দুই বিদেশি হত্যার ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে আইএসের অস্তিত্ব নিয়ে চলছে বিতর্ক। এর মধ্যে হোসেনি দালানে গ্রেনেড হামলা হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে দুজন নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) মুনিরুজ্জামান এবং ড. সিগফ্রিড ও. উলফ প্রথম আলোর মুখোমুখি হন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মিজানুর রহমান খান
default-image

প্রথম আলো: আইএসের হুমকি মোকাবিলায় বাংলাদেশ সরকারের নেওয়া পদক্ষেপগুলোর মূল্যায়ন করবেন?
. সিগফ্রিড উলফ: এ মুহূর্তে আইএসের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ হুমকির দৃশ্যপট, যা তারা ইতিমধ্যে তৈরি করেছে, তা মোকাবিলায় বাংলাদেশ সরকারের তরফে কোনো ব্যাপকতর কৌশল দেখি না। আইএস যে একটি ঝুঁকি, অন্তত প্রকাশ্যে সেটা তারা এখন বলছে না। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে এটা স্পষ্ট করে বলছে যে জামায়াতে ইসলামী রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য ভয়ানক হুমকি। সরকারের এই মূল্যায়ন একটি সঠিক পদক্ষেপ। কিন্তু তাতে বৃহত্তর ও আঞ্চলিক প্রেক্ষাপট, বিশেষ করে আফগানিস্তান ও পাকিস্তানে আইএস কী করেছে, তাকে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে বলে মনে হয় না। অবশ্য, বর্তমান প্রেক্ষাপটে কেবল জামায়াতে ইসলামী এবং তার সঙ্গে বিএনপির সুস্পষ্ট সম্পৃক্ততাকে চিহ্নিত করার মধ্যেই সন্ত্রাস দমন কার্যক্রমকে সীমিত করে ফেলার মতো মনোভাব প্রদর্শন করা সংগত নয়। উপরন্তু আইএসের মতো আন্তর্জাতিকভাবে সক্রিয় জিহাদি গোষ্ঠীর সঙ্গে তার নতুন স্থানীয় সহযোগী জামায়াতের যোগসাজশকে অবশ্যই মনোযোগের কেন্দ্রে আনতে হবে। একই সঙ্গে এটাও বলব যে জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে বাংলাদেশ সরকার পরোক্ষভাবে আইএসের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে।|
প্রথম আলো: এখানে কি আপনার বক্তব্য স্ববিরোধী মনে হচ্ছে না?
সিগফ্রিড উলফ: আপাতদৃষ্টিতে এটা স্ববিরোধী মনে হতে পারে, কিন্তু আসলে তা নয়। আইএস মতাদর্শগতভাবে জামায়াত বা মওদুদীবাদের অনুসারী। তাই জামায়াত পর্যুদস্ত থাকলে সেটা আইএসকেই দুর্বল করে রাখে। কিন্তু আমি বলব, এই ফলাফলটা আসে পরোক্ষভাবে। সরকার তো আইএসের উপস্থিতি প্রকাশ্যে স্বীকার না করার নীতি বা কৌশল অবলম্বন করে চলেছে। তাই আমি এই যুক্তি দেব যে, এমনটা যদিও ঘটছে বলে খালি চোখে দেখা যাচ্ছে, তবে তা ঘটছে সরকারের অজ্ঞাতসারে। আবার এটা এ ধারণারও জন্ম দিচ্ছে যে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদী সংগঠনগুলো যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ওয়ার অন টেররের কোয়ালিশনের আওতাধীন সামরিক কার্যক্রমকে ফাঁকি দিয়ে সন্ত্রাসমূলক কর্মকাণ্ড চালাতে পারছে। আবার বাংলাদেশ নিরাপত্তা বাহিনীর কাছ থেকেও তাদেরকে কোনো বড় ধরনের বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে না। উপরন্তু তারা বাংলাদেশের সমাজে সহজে যোগসূত্র স্থাপন করতে পারছে। এর ফলে এটা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে সুপারিশ করা সমীচীন হবে যে ইতালীয় ত্রাণকর্মী সিজার তাবেলা ও জাপানি নাগরিক কুনিও হোশি হত্যার ঘটনাকে আলাদাভাবে দেখা উচিত নয়। এবং এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকা-সংক্রান্ত আইএসের দাবি সরকারের তরফে সরাসরি নাকচ করা সমীচীন নয়।

প্রথম আলো: বাংলাদেশের সামনে এখন অগ্রাধিকার কী?

সিগফ্রিড উলফ: এ মুহূর্তের করণীয় খুবই পরিষ্কার। বাংলাদেশকে যত দূর সম্ভব অবশ্যই তার যত রকমের হুমকির ধারণা (থ্রেট পারসেপশনস) রয়েছে, সেসবের ব্যাপকভিত্তিক বিশ্লেষণ করতে হবে। বিশেষ করে আইএস যেভাবে সুবিধা পাচ্ছে এবং পাকিস্তানের মাটি থেকে যেভাবে সহায়ক তৎপরতা চালাতে সক্ষম হচ্ছে, হুঁশিয়ার হওয়ার জন্য এটাই যথেষ্ট। এই পরিস্থিতিতে আইএসের উপস্থিতিকে অস্বীকার করার যেকোনো নীতি উল্টো ফল বয়ে আনতে পারে। আর সে জন্য বেশি খেসারত দিতে হতে পারে বাংলাদেশের জনগণকেই। এই পরিপ্রেক্ষিতে আমি মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ২০১৪ সালের সন্ত্রাসবাদ-বিষয়ক কান্ট্রি প্রতিবেদনের এই পর্যবেক্ষণকে গুরুতর রূপে প্রশ্নবিদ্ধ করতে চাই। কারণ, তারা সেখানে বলেছে, সন্ত্রাসবাদী কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বাংলাদেশ একটি কঠিন স্থান। আমি বলব, হোসেনি দালানের সন্ত্রাসী ঘটনাতে আবারও প্রমাণিত হলো যে সরকারি তরফে আইএসের অস্তিত্ব সরাসরি অস্বীকার করার মতো অবস্থান গ্রহণ করার নীতি কতটা নাজুক। বাংলাদেশে আইএস থাকা না-থাকার প্রশ্নটি যেকোনো বিচারে সরাসরি নাকচ করার পরিবর্তে বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত অনুষ্ঠানের ওপর ভরসা করাই যৌক্তিক।

প্রথম আলো: আপনি কি বিশ্বাস করেন যে বাংলাদেশ নাশকতায় আইএসের দায়িত্ব স্বীকারের নামে যেসব দাবি করা হচ্ছে, তা নির্ভরযোগ্য?

সিগফ্রিড উলফ: অবশ্যই, বিশ্লেষণ সেদিকেই ইঙ্গিত করে। এমন আশঙ্কাই প্রবল যে, সাম্প্রতিক নাশকতাগুলো আইএস নিজেরাই কিংবা তাদের স্থানীয় মিত্রদের দিয়ে করাচ্ছে। বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়ায় আইএস যেসব সামরিক কলাকৌশল প্রয়োগ করছে, তার সঙ্গে বাংলাদেশের ঘটনাবলির মিল দেখতে পাচ্ছি।

প্রথম আলো: প্রযুক্তিগতভাবে আইএসের ডিজিটাল দাবির সত্যতা কি যাচাই করা সম্ভব?

সিগফ্রিড উলফ: যুক্তরাষ্ট্রের হাতেই আইএসের দাবি যাচাই করার সংশ্লিষ্ট সেরা প্রযুক্তি রয়েছে। তারা এ-সংক্রান্ত কোনো আন্তর্জাতিক বা জাতীয় আইনকানুনকে গুরুত্বের সঙ্গে নেয় বলে প্রতীয়মান হয় না, বিশেষ করে সেটা যখন কারও ব্যক্তিগত গোপনীয় তথ্য সংরক্ষণের মতো কোনো ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। এমনকি সেটা যদি তার কয়েক দশকের পুরোনো মিত্র দেশও হয়ে থাকে, তাহলেও যুক্তরাষ্ট্র তাকে ছাড় দেয় না। আমি কল্পনা করতে পারি যে আইএস যে দাবি করছে, তার সত্যতা যাচাইয়ের বিকল্প প্রযুক্তির অস্তিত্ব আছে। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বাংলাদেশ সে ধরনের কারিগরি প্রযুক্তি সুবিধা থেকে বহুদূরে রয়েছে।

প্রথম আলো: সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের পাশে আছে। তারা সহায়তা দিতে পারে না?

সিগফ্রিড উলফ: আমি নিশ্চিত নই যে বাংলাদেশে আইএস থাকার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে থাকা ‘উল্লেখযোগ্য’ প্রমাণাদি এবং তথ্যভান্ডার ভাগাভাগি করার ব্যাপারে মার্কিনরা কতটা আগ্রহী। তবে বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাট সাম্প্রতিক সময়ে যেসব বিবৃতি দিয়েছেন, তাতে মনে হয়, যুক্তরাষ্ট্র যতটা সম্ভব বাংলাদেশকে তার সন্ত্রাস দমন তৎপরতায় সহায়তা দিতে আগ্রহী।

প্রথম আলো: পশ্চিমা গণমাধ্যম কেন যাচাই ছাড়া আইএস দাবি করেছে মর্মে যেসব টুইটার কিংবা কোনো ওয়েবসাইটে ভেসে ওঠা খবর দ্রুততার সঙ্গে প্রকাশ করে, তার বিশ্বাসযোগ্যতা দিয়ে থাকে?

সিগফ্রিড উলফ: সত্যি বলতে কি, আমি পেশাগত দায়িত্ব পালনের কিছু ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়া কিংবা পশ্চিমা গণমাধ্যমের কর্মপ্রক্রিয়ার মধ্যে তেমন পার্থক্য দেখতে পাই না। আসলে বাংলাদেশে এখন সব থেকে জরুরি বিষয় হলো, ইসলামি মৌলবাদ নিয়ে লেখালেখি-সংক্রান্ত বাক্স্বাধীনতার বিষয়ে ক্রমবর্ধমান হুমকি এবং মিডিয়ার ভেতরের ও বাইরের ধর্মনিরপেক্ষ চিন্তাধারার লেখকদের পদ্ধতিগতভাবে নীরব করে দেওয়ার বিষয়গুলো। সুতরাং কেউ প্রশ্ন তুলতে পারেন যে বাংলাদেশ সরকার বাক্ ও মতামত প্রদানের স্বাধীনতাকে সুরক্ষা এবং একই সঙ্গে দেশের সাংবাদিক ও স্বাধীন বুদ্ধিজীবীদের নিরাপত্তা প্রদানে কী পদক্ষেপ নিতে চাইছে?

প্রথম আলো: বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাট সম্প্রতি বলেছেন, বাংলাদেশে আইএসের উত্থান ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের সামর্থ্য রয়েছে।

সিগফ্রিড উলফ: এ ক্ষেত্রে সম্পৃক্ত হতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যদি পরিকল্পনা করে থাকে, তাহলে আমি তাদের জন্য এই আশাবাদ ব্যক্ত করব যে তারা যেন আফগানিস্তান, ইরাক বা পাকিস্তানের এফএটিএ অঞ্চলের (ফেডারেল অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ট্রাইবাল এরিয়া) চেয়ে অধিকতর সাফল্য অর্জন করে।

প্রথম আলো: আমাদের একজন নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ (মেজর জেনারেল অব. মুনিরুজ্জামান) বলেছেন, বাংলাদেশে আইএসের নিজস্ব ক্যাডার ‘শারীরিকভাবে উপস্থিত’ না-ও থাকতে পারে। অনেক সময় তারা অন্যের দ্বারা সাধিত নাশকতামূলক কাজের দায়িত্ব স্বীকার কিংবা তার প্রতি সমর্থন প্রদান করে থাকতে পারে। আপনি কীভাবে দেখছেন?

সিগফ্রিড উলফ: আমি কেবল আংশিকভাবে তাঁর সঙ্গে একমত হব। কারণ, ব্যক্তিগতভাবে আমার এই সন্দেহটাই প্রবল যে, আইএসের কর্মীরা বেশ কিছুটা সময় ধরে সক্রিয় থাকতে পারে। কিছুদিন আগ পর্যন্ত আইএস বাংলাদেশকে তাদের যোদ্ধা নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ স্থান হিসেবে ব্যবহার করেছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে এবং তারা এত দিন সরাসরি সক্রিয় সন্ত্রাসী তৎপরতায় যুক্ত হয়নি। অবশ্য একে এভাবে ব্যাখ্যা করা উচিত হবে না যে আইএস বাংলাদেশকে তাদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেনি। পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মতো এ অঞ্চলের অন্য দেশগুলোতে আইএস নিজেদের অবস্থান তৈরি করে নিতে যেসব কৌশল অবলম্বন করেছে, তা বিশ্লেষণ করে কেউ একজন ভাবতে পারেন যে জামায়াতে ইসলামী ও হেফাজতে ইসলামের মতো স্থানীয় মৌলবাদী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে তারা ইতিমধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলতে শুরু করেছে।

প্রথম আলো: রাজনৈতিক সংকট জঙ্গিবাদ বেড়ে ওঠার জন্য বেশ অনুকূল, সত্যি?

সিগফ্রিড উলফ: আমি একমত। দুর্ভাগ্যজনক হলেও এটাই মনে হচ্ছে যে দেশটির চরম ‘উত্তেজনাকর’ রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং সেই সঙ্গে অনগ্রসর আর্থসামাজিক পরিস্থিতি ইসলামি মৌলবাদ বিস্তারের জন্য অনুকূল। আন্তর্জাতিকভাবে সক্রিয় অধিকাংশ জিহাদি সংগঠন এখন বাংলাদেশকে তাদের নতুন একটি অভয়ারণ্য হিসেবে দেখতে পারে।

সিগফ্রিড উলফ: আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও জার্মানির হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ এশীয় ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ গবেষক।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0