মকর্তার নৃশংসতার নিকৃষ্ট উদাহরণ। সরকার মাদকের বিরুদ্ধে শূন্য সহিষ্ণুতা ঘোষণা করেছে। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একশ্রেণির কর্মকর্তা মাদকবিরোধী অভিযানকে চাঁদাবাজি ও নিষ্ঠুরতার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন। ২০১৮ সালে র‍্যাবের সদস্যদের হাতে টেকনাফের কাউন্সিলর একরামুল হক খুন হওয়ার ঘটনা নিয়েও ব্যাপক সমালোচনা হয়েছিল। সিনহা হত্যার বিচার হলেও একরামের বিষয়ে মামলা পর্যন্ত হয়নি। সিনহা হত্যার পর কথিত বন্দুকযুদ্ধের ঘটনাও কমে যায়।

বিচারিক আদালতে সিনহা হত্যার বিচার হয়েছে, এটা স্বস্তির খবর। তবে আমাদের মনে রাখতে হবে যে নিম্ন আদালতের রায়ই শেষ নয়। আপিল নিষ্পত্তিতে কত সময় লাগে, তার ওপরই মামলার ভাগ্য নির্ভর করছে। সিনহা হত্যার ঘটনাটি আমাদের ২০১৪ সালে নারায়ণগঞ্জে সংঘটিত সাত খুনের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। সেখানে একজন ওয়ার্ড কাউন্সিলরের ভাড়াটে হিসেবে তাঁর প্রতিপক্ষকে খুন করেন র‍্যাবের কয়েকজন কর্মকর্তা। সেই মামলার অভিযুক্তরা নিম্ন আদালতে সর্বোচ্চ শাস্তি পেলেও এখনো উচ্চ আদালতে ঝুলে আছে চূড়ান্ত নিষ্পত্তির অপেক্ষায়।

সাবেক সেনা কর্মকর্তা সিনহা হত্যার ঘটনাটি সর্বমহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেওয়ায় প্রদীপ-লিয়াকত চক্র মামলাকে ভিন্ন খাতে নিয়ে যেতে পারেনি। কিন্তু সাধারণ মানুষ যখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে গুম-খুনের শিকার হন, তখন মামলা এগোতে চায় না, নানাভাবে বিচার প্রক্রিয়াকে থামিয়ে দেওয়া হয়। আইনের শাসনহীনতার এই সংস্কৃতির অবসান হোক। কথিত বন্দুকযুদ্ধের প্রতিটি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার হোক। সিনহা হত্যা মামলার রায় দ্রুত কার্যকর হবে, এটাই আমাদের প্রত্যাশা।