default-image

গত রোববার ছিল জাতিসংঘ ঘোষিত ‘রোড ক্র্যাশ ভিকটিম’ স্মরণ দিবস। বাংলাদেশে এই দিন নীরবে আসে, নীরবে চলে যায়। এবারও তার ব্যত্যয় ঘটেনি। সরকারের কোনো কর্মসূচি ছিল না। তাই ভুক্তভোগীদের প্রতি তাদের বাহ্যিক আড়ম্বরপূর্ণ অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করার কষ্টটুকুও করতে হয়নি।

১৯৯৩ সালে ব্রিটিশ চ্যারিটি ‘রোডপিস’ দিবসটি পালনে আন্দোলন শুরু করেছিল, যা ২০০৫ সালে জাতিসংঘ কর্তৃক স্বীকৃতি লাভ করে। নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের নেতা ইলিয়াস কাঞ্চনের সঙ্গে আমরা একমত যে সড়ক দুর্ঘটনা ও ভুক্তভোগীদের প্রতি পরিবহননেতাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আনাটা অপরিহার্য। ১৫ নভেম্বর তিনি প্রথম আলোকে বলেন, দুর্ঘটনায় নিহত হওয়ার ক্ষেত্রে আসামিদের পাঁচ বছরের জেলের বর্তমান বিধানটি যে ‘জামিন–অযোগ্য’, এটি এখন পর্যন্ত মানতে পারেননি পরিবহননেতারা। জেনারেল এরশাদের আমলে তাঁরা দফায় দফায় আন্দোলন করে একে জামিনযোগ্য করেছিলেন, সেখানেই তাঁরা ফিরে যাওয়ার অপেক্ষায় আছেন।

বিজ্ঞাপন

আমরা মনে করি, সরকারের উচ্চপর্যায়ের তরফে কাউন্সেলিং ছাড়া এখানে পরিবর্তন আনা দুরূহ। পরিবহন খাতকে ভুক্তভোগীদের প্রতি সংবেদনশীল করতে হলে ভুক্তভোগী পরিবারের দুটি চাহিদা পূরণ করতে হবে। প্রথমত, মামলা দায়েরে ভুক্তভোগীদের উৎসাহিত করা এবং মামলার দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা। দ্বিতীয়ত, ভুক্তভোগী পরিবারকে দ্রুত ক্ষতিপূরণ দেওয়া।

গত পাঁচ বছরেই যথাক্রমে ৩৭ হাজার ও ৮২ হাজারের বেশি মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত এবং আহত হয়েছেন। এ সময়ে সংঘটিত ২৬ হাজারের বেশি দুর্ঘটনায় কতটি মামলা হয়েছে এবং তার বিচারপ্রক্রিয়ার অগ্রগতি কী, এ তথ্য সংরক্ষণ করা হয় না। এ বিষয়ে কোনো ধরনের নজরদারির ব্যবস্থা না রাখার মধ্য দিয়ে প্রতীয়মান হয় যে এই রাষ্ট্র এখন পর্যন্ত সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহত হওয়ার বিষয়টিকে প্রধানত দৈব-দুর্বিপাক হিসেবেই দেখতে অভ্যস্ত। গোটা পরিবহন প্রশাসনযন্ত্রের মনস্তত্ত্ব পর্যবেক্ষণেও সেটাই ফুটে ওঠে।

এই মনস্তাত্ত্বিক দীনতা ঘুচিয়ে তুলতে না পারলে সড়কের ভুক্তভোগীদের জন্য ন্যায়বিচার বা উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ কোনোটিই নিশ্চিত করা যাবে না। এ প্রসঙ্গে আমরা ২০১০ সালে জাতিসংঘের নেওয়া একটি সিদ্ধান্তের প্রতি বিশেষ করে সরকার ও গণমাধ্যমের দৃষ্টি আকর্ষণ করি। বিষয়টি বিশ্বের অন্য অনেক স্থানের চেয়ে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ। জাতিসংঘ যথার্থই ‘রোড অ্যাক্সিডেন্ট’ কথাটির পরিবর্তে ‘রোড ক্র্যাশ’ শব্দটি ব্যবহার করেছে। যুক্তি হলো দুর্ঘটনা দৈব–দুর্বিপাকের বিষয় আর সড়কে যথেচ্ছ যা ঘটে, সেটা প্রধানত মানুষের তৈরি এবং যা প্রতিরোধ করার বিষয়টি মানুষের হাতে। তাই তাকে রোড ক্র্যাশ হিসেবে দেখতে হবে, এটা দুর্ঘটনা নয়। এটা কারও হৃদয়ঙ্গম করতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয় যে সংবাদমাধ্যম যখন ‘সড়ক দুর্ঘটনা’ শিরোনামে খবর ছাপে, তখনই দায়ী চালকদের একটা সাংস্কৃতিক দায়মুক্তি ঘটে। সাধারণ মানুষ, এমনকি ভুক্তভোগী পরিবারও কপালের দোষ দিয়ে একটা দায়সারা মনোভাব গ্রহণ করে।

ইলিয়াস কাঞ্চন আমাদের বলছিলেন যে রোড ক্র্যাশ শব্দের জুতসই বাংলা প্রতিশব্দ তিনি খুঁজছেন। প্রাথমিকভাবে তিনি প্রয়োজনে ‘সড়ক ক্র্যাশ’ শব্দটি ব্যবহার করা যেতে পারে বলে মনে করেন। সবচেয়ে বড় কথা, দুর্ঘটনা শব্দের চেয়ে ক্র্যাশ কথাটি অনেক নিরপেক্ষ ধারণা তৈরি করে।

ভুক্তভোগী স্মরণ দিবসে আমরা মনে করতে পারি যে সড়ক ক্র্যাশের মামলার দ্রুত বিচারের বিষয়টি অনেকটাই সড়ক কর্তৃপক্ষের সাধ্যের বাইরের বিষয়। কিন্তু ২০১৮ সালের আইনে ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণ দিতে ট্রাস্ট ও তহবিল গঠন তাদের সাধ্যের বিষয়। এখানে ইচ্ছাকৃত অবহেলা করে চলাটা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের তরফে কার্যত একটা অমার্জনীয় ফৌজদারি অপরাধ। এটা প্রতিরোধে উচ্চ আদালতের জরুরি হস্তক্ষেপের তো আমরা আর কোনো বিকল্প দেখি না।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0