বিরোধী দলের অবরোধ–হরতালের দেড় মাস পার হলো। জনজীবনে চরম উৎ​কণ্ঠা লক্ষ করা যাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক অচলাবস্থা নিরসনের উপায় নিয়ে বলেছেন  সাবেক আইনমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা আবদুল মতিন খসরু

default-image

প্রথম আলো : চলমান সংকটকে কীভাবে দেখেন?
আবদুল মতিন খসরু : এর প্রেক্ষাপট দেখতে হবে। বিএনপির কথা শুনে মনে হয়, ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের ওপর ভিত্তি করেই তারা জ্বালাও-পোড়াও নীতি গ্রহণ করেছে। নিরীহ মানুষ হত্যা করছে। আমাদের সংবিধানের ৭২(৩) অনুচ্ছেদে বলা আছে, একটি সরকার নির্বাচিত হবে পাঁচ বছরের জন্য। আর কেবল সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল সরকার গঠন করবে। জনগণের রায় ব্যতীত কারও পক্ষে এক মুহূর্তের জন্য সরকারে থাকা সম্ভব নয়। তাই নির্বাচনে অংশ নেওয়া ছিল বিএনপির সাংবিধানিক কর্তব্য। ত্রয়োদশ সংশোধনী সুপ্রিম কোর্ট বাতিল করেছেন। ওই পথে আর ফেরা যাবে না।
প্রথম আলো : ওভাবে নির্বাচন করতে সংসদের এখতিয়ারকে সুপ্রিম কোর্ট স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। সুতরাং সংসদ চাইলেও করতে পারত না, তা সঠিক নয়।
মতিন খসরু : সুপ্রিম কোর্ট বলেছেন, পর পর দুটি নির্বাচন হতে পারে, যদি সংসদ মনে করে। কিন্তু সংসদ মনে করেনি। কারণ, ওই মামলার রায়ের নির্যাস হলো জনগণের রায় ব্যতীত কেউ আধা সেকেন্ডের জন্যও সরকারে ঢুকতে পারবে না।
প্রথম আলো : সংসদের সেই সিদ্ধান্ত আজকের সংকটের জন্য দায়ী কি না?
মতিন খসরু : না। সিদ্ধান্ত গ্রহণে সংসদের সার্বভৌম ক্ষমতা রয়েছে। সাবেক বিরোধীদলীয় নেত্রী নির্বাচনে অংশ নিলে হয়তো সরকার গঠন করতে পারতেন। ভোট কারচুপি হলে তখন তিনি দেশবাসীকে বলতে পারতেন, দেখো কারচুপি করেছে। নির্বাচন না করার ভুল তিনি পরে বুঝতে পারলেন। দুই দশক আগের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আন্দোলনের কারণ আজ অনুপস্থিত। কারণ, সেনাবাহিনীর সহায়তায় আইডি কার্ডসহ সঠিক ভোটার তালিকা হয়েছে। দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষক আছেন। এখন আর কারও পক্ষে কারচুপি করা সম্ভব নয়।

প্রথম আলো : আপনার সব কথা যুক্তিগ্রাহ্য হলেও এই অবস্থাকে আপনি একটি সংকট বলে স্বীকার করেন কি না?

মতিন খসরু : সংকট বিরোধী দলের সৃষ্টি।

প্রথম আলো : তার মানে রাজনৈতিক অচলাবস্থা দেশে বিরাজমান?

মতিন খসরু : এটা অস্বীকার করার জো নেই, তবে এটা খালেদা জিয়ার সৃষ্টি।

প্রথম আলো : দেশের একটি বৃহত্তর দল আরেক বৃহত্তর দল সৃষ্ট সংকটকে কেবল নিরাপত্তাগত বা সন্ত্রাস দমনের জায়গা থেকে দেখছে। রাজনৈতিক সংকট হিসেবেই মানছে না, এটা কীভাবে দেখেন?

মতিন খসরু : এটা একটা রাজনৈতিক সংকট। দেশবাসীকে নিয়ে এটা রাজনৈতিকভাবেই মোকাবিলা করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, এটা আমরা দেশবাসীকে নিয়ে মোকাবিলা করব। নিরীহ মানুষকে গুলি করে হত্যার চেয়েও পাশবিক হচ্ছে জীবন্ত মানুষকে পুড়িয়ে হত্যা করা। এটা কোনো মানুষ সহ্য করতে পারে না। আলাপ-আলোচনায় আমাদের আপত্তি নেই। গণতন্ত্রে এটা একটা ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। কিন্তু কার সঙ্গে আলোচনা করব? এই নিষ্ঠুর হত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞের দায় তো বিএনপি স্বীকার করছে না।

প্রথম আলো : তার মানে দায় স্বীকার সংলাপের পূর্বশর্ত? তারা স্বীকার করছে না বলেই সংলাপ হচ্ছে না?

মতিন খসরু : আমি যদি পেট্রলবোমার কাছে নতি স্বীকার করি, তাহলে সেটা ভবিষ্যতের জন্য উদাহরণ হয়ে যাবে যে পেট্রলবোমা মেরেই আলোচনার টেবিলে বসানো যায়। তাদের যুক্তি কী? আমাদের সভা করতে দাও নাই, এটা ভুল হতে পারে। তাই বলে হত্যালীলা?

প্রথম আলো : এই সহিংস প্রবণতা আমাদের রাজনীতিতে কি ছিল না?

মতিন খসরু : ছিল। কিন্তু তাঁরা কী চান। নির্বাচন চাইলে তো আপনাকে সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় আসতে হবে। ২০১৯ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। অথবা গণ-আন্দোলনের মাধ্যমে সরকারের পতন ঘটাতে হবে। অথবা এই সরকারকে আস্থায় নিতে হবে। কিন্তু পেট্রলবোমা মেরে আওয়ামী লীগের মাথা নোয়ানো যাবে না।

প্রথম আলো : রাষ্ট্রপতি পদ্ধতিতে মেয়াদ থাকে, সংসদীয় পদ্ধতিতে মেয়াদ হয় না। আমাদের সংবিধান ব্রিটেনের নতুন আইনের মতো নির্দিষ্ট মেয়াদি সংসদ নয়।

মতিন খসরু : আমাদের সংবিধানের ৭২(৩) অনুচ্ছেদে স্পষ্ট বলা আছে, একটি সরকার নির্বাচিত হবে পাঁচ বছরের জন্য। নির্বাচন হবে পাঁচ বছর পর। মধ্যবর্তী নির্বাচনের পথ নেই।

প্রথম আলো : না, সে কথা লেখা নেই। বরং বলা আছে, রাষ্ট্রপতি পূর্বে ভাঙ্গিয়া না দিয়া থাকিলে প্রথম বৈঠকের তারিখ হইতে পাঁচ বৎসর অতিবাহিত হইলে সংসদ ভাঙ্গিয়া যাইবে।

মতিন খসরু : না। আপনি ভুল করছেন কি না জানি না, পাঁচ বছরের আগে কোনো অবস্থাতেই সংসদ ভাঙা যাবে না। সংবিধানে কোথাও পাঁচ বছরের আগে নির্বাচন করার কথা বলা নেই।

প্রথম আলো : তার মানে আপনি বলছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চাইলেও চলতি সংসদ ভাঙতে পারেন না?

মতিন খসরু : না। পারেন না। এটাই আমাদের সংবিধান বলছে।

প্রথম আলো : ৫৭(১ক) ও ৭২(১) অনুচ্ছেদমতে প্রধানমন্ত্রী যেকোনো সময় পদত্যাগ করতে পারেন, আর কোনো নতুন নেতা না পেলে রাষ্ট্রপতি সংসদ ভেঙে দেবেন। তাই আগাম নির্বাচনে সংবিধান বাধা নয়।

মতিন খসরু : আমি বললাম, এটাই বাধা। কারণ, পাঁচ বছর আগে এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি, কী কারণে হতে পারে? সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা আনার তো কোনো পরিবেশ নেই। আন্তর্জাতিকভাবেও এই সরকার অনুমোদনপ্রাপ্ত।

প্রথম আলো : চীন, রাশিয়া ও ভারত না হয় মেনেছে। ইইউ ও হাউস অব কমন্স অনাস্থা ব্যক্ত করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেন অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের পক্ষে। তাহলে?

মতিন খসরু : ইইউ ও হাউস অব কমন্স বলেছে সাংবিধানিকভাবে এই নির্বাচন বৈধ। কিন্তু নৈতিকতার দিক থেকে বিতর্কিত। যেহেতু ১৫৩ আসনে বিনা ভোটে নির্বাচন কিংবা ভোটার সেভাবে যায়নি। তবে বাহাত্তরের গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের ১৯ ধারায় বলা আছে, এক বা দুজন প্রার্থী হলে সর্বাধিক ভোট লাভকারী এবং কেউ না এলে সংশ্লিষ্ট প্রার্থী জয়ী বলে গণ্য হবেন। আপনি যে ইইউ ও হাউস অব কমন্সের কথা বললেন, তারা কি আইএস, বোকো হারাম ও আল-কায়েদার সঙ্গে বসেছে?

প্রথম আলো : যে দলটি ২০ বছর ধরে আপনার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী, যারা গড়ে ৩০ শতাংশের বেশি ভোট পায়, তারা বোকো হারামের সঙ্গে তুলনীয়?

মতিন খসরু : তুলনা তখনই আসে, যখন তারা পেট্রলবোমা মেরে মানুষ হত্যা করছে, হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদের ক্ষতি করছে। আলোচনায় আপত্তি নেই। কিন্তু আন্দোলনের যৌক্তিকতা থাকতে হবে। অবশ্য সংকট থেকে উত্তরণও হতে হবে। এই শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা কাটিয়ে উঠতে পথ বের করতে হবে। আগে তারা দায় স্বীকার করুক, তারপর আলোচনা হবে কি হবে না, সেই বিষয়ে আমরা বিবেচনা করব।

প্রথম আলো : সংকট নিরসন সম্ভাব্য কী উপায়ে হতে পারে? নাগরিক সমাজের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ লিখিত শর্ত আরোপের দিকে যেতে পারে?

মতিন খসরু : নাগরিক সমাজকে আমরা শ্রদ্ধা জানাই। কিন্তু তারা কঠিনভাবে দুভাগে বিভক্ত। তবে উভয় পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য একটা উপায় বের করতে হবে। এখন নাশকতা স্বীকার না করলে আমরা কার সঙ্গে বসব? দেশপ্রেমিক সংগঠন হিসেবে জনগণের জানমালের নিরাপত্তা দেওয়া আওয়ামী লীগের মুখ্য দায়িত্ব ও কর্তব্য। এ জন্য যা কিছু দরকার তা করতে আমরা রাজি। এ জন্য একটি যৌক্তিক পন্থা বের করতে হবে, যা হবে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য।

প্রথম আলো : কে আগে কীভাবে শুরু করবে, সেটা একটা হারজিতের ব্যাপার?

মতিন খসরু : না, তা নয়। মানুষের জানমালের নিরাপত্তা দেওয়া রাজনৈতিক দলের সবচেয়ে বড় কর্তব্য। এ জন্য যেকোনো সাংবিধানিক উপায়ে আমরা অগ্রসর হতে প্রস্তুত।

প্রথম আলো : বিষয়টি কি কেবলই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির...

মতিন খসরু : এটা আপনারা কীভাবে বলছেন? একটা লোক পেট্রলবোমা ছুড়ছে, তখন কী করতে বলেন?

প্রথম আলো : আইনের লোকেরা গত ৪৬ দিন যা করে দেখিয়েছে, তাতে আপনি সন্তুষ্ট?

মতিন খসরু : না। শুধু আইন প্রয়োগকারী সংস্থা দিয়ে এই সন্ত্রাস মোকাবিলা করা যাবে না। দেশবাসীর সম্পৃক্ততা দরকার, তাঁদের সমর্থন আমাদের রয়েছে, বিএনপি অচিরেই ধ্বংস হয়ে যাবে। যে আন্দোলনে জনসমর্থন থাকে না, সেটা বেশি দিন চালিয়ে নেওয়া যায় না।

প্রথম আলো : আপনার নির্দিষ্ট সুপারিশ কী?

মতিন খসরু : তাঁরা হত্যার দায় কাঁধে নিক, তাহলে অতীতের ভুলত্রুটি ভুলে গিয়ে আলাপ-আলোচনা শুরুর একটি অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হতে পারে। তখন একটা পথ বিজ্ঞজনেরা বের করবেন। জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে শনৈঃশনৈঃ উন্নতির দিকে বাংলাদেশ ধাবমান। তারা এতে বাধা দিচ্ছে। একবার যদি তারা ভুল স্বীকার করে খোলামনে এগিয়ে আসে, তাহলে নিশ্চয় একটা পথ বের হবে। ভুল স্বীকারে আপত্তি কোথায়? মহাত্মা গান্ধী বহুবার ভুল স্বীকার করেছেন।

প্রথম আলো : আপন​াকে ধন্যবাদ।

মতিন খসরু : ধন্যবাদ।

বিজ্ঞাপন
সাক্ষাৎকার থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন