default-image

‘একটি দুর্ঘটনা একটি পরিবারের সারা জীবনের কান্না’ বলে বিজ্ঞাপন দেখা যায় বাসের পেছনে। কিন্তু রাজশাহীর কাটাখালীতে যে দুর্ঘটনা ঘটল, তাতে অন্তত চারটি পরিবারকে সারা জীবন স্বজন হারানোর বেদনা ও যন্ত্রণা নিয়ে বেঁচে থাকতে হবে।

প্রথম আলোর খবর থেকে জানা যায়, শুক্রবার বেলা পৌনে দুইটার দিকে ১৭ জন যাত্রীবাহী একটি মাইক্রোবাসের সঙ্গে বিপরীত দিক থেকে
আসা হানিফ পরিবহনের যাত্রীবাহী বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষ হলে গ্যাসচালিত মাইক্রোবাসটিতে আগুন ধরে যায়। এতে মাইক্রোবাসে থাকা সবাই মারা যান।

নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে চার পরিবারের ১৬ জন সদস্য ছিলেন। তাঁরা রংপুরের পীরগঞ্জ থেকে রাজশাহীতে বেড়াতে যাচ্ছিলেন। প্রত্যক্ষদর্শীর মতে, রাস্তার ওপর বাঁশভর্তি ভ্যানগাড়িকে জায়গা দিতে গিয়ে বাসটির সঙ্গে মাইক্রোবাসের সংঘর্ষ ঘটে। পরে পুলিশ বাসচালক আবদুর রহমানকে রাজশাহী শহর থেকে গ্রেপ্তার করে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ওই দিন চট্টগ্রাম, গাইবান্ধা, নরসিংদী, সাতক্ষীরা, মুন্সিগঞ্জ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে সড়ক দুর্ঘটনায় আরও ১০ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।

বিজ্ঞাপন

সড়কে মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘতর হলেও এর প্রতিকারে কোনো উদ্যোগ নেই। দুর্ঘটনা রোধে সরকার আইন করে, কিন্তু আইনের প্রয়োগ নেই। পরিবহন আইন কার্যকর করার প্রশ্ন এলেই একশ্রেণির পরিবহনমালিক ও শ্রমিক রাস্তায় নামেন। ধর্মঘট ডাকেন। মনে হয়, সরকারের ভেতরে এমন কোনো স্বার্থান্বেষী মহল আছে, যারা আইনটি কার্যকর হতে দিচ্ছে না। অথচ সড়কে নিরাপত্তা নিশ্চিত হলে যাত্রী, চালক, পরিবহনকর্মী সবাই নিরাপদ থাকবেন।

রাজশাহীর সড়ক দুর্ঘটনা অনেকগুলো নির্মম সত্য আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল। প্রথমত, রাস্তার ওপর বাঁশবোঝাই ভ্যান দাঁড়িয়ে থাকার কথা নয়। এর মাধ্যমে ভ্যানচালক সড়ক আইন ভঙ্গ করেছেন। দ্বিতীয়ত, হানিফ পরিবহনের চালক ভ্যানকে জায়গা দিতে গিয়ে যে মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটালেন, তাতে ১৭টি তাজা প্রাণ ঝরে গেল। একটি পরিবারে কেবল এক বৃদ্ধা বেঁচে আছেন, তাঁর ছেলে, ছেলের বউ, নাতি-নাতনি সবাই মারা গেছেন। তৃতীয়ত, মাইক্রোবাসটি গ্যাসচালিত হওয়ায় দুর্ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে আগুন ধরে যায় এবং ১০ মিনিটের মধ্যে সবকিছু পুড়ে ছাই হয়ে যান। এটি গ্যাসচালিত না হলে এভাবে সব যাত্রীকে জীবন দিতে না–ও হতে পারত।

যেখানে আমাদের সড়ক ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত নাজুক, যানবাহন ত্রুটিপূর্ণ, বেশির ভাগ চালক অদক্ষ ও অপ্রশিক্ষিত, সেখানে গ্যাসচালিত গণপরিবহন কতটা নিরাপদ, তা ভেবে দেখার সময় এসেছে। একসময় পর্যাপ্ত গ্যাস থাকার কারণে যানবাহনে সিএনজি ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। বর্তমানে প্রাকৃতিক গ্যাসের অপ্রতুলতার কারণে বিদেশ থেকে আমদানি করা এলএনজি ও জ্বালানি তেলের ওপরই নির্ভর করতে হচ্ছে।

দুর্ঘটনায় যাঁরা মারা গেছেন, তাঁদের আমরা ফিরিয়ে আনতে পারব না। কিন্তু ভবিষ্যতে সড়কে নামলেই যাতে নারী-পুরুষ শিশুকে বেঘোরে জীবন দিতে না হয়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বশীল ভূমিকা নিতে হবে। সরকার কোনো আইন জারি করলে তা বাস্তবায়ন করার নৈতিক কর্তব্যও তার ওপর এসে বর্তায়। না হলে মানুষ ভেবে নেবে যে ২০১৮ সালে বিমানবন্দর সড়কে দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর প্রেক্ষাপটে সংসদে পাস করা আইনটি ছিল নিছক লোকদেখানো।

অবিলম্বে ২০১৮ সালের সড়ক পরিবহন আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন প্রয়োজন। সেই সঙ্গে দুর্ঘটনা রোধে প্রধানমন্ত্রী যেসব নির্দেশনা দিয়েছিলেন, তা–ও প্রতিপালিত হোক। আশা করি, সড়কে মৃত্যুর মিছিল বন্ধে সরকার দেরিতে হলেও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে দ্বিধা করবে না।

বিজ্ঞাপন
সম্পাদকীয় থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন