default-image

বাংলাদেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত মোট রোগীর সংখ্যা সাড়ে চার লাখ ছাড়িয়ে গেছে। কিন্তু এ সংখ্যা থেকে দেশে কোভিড-১৯ মহামারির প্রকৃত চিত্র পাওয়া সম্ভব নয়। কারণ, এ পর্যন্ত যেসব ব্যক্তির নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে, শুধু তাঁদের মধ্য থেকেই এতজন ব্যক্তি সংক্রমিত বলে শনাক্ত হয়েছেন। পরীক্ষা করা হয়নি, কিন্তু উপসর্গহীন কত করোনা রোগী রয়েছেন, কিংবা সর্দিজ্বর ও অন্যান্য করোনা-উপসর্গে ভুগছেন কিন্তু পরীক্ষা করাচ্ছেন না, এমন কতজন মানুষ আছেন—এসব আমরা কেউই জানি না। বিশেষজ্ঞরা অনেক আগে থেকেই এমন অনুমানের কথা বলে আসছেন যে পরীক্ষার মাধ্যমে শনাক্ত রোগীর তুলনায় অনেক বেশি রোগী দেশজুড়ে রয়েছেন। এটা একটা ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি। কারণ, উপসর্গহীন সংক্রমিত ব্যক্তিদের সংস্পর্শে সুস্থ মানুষেরাও সংক্রমিত হতে পারেন। এটা খুবই সম্ভব যে আমাদের দেশে করোনা রোগীদের অধিকাংশই সংক্রমিত হয়েছেন এভাবে। এখন সেই ঝুঁকি আবারও নতুন করে বাড়ছে।

কারণ, পরীক্ষা ও শনাক্ত রোগীর পরিসংখ্যান থেকে দেখা যাচ্ছে, সংক্রমণ আবার বাড়তে শুরু করেছে। অনেকের আশঙ্কা, মহামারির দ্বিতীয় ঢেউ ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। সর্বশেষ ৫০ হাজার রোগী শনাক্ত হয়েছেন ২৮ দিনে। এর আগের ৫০ হাজার রোগী শনাক্ত হয়েছিলেন ৩৬ দিনে। পরীক্ষার সংখ্যার অনুপাতে শনাক্ত রোগীর সংখ্যার শতকরা হিসাবে দেখা যাচ্ছে, দৈনিক সংক্রমণের হারও ক্রমেই বেড়ে চলেছে। দৈনিক শনাক্তের হার অক্টোবরের শেষ নাগাদ ১০ শতাংশ পর্যন্ত নেমেছিল, নভেম্বরের শুরু থেকে তা আবার বাড়তে শুরু করে। এক সপ্তাহ ধরে সংক্রমণের হার ১৫ শতাংশের কাছাকাছি রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, শীত আসার সঙ্গে সঙ্গে বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা কমতে থাকলে সংক্রমণ আরও বাড়তে পারে। গত দুই সপ্তাহের সংক্রমণ প্রবণতা লক্ষ করলে এমন আশঙ্কা হয় যে সংক্রমণ সম্ভবত দ্রুতগতিতেই বাড়তে চলেছে।

বিজ্ঞাপন

অর্থাৎ আমরা দ্বিতীয়বারের মতো বড় ঝুঁকির মুখোমুখি হতে চলেছি। কিন্তু ইতিমধ্যে করোনাভাইরাস সম্পর্কে সাধারণ মানুষের ভীতি ও
সতর্কতা কমেছে; স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার বিষয়ে অবহেলা বা শিথিলতা দেখা দিয়েছে। এমনকি কোভিডের সুস্পষ্ট উপসর্গে ভোগার পরও অনেকেই পরীক্ষা করাতে আগ্রহী হচ্ছেন না, চিকিৎসা নিতে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার বিষয়েও অনাগ্রহ রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে দেশজুড়ে সংক্রমণ আবার বেড়ে গিয়ে এক জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। কিন্তু অর্থনীতি ও মানুষের জীবন-জীবিকার স্বার্থে লকডাউনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়তো সম্ভব হবে না।

তাহলে আমাদের উপায় কী? কোভিড-১৯ মহামারির সম্ভাব্য দ্বিতীয় ঢেউ কার্যকরভাবে মোকাবিলা কীভাবে করা যাবে? এ বিষয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সেই আদি পরামর্শগুলোর প্রতি আমাদের মনোযোগ আবার ফেরাতে হবে। সংস্থাটি এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে মাস্ক ব্যবহারের ওপর। তারা বলছে, যদি কোনো এলাকার ৯৫ শতাংশ মানুষ মাস্ক ব্যবহার করে, তাহলে সেখানে লকডাউন আরোপের প্রয়োজন হবে না। দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাষ্ট্রসহ একাধিক দেশে জরিপ চালিয়ে দেখা গেছে, যেসব এলাকার মানুষের মধ্যে মাস্ক ব্যবহারের প্রবণতা বেশি, সেসব এলাকায় করোনাভাইরাস সংক্রমণের হার কম।

কিন্তু আমাদের দেশে মাস্ক ব্যবহার করা ও অন্যান্য স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ক্ষেত্রে বেশ অবহেলা রয়েছে। এ অবহেলা দূর করতে সরকার ভ্রাম্যমাণ আদালতের সাহায্যে অভিযান চালাতে শুরু করেছে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে এ উদ্যোগের পাশাপাশি সামাজিক উদ্যোগও প্রয়োজন। সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন প্রত্যেক মানুষের ব্যক্তিগত সচেতনতা ও সতর্কতা। করোনার বিপদ আমাদের ছেড়ে যায়নি; নিজেকে, নিজের পরিবারকে এবং সমাজের সবাইকে এ বিপদ থেকে দূরে রাখার দায়িত্ব এখন প্রত্যেক ব্যক্তির। মাস্ক ব্যবহারসহ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার কোনো বিকল্প নেই।

মন্তব্য করুন