হল প্রশাসন দায় এড়াবে কীভাবে

সম্পাদকীয়

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলে ছাত্রলীগ নামধারীদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। তাঁরা যখন খুশি হলে শিক্ষার্থীদের কক্ষে তালা লাগাচ্ছেন, যাঁকে অপছন্দ তাঁকে মারধর করে বের করে দিচ্ছেন।

গত বছরের ১৭ অক্টোবর আবাসিক হল খুলে দেওয়ার পর ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা এসব অপকর্ম চালিয়ে এলেও হল বা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারেনি। শুক্রবার রাতে ছাত্রলীগের তিন নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে যে ‘ব্যবস্থা’ নেওয়া হয়েছে, তাকে লোকদেখানো হিসেবে বিবেচনা করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। এ পরিস্থিতি খুবই দুর্ভাগ্যজনক।

তবে ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের এই দখলবাজি ও সন্ত্রাসী তৎপরতা কেবল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েই সীমিত নেই। প্রায় সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েই তাদের দখলদারি সমানে চলছে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের দখলবাজির প্রতিবাদে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে শিক্ষক ও অভিভাবকেরাও মাঠে নেমে আসেন। ক্যাম্পাসে শান্তি ফিরিয়ে আনতে তাঁরা মানববন্ধন করেন, যার ছবি ও খবর প্রথম আলোসহ সব গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। গতকালও নিপীড়ন ও দখলদারত্বমুক্ত শিক্ষাঙ্গনের দাবিতে এক শিক্ষক প্রতীকী অনশন করেছেন।

বিশ্ববিদ্যালয় ও হল প্রশাসনের নীরবতার সুযোগে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের দৌরাত্ম্য আরও বেড়ে যায়। তাঁদের দৌরাত্ম্যের শিকার হয়েছেন আবদুল লতিফ হলের ২৪৮ নম্বর কক্ষের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ মুন্না ইসলাম। হল প্রশাসনে দেওয়া লিখিত অভিযোগে তিনি বলেছেন, গত বৃহস্পতিবার রাত দুইটার দিকে ছাত্রলীগের হল শাখা সাধারণ সম্পাদক শামীম হোসেন, সহসভাপতি পারভেজ, কর্মী তৌহিদসহ ১০-১৫ জন এসে বলেন, ‘তুই এই রুমে উঠছিস কেন? তুই বের হয়ে যা।’

একপর্যায়ে তাঁকে গালিগালাজ করা হয়। তাঁর বিছানাপত্র কক্ষের বাইরে বারান্দায় ফেলে দেওয়া হয়। ছাত্রলীগের একজন তাঁর ঘাড় ধরে বাইরে বের করে দেন। এ সময় তাঁর পিঠে ঘুষি মারা হয়। পরে তিনি শেষ রাতে অন্য একটি হলের গেস্টরুমে ছিলেন। অনেকে ছাত্রলীগের এই সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডকে মধ্যরাতের তাণ্ডব বলেও অভিহিত করেছেন। এ ঘটনার পর সাধারণ শিক্ষার্থীরা ভয়ে আছেন।

মুন্নার বিভাগীয় শিক্ষক কুদরত-ই–জাহান ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেছেন, হল থেকে শিক্ষার্থীদের এভাবে বের করে দেবে, এটা কি মগের মুল্লুক? এ ঘটনা যারা ঘটিয়েছে, তারা শিক্ষার্থী নয়, ক্রিমিনাল।

কিন্তু এই ‘ক্রিমিনালদের’ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ও হল প্রশাসন বরাবর নমনীয়তা দেখিয়ে আসছে। ফলে ক্যাম্পাসে সরকার সমর্থক ছাত্রসংগঠনটির একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় আছে। মুন্নার ঘটনায় নবাব আবদুল লতিফ হলের প্রাধ্যক্ষ যা বলেছেন, তা-ও অনেকটা শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা।

তিনি বলেছেন, ভুক্তভোগী ওই শিক্ষার্থীকে তাঁর কক্ষে তুলে দেওয়া হয়েছে এবং তদন্ত কমিটির সুপারিশ সাপেক্ষে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

একটি হলের আবাসিক শিক্ষার্থীকে যখন মধ্যরাতে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা এসে মারধর করে বের করে দেন, তখন তাঁরা কেন নিশ্চুপ ছিলেন? প্রথম আলোর খবর থেকে জানা যায়, শিক্ষার্থী নির্যাতনের ঘটনায় হল প্রশাসন ছাত্রলীগের তিন নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে। এঁদের মধ্যে ছাত্রলীগের কর্মী তাসকীফ আল তৌহিদকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়েছে এবং হল শাখার সাধারণ সম্পাদক ও সহসভাপতিকে হল ছাড়তে বলা হয়েছে।

যে শিক্ষার্থীকে অন্য শিক্ষার্থীরা মারধর করে হল থেকে বের করে দিলেন, তাঁকে সাময়িক বহিষ্কার লঘু শাস্তি ছাড়া কিছু নয়। আর যে দুজনকে হল ছেড়ে যেতে বলা হয়েছে, তাঁদের একজনের ছাত্রত্বই নেই।

যেখানে প্রকৃত ছাত্ররা হলে থাকতে পারছেন না, সেখানে বহিরাগতদের প্রতি হল প্রশাসনের এই বদান্যতা কেন? অভিযুক্ত তৃতীয়জন এই হলের ছাত্রই নন। তাহলে তিনি কীভাবে এত দিন জবরদস্তিভাবে নবাব আবদুল লতিফ হলে ছিলেন? এসব প্রশ্নের জবাব হল প্রশাসনকে দিতে হবে।