default-image

স্বাধীনতা এবং স্বেচ্ছাচার এক নয়। নাগরিক স্বাস্থ্যহানির দিকে খেয়ালমাত্র না করে খেয়ালখুশিমতো হর্ন বাজিয়ে গাড়ি হাঁকানো স্পষ্টতই স্বেচ্ছাচারের নমুনা। সেই নমুনা নাগরিক জীবনের প্রাত্যহিক অনুষঙ্গ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়ে গেছে। মানুষের শব্দ গ্রহণের স্বাভাবিক মাত্রা ৪০-৫০ ডেসিবেল। এর বেশি শব্দ যদি ক্রমাগত কোনো মানুষের কানে আঘাত করে, তাহলে একপর্যায়ে তার শ্রবণশক্তি আংশিক এবং পরে স্থায়ীভাবে পুরোপুরি লোপ পেতে পারে।

উচ্চ শব্দের বিষয়টি মাথায় রেখে ২০১৯ সালের ১৭ ডিসেম্বর থেকে সচিবালয়-সংলগ্ন জিরো পয়েন্ট, পল্টন মোড় ও সচিবালয় লিংক রোডকে ‘নীরব এলাকা’ ঘোষণা করেছিল পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক মন্ত্রণালয়। শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা অনুযায়ী, নীরব এলাকা ঘোষিত স্থানে দিনে ৫০ ডেসিবেল এবং রাতে ৪০ ডেসিবেলের বেশি শব্দ থাকতে পারবে না। সেখানে শব্দকে এই মাত্রায় রাখতে সরকারের প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়ার কথা।

বিজ্ঞাপন

কিন্তু বাস্তবতা হলো, সেই ‘নীরব এলাকায়’ এখন শব্দের মাত্রা ৬০ ডেসিবেলের নিচে নামে না। কখনো কখনো তা ১২৯ ডেসিবেলের বেশি উঠে যায়। আর এই কর্ণবিদারী শব্দের মূল উৎস গাড়ির হর্ন। স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটির সদ্য প্রকাশ করা গবেষণা তথ্য বলছে, শুধু জিরো পয়েন্ট মোড়েই প্রতি ১০ মিনিটে ৩৩২ বার হর্ন বাজে। এর মধ্যে বড় একটা অংশ হাইড্রোলিক হর্ন।

উচ্চ শব্দ ঠেকাতে ২০১৯ সালে কয়েক দিন অভিযান চালানো হলেও ২০২০ সালে কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। ফলে ‘নীরব এলাকা’ আগের চেয়ে ‘সরব’ হয়েছে। শব্দদূষণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে আগে উঠে আসে পল্টন, শাহবাগ, ফার্মগেট, মতিঝিল, রামপুরাসহ কয়েকটি এলাকার নাম। পরিবেশ অধিদপ্তরের যে তথ্যটি সবচেয়ে আতঙ্কের, সেটি হলো মাত্রাতিরিক্ত শব্দের কারণে ইতিমধ্যে দেশের প্রায় ১২ শতাংশ মানুষের শ্রবণশক্তি হ্রাস পেয়েছে। কিন্তু তারপরও সচেতনতার অভাব রয়ে গেছে।

২০০৬ সালের শব্দদূষণ বিধি অনুযায়ী, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, উপাসনালয়ের সামনে এবং আবাসিক এলাকায় হর্ন বাজানো, মাইকিং করা ও সেই সঙ্গে সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানের নামে জোরে শব্দ সৃষ্টি করা আইনত দণ্ডনীয়। কিন্তু সেই আইনের কোনো প্রয়োগ নেই।

অনেকে নিজের বাসায়, কমিউনিটি সেন্টারে কিংবা সামাজিক অনুষ্ঠানে উচ্চ স্বরে গান বাজানোকে কোনো অপরাধই মনে করেন না। এর প্রতিবাদ বা প্রতিকার চাইতে গেলে উল্টো হেনস্তার শিকার হতে হয়। এমনকি রাজধানীতে প্রতিবাদ করতে গিয়ে মারধরের শিকার হয়ে মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। অর্থাৎ, শব্দদূষণ যে একটি বড় অপরাধ, তা জনমনে প্রতিষ্ঠা করাই এখন মুখ্য করণীয়।

বিজ্ঞাপন
সম্পাদকীয় থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন