default-image

আজ স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী। দেখতে দেখতে আমাদের স্বাধীনতার বয়স ৫০ বছর পার হলো। ১৯৭১ সালে যে প্রজন্ম দেশমাতৃকার মুক্তির জন্য অস্ত্র হাতে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, তাদের অনেকে বেঁচে নেই। মুক্তিযুদ্ধকালে অনেক শ্রেষ্ঠ সন্তানকে আমরা হারিয়েছি, কিন্তু তঁাদের স্বপ্নের দেশ আছে। বাংলাদেশ আজ বিশ্বের বুকে স্বাধীন–সার্বভৌম এক রাষ্ট্র।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে আমরা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি সেই বীর সন্তানদের, যাঁরা দেশের জন্য আত্মোৎসর্গ করেছেন। স্মরণ করি স্বাধীনতার মহানায়ক ও জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে, যিনি ধীরে ধীরে একটি জনগোষ্ঠীকে স্বাধীনতার পথে এগিয়ে নিয়ে গেছেন এবং একাত্তরের ২৬ মার্চ চূড়ান্ত ডাক দিয়েছেন। স্মরণ করি জাতীয় চার নেতাকে, যাঁরা বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে তাঁরই নির্দেশে অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকার পরিচালনা করেছেন।

বিজ্ঞাপন

স্বাধীনতার প্রথম লক্ষ্য ছিল পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসনের শৃঙ্খলমুক্তি। একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে তা অর্জিত হয়েছে। দ্বিতীয় লক্ষ্য ছিল একটি গণতান্ত্রিক, ন্যায়ভিত্তিক ও অসাম্প্রদায়িক দেশ গঠন; যেখানে দেশের প্রতিটি মানুষের মৌলিক চাহিদা ও নাগরিক অধিকার নিশ্চিত হবে। অস্বীকার করার উপায় নেই, আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশ প্রভূত উন্নতি করেছে। আমাদের গড় আয় ও আয়ু—দুটিই বেড়েছে। নারীশিক্ষার প্রসার ঘটেছে। স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারিত হয়েছে। একদা খাদ্যঘাটতির দেশ খাদ্য উদ্বৃত্তের দেশে পরিণত হয়েছে। স্বল্পোন্নত দেশের সীমা পেরিয়ে আমরা উন্নয়নশীল দেশের দরজায় পা রাখছি।

এসব সাফল্য সত্ত্বেও স্বীকার করতে হবে, স্বাধীনতার মৌলিক যে প্রত্যয় অর্থাৎ প্রতিটি মানুষের মৌলিক চাহিদা তথা খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের সুযোগ নিশ্চিত করা যায়নি। এখনো বিপুলসংখ্যক মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছে। স্বাধীনতার মূল কথা ছিল একটি শোষণমুক্ত, গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা। আমাদের আদি সংবিধানেও জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা স্থাপিত হয়েছিল মৌল ভিত্তি হিসেবে। পরবর্তীকালে নানা রাজনৈতিক চড়াই-উতরাইয়ের কারণে আমরা সংবিধানকে অক্ষত রাখতে পারিনি। নানা কালো আইন ও অধ্যায় এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে বৈষম্যও বেড়েছে।

স্বাধীনতার মূল স্বপ্ন ছিল বাংলাদেশকে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। দিনে দিনে যেখানে গণতন্ত্র সংহত হওয়ার কথা, সেখানে তা সংকুচিত হয়েছে। নির্বাচনী ব্যবস্থা কার্যত ধসে পড়েছে। স্বাধীন মতপ্রকাশ ও বাক্‌স্বাধীনতার পরিসর সংকুচিত হয়েছে। সংবিধান নাগরিককে যে মৌলিক অধিকার ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দিয়েছে, পূর্বাপর সরকারগুলো নানা কালো আইনের মাধ্যমে তা খর্ব করার চেষ্টা চালিয়েছে, যার সর্বশেষ সংযোজন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন।

তাই স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে আত্মজিজ্ঞাসার সময় এসেছে—আমরা কি বৈষম্যপূর্ণ অর্থনৈতিক উন্নতি নিয়ে সন্তুষ্ট থাকব, না বৈষম্য কমানোর উদ্যোগ নেব? আমরা কি নড়বড়ে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে শিরোধার্য করব, না গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করাব? আমরা কি সব বিষয়ে রাজনৈতিক বিভাজন ও বৈরিতা জিইয়ে রাখব, না জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ঐক্যের পথে এগোব? আমরা কি অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি আইনের শাসন, মানবাধিকার ও বাক্‌স্বাধীনতা সমুন্নত রাখার চেষ্টা করব না?

এ বছর আমরা স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদ্‌যাপন করছি। কেবল আনুষ্ঠানিকতার ঘেরাটোপে বন্দী না থেকে যে উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তাকে যেন হৃদয়ে ধারণ করি, সব মানুষের মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠায় ব্রত হই। সবাইকে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর শুভেচ্ছা।

বিজ্ঞাপন
সম্পাদকীয় থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন