>
default-image
অস্ট্রেলীয় ক্রিকেট দলের সফর স্থগিত এবং ইতালির নাগরিক হত্যার ঘটনায় বাংলাদেশে জঙ্গি তৎপরতার বিষয়টি ফের জনগণকে উদ্বিগ্ন করেছে। এর আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গার্ডিয়ান-এ সাক্ষাৎকার দিয়ে ব্রিটিশ জিহাদিদের ব্যাপারেও সতর্ক করেছিলেন। সম্প্রতি ব্যাংককে মন্দিরে হামলার সঙ্গে জড়িত বলে অভিযুক্ত চীনা নাগরিক আইজান বাংলাদেশেও এসেছিলেন। এই প্রেক্ষাপটে জার্মানির নিরাপত্তা বিশ্লেষকের সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হলো

সিগফ্রিড উলফ, জার্মান নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ

প্রথম আলো: আপনি কীভাবে বিশ্ব জিহাদবাদের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশি জিহাদিদের কার্যক্রম মূল্যায়ন করেন?
সিগফ্রিড উলফ: গত এক দশকে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের অন্যতম নেটওয়ার্কে চলে এসেছে। প্রথমত, আফগানিস্তান-পাকিস্তান অঞ্চলের বাইরে বিশ্ব জিহাদের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ নিয়োগ ঘাঁটিসমূহের একটি হিসেবে কাজ করছে। কয়েক শ বাংলাদেশি আফগান তালেবানদের সঙ্গে শরিক হয়েছিল। বিচ্ছিন্নভাবে হলেও এখন প্রমাণ মিলছে যে ইসলামিক স্টেট এবং সিরিয়ায় আল নুসরা ফ্রন্টের জন্য নিয়োগকারীদের মনোযোগ কেড়েছে বাংলাদেশ। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ বিদেশে সন্ত্রাসী আক্রমণ পরিচালনার জন্য একটি ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহৃত হওয়া ছাড়াও দেশটি জঙ্গি প্রশিক্ষণ ও তাদের পুনরেকত্রীকরণের একটি স্থানেও পরিণত হয়েছে। উপরন্তু বাংলাদেশের এক শ্রেণির ইসলামি রাজনৈতিক দল কেবল ইসলামীকরণ এবং উগ্র জঙ্গিবাদকে চাঙাই করছে না, বরং জিহাদিদের জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টিতেও তারা ভূমিকা রাখছে।
প্রথম আলো: দক্ষিণ এশীয় বিশেষজ্ঞ হিসেবে আপনি বাংলাদেশের বর্তমান সংকটের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট সম্পর্কে কী মন্তব্য করবেন?
সিগফ্রিড উলফ: বাংলাদেশের এই জঙ্গিবাদের মূল হোতা হলেন সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান ও জেনারেল এইচ এম এরশাদ। তাঁদের উভয়ের স্বৈরশাসনামলে সংবিধানে পরিবর্তন এনে সেক্যুলার নীতি আমূল বদলে ফেলা হয়েছে। কারণ, তাঁরা ধর্মের কার্ড খেলে নিজেদের ক্ষমতার বৈধতার ঘাটতি পূরণ করতে সচেষ্ট হয়েছেন। সন্দেহাতীতভাবে তাঁরা পাকিস্তানি সামরিক জান্তা জেনারেল জিয়াউল হককে গুরু মেনেছেন। তাঁর দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছেন। জিয়াউলের নেতৃত্বাধীন সরকার পাকিস্তানে মৌলবাদীদের উদ্বাহু নৃত্য প্রত্যক্ষ করেছিল। বাংলাদেশ সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম এবং জাতীয় রাজনীতির পাদপ্রদীপে ধর্মকে এনে তাঁরা আসলে বাংলাদেশকে একটি মৌলবাদী রাষ্ট্রে রূপান্তর করেছিলেন। এর ফলে ধর্মীয় দলগুলো ক্রমাগতভাবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে জায়গা করে নেয়। তবে এ কথাও সত্য যে বাংলাদেশের জনগণের কাছ থেকে এসব দল তেমন সমর্থন লাভ করেনি। বাংলাদেশের সংসদ নির্বাচনগুলোতে এদের প্রান্তিক ভোট প্রাপ্তিও সেই সাক্ষ্যই নিশ্চিত করে। এটা কৌতূহলোদ্দীপক যে দক্ষিণ এশিয়ার দুটি মুসলিমপ্রধান দেশের জনগণ তাদের ধর্মীয় দলগুলোর প্রতি একই মনোভাব দেখিয়ে চলেছে। পাকিস্তানেও ভোট প্রাপ্তিতে তারা কোণঠাসা থেকেছে। এ কারণে তারা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানসমূহকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক প্রভাব খাটানো এবং রাষ্ট্রের সম্পদ ব্যবহারে পিছিয়ে থেকেছে। আর এই ঘাটতি পূরণ করতে তারা ব্ল্যাকমেলিং, মানুষ হত্যা, উল্লেখযোগ্য সন্ত্রাসী তৎপরতায় সম্পৃক্ত হওয়ার মতো বিচারবহির্ভূত পদক্ষেপ বেছে নেওয়া আর সেই সঙ্গে আগ্রাসী রাজনৈতিক আচরণ প্রদর্শন করেছে।
প্রথম আলো: ঢাকায় ইতালির এনজিও কর্মী হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী?
সিগফ্রিড উলফ: উচ্চমাত্রার নিরাপত্তা অঞ্চল হিসেবে বিবেচিত কূটনৈতিক পল্লিতে সিজার তাবেলার হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হওয়া কেবল দেশটিতে সন্ত্রাসবাদ বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কাই সৃষ্টি করেনি। এ ঘটনা দেশটির ইসলামপন্থীদের পক্ষে একটা বড় ধরনের পরিবর্তন বয়ে আনার ইঙ্গিতবহ। প্রতীয়মান হচ্ছে যে এই হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে আইএস বাংলাদেশে প্রথম আক্রমণের সূচনা ঘটাল এবং এই অশুভ ঘটনা এটাই গুরুত্বারোপ করছে যে বাংলাদেশে বিশ্ব জিহাদ বিস্তৃত হতে শুরু করেছে। এটা মনে রেখে দক্ষিণ এশিয়ায় একটি ইসলামি হুমকিকে খাটো করে দেখা বা অবজ্ঞা করার সাধারণ নীতি অনুসরণ কেবল অপরিপক্বই নয়, অদূরদর্শী বলেও বিবেচিত হবে। মনে রাখতে হবে, এর খেসারত কেবল দেশটির ঝামেলাপূর্ণ অবস্থায় থাকা সংখ্যালঘু ও ‘পশ্চিমা টার্গেটরা’ই দেবে না, এটা সমগ্র রাষ্ট্র ও সমাজকে দিতে হবে। সালাফি মতবাদে বিশ্বাসী আইএস কিন্তু গভীরভাবে জামায়াতে ইসলামীর প্রতিষ্ঠাতা আবুল আলা মওদুদীর আদর্শের প্রতি আকৃষ্ট।
প্রথম আলো: গত ১৭ আগস্ট থাইল্যান্ডের একটি হিন্দু মন্দিরে বোমা বিস্ফোরণের মূল পরিকল্পনাকারীদের অন্যতম এক চীনা পাসপোর্টধারী বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছিলেন। এটা কি এই ইঙ্গিত দেয় যে চীনের মুসলিম-অধ্যুষিত শিনচিয়াং প্রদেশের কট্টরপন্থীরা বাংলাদেশে একটি নতুন সমর্থন ঘাঁটি প্রতিষ্ঠা করতে পারে?
সিগফ্রিড উলফ: আসলে ব্যাংকক বিস্ফোরণের ঘটনাকে নানামুখী হাইপোথিসিস দিয়ে ব্যাখ্যা করার সুযোগ রয়েছে। কতিপয় বিশ্লেষক ওই বিস্ফোরণের কারণ হিসেবে দক্ষিণ থাইল্যান্ডের মুসলিম বিদ্রোহ এবং আরও অনেক থাই সামরিক উপদলীয় কোন্দলের সঙ্গে এর যোগসূত্র কিংবা দেশটির সামরিক বাহিনী ও পুলিশের মধ্যকার উত্তেজনার দিকে ইঙ্গিত করেন। এ ছাড়া আরও কতিপয় জল্পনা-কল্পনার মধ্যে রয়েছে আন্তর্জাতিকভাবে সক্রিয় থাকা জিহাদি সংগঠন বিশেষ করে আল-কায়েদা, যারা ক্রমবর্ধমানভাবে দক্ষিণ এশিয়ায় তৎপর হয়ে উঠছে, তারা ওই আক্রমণ পরিচালনা করতে পারে। তবে এ মুহূর্তে যে সম্ভাবনাটি সবচেয়ে বেশি জোরালো মনে করা হয়, তা হলো
এই গ্রীষ্মে থাই সরকার কর্তৃক উইঘুরদের জবরদস্তি চীনে ফেরত পাঠানোর সঙ্গে ওই বিস্ফোরণের যোগসূত্র থাকা। এই প্রেক্ষাপটে কেউ একজন গুরুত্ব আরোপ করতে পারেন যে উইঘুরদের নিজেদের পক্ষে ওই ধরনের উচ্চপর্যায়ের হামলা চালানো কঠিন মনে হতে পারে। আর সে কারণে তাদের অতিরিক্ত সহায়তার প্রয়োজন। এই প্রেক্ষাপটে কারও উল্লেখ করা উচিত যে উইঘুররা ক্রমবর্ধমান হারে বিশ্ব জিহাদি নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছে। আর ওই নেটওয়ার্কে জড়িয়ে পড়েছে বাংলাদেশও।
প্রথম আলো: বাংলাদেশ সরকার, বিরোধী দল ও জনগণের জন্য কোনো সুপারিশ?
সিগফ্রিড উলফ: কট্টরপন্থীদের প্রতি বিএনপি ও তার মিত্র জামায়াতে ইসলামীর মতো কতিপয় রাজনৈতিক দলের সহানুভূতিশীল মনোভাব রয়েছে। তারা এর আগে ক্ষমতায় থাকতে একটি ‘সেক্যুলারবিরোধী বিপ্লবে’ শুধু যে রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যবহার করেছে তা নয়, তারা রাজনৈতিক-প্রশাসনিক কাঠামোতে মৌলবাদীদের অনুপ্রবেশ ঘটিয়েছে। আর এসবই বাংলাদেশ সমাজের বহুমুখী ও উদারনৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে এক বিরাট প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশ সমাজের ইসলামীকরণ এখন কোনো নিঃশব্দ প্রক্রিয়ার বিষয় নয়, এর আগ্রাসী ও তীব্র আওয়াজ ধ্বনিত হচ্ছে এবং তা ইতিমধ্যে ঢাকার ক্ষমতার রাজনীতির কেন্দ্রে পৌঁছে গেছে। এখন সময় হলো ধর্মের নামে মৌলবাদ ছড়ানোর বিরুদ্ধে একটি সমন্বিত ও শক্তিশালী কৌশল উদ্ভাবন করা। এখন পর্যন্ত ক্ষমতাসীন সরকার উগ্রপন্থা দমনে কিছুসংখ্যক যে পদক্ষেপ নিয়েছে, তা-ও কাজে আসেনি। জঙ্গিদের সংগঠিত হওয়ার সামর্থ্য এবং সরকারিভাবে নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠনগুলোর কার্যক্রমে তা-ই মনে হয়। এই হুমকি বন্ধ করতে হলে দেশটির সব গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ শক্তির সমন্বয়ে একটি জাতীয় ঐকমত্য তৈরি করতে হবে।

ড. সিগফ্রিড ও. উলফ: জার্মানির হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ এশিয়া ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ গবেষক। ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পাকিস্তান সিকিউরিটি রিসার্চ ইউনিট এবং দিল্লির সেন্টার দ্য সায়েন্সেস হিউম্যানসের সাবেক রিসার্চ ফেলো। বর্তমানে তিনি জার্মান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আফগানিস্তান-পাকিস্তান টাস্কফোর্সের বহিস্থ বিশেষজ্ঞ গ্রুপের অন্যতম সদস্য।

ঢাকা থেকে জার্মানিতে অনলাইনে সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মিজানুর রহমান খান।
সাক্ষাৎকারটি সংক্ষিপ্ত করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0