বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

প্রথম আলো: নদীর দখল ও দূষণ বন্ধে নদী কমিশন দৃশ্যমান কিছু করছে কি? না এটি নখদন্তহীন প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে?

মনজুর আহমেদ চৌধুরী: প্রকৃতপক্ষে সরকারের কোনো সংস্থারই নখদন্ত থাকা উচিত নয়। ন্যস্ত দায়িত্ব পালনের জন্য সরকারি সংস্থার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন কার্যকর আইন ও বিধি। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন তুলনামূলক একটি নবীন সংস্থা। সে হিসেবে সংস্থাটির আইনের সংস্কার প্রয়োজন। নানা সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও সংস্থাটি ইতিমধ্যে প্রায় ৫৭ হাজার অবৈধ দখলদারকে চিহ্নিত করে তালিকা প্রকাশ করেছে। সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসন ও বিআইডব্লিউটিএর সহায়তায় ১৪ হাজার অবৈধ দখলদারকে উচ্ছেদ করা হয়েছে এবং উচ্ছেদ কার্যক্রম চলমান।

প্রথম আলো: ঢাকার সাবেক সাংসদ আসলামুল হকের প্রকল্প নিয়ে নদী রক্ষা কমিশন আপত্তি করায় তিনি আপনাদের কর্তৃত্ব নিয়েই চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। সরকার গঠিত নদী রক্ষা কমিশনকে কি একজন আইনপ্রণেতা চ্যালেঞ্জ করতে পারেন?

মনজুর আহমেদ চৌধুরী: নদীর সীমানা নির্ধারণে প্রয়াত সাংসদ আসলামুল হক জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের কর্তৃত্ব নিয়ে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। কিন্তু তাঁর এ চ্যালেঞ্জ নাকচ হয়ে গেছে। পরবর্তী সময় প্রয়াত সাংসদের অবৈধ দখল করা নদীর জমি জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন চিহ্নিত করে দিয়েছে এবং সে অনুযায়ী বিআইডব্লিউটিএ ও জেলা প্রশাসন উচ্ছেদ কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। উচ্ছেদ কার্যক্রমের সর্বশেষ অবস্থা সম্বন্ধে বিআইডব্লিউটিএ ও ঢাকা জেলা প্রশাসন তথ্য দিতে পারবে।

সম্প্রতি প্রথম আলোয় ‘মেঘনা নদীর বালুখেকো’ নিয়ে খবর প্রকাশিত হওয়ার পর আপিল বিভাগের চেম্বার জজ ২৫ এপ্রিল পর্যন্ত বালু উত্তোলন স্থগিত করেছেন। ইজারাদার সেলিম খানের নানা অনিয়মও ধরা পড়েছে। এ বিষয়ে আপনিও প্রশাসনকে নির্দেশ দিয়েছিলেন। কী রকম সহযোগিতা পেয়েছেন?

মনজুর আহমেদ চৌধুরী: গত মাসে (মার্চ) চাঁদপুর জেলা প্রশাসন জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনকে অবহিত করে যে সেলিম খান নামের এক ব্যক্তি বহু বছর ধরে অবৈধভাবে ৩০০ থেকে ৪০০টি ড্রেজার, বাল্কহেড দিয়ে মেঘনার ইলিশ অভয়াশ্রম এলাকায় বালু উত্তোলন করে আসছেন। কমিশনের কাছে মৎস্যবিজ্ঞানীরা আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে এই ব্যাপক ড্রেজিংয়ের কারণে ইলিশের প্রজনন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এমনকি ইলিশের ‘মাইগ্রেটরি রুট’ স্থায়ীভাবে পরিবর্তিত হয়ে যেতে পারে। এর পরিপ্রেক্ষিতে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন চাঁদপুর জেলা প্রশাসনকে অবৈধ বালু উত্তোলনকারীকে বিতাড়ন বা গ্রেপ্তার করার জন্য নির্দেশনা দেয়। নির্দেশনা মোতাবেক চাঁদপুর জেলা প্রশাসন দৃঢ়তার সঙ্গে অভিযান পরিচালনা করে সব বালু সন্ত্রাসীকে বিতাড়িত বা গ্রেপ্তার এবং বেশ কিছু ড্রেজার ও বাল্কহেড জব্দ করতে সক্ষম হয়। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান ও কর্মকর্তারা ৩১ মার্চ মেঘনার ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা সরেজমিন পরিদর্শন করেন। বর্তমানে এই এলাকা সম্পূর্ণভাবে ড্রেজিংমুক্ত। চাঁদপুর জেলা প্রশাসনের এ কার্যক্রম প্রশংসনীয়।

বিভিন্ন নদী রক্ষায় নদী রক্ষা কমিশন যে মাস্টারপ্ল্যান করেছিল, সেটি কী অবস্থায় আছে? বিভাগীয় পর্যায়ে বৈঠকের মধ্যেই কি সেই মাস্টারপ্ল্যানের কাজ সীমাবদ্ধ?

মনজুর আহমেদ চৌধুরী: মাস্টারপ্ল্যানের কাজ এখন পর্যন্ত সম্পূর্ণ করা হয়নি। কোভিড-১৯–এর কারণে অনেকটা পিছিয়ে গেছে। তবে মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের কার্যক্রম চলমান।

তুরাগ নদের দখল নিয়ে উচ্চ আদালত এক রায়ে নদীকে জীবন্ত সত্তা হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন। কিন্তু এই জীবন্ত সত্তাকে যাঁরা হত্যা করছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি আজ পর্যন্ত। এ ব্যাপারে নদী রক্ষা কমিশনের কি কোনো ভূমিকা নেই?

মনজুর আহমেদ চৌধুরী: কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, এটা সম্পূর্ণ সত্য নয়। তবে এটা স্বীকার করতে হবে যে যতটা ব্যবস্থা নেওয়া দরকার ছিল, তা ঠিক নেওয়া যায়নি। এর প্রধান কারণ হচ্ছে জনবল সমস্যা। এ ছাড়া জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন আইনের কিছু সীমাবদ্ধতা থাকার কারণে অনেক সময় যথোপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয় না। বর্তমানে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন আইন সংশোধনের কাজ প্রক্রিয়াধীন।

বুড়িগঙ্গাসহ ঢাকার চারপাশের নদী রক্ষায় সরকারের পক্ষ থেকে বহু উদ্যোগ নেওয়া হলো, আদালত বহুবার নির্দেশনা দিলেন, কিন্তু নদীর দখল ও দূষণ বন্ধ হলো না কেন?

মনজুর আহমেদ চৌধুরী: বুড়িগঙ্গাসহ ঢাকার চারপাশের নদীগুলোর অবৈধ দখল করা জমি বহুলাংশে উদ্ধার করা হয়েছে। তবে নদীতে দূষণ বন্ধ করা যায়নি। ঢাকার চারপাশের নদীগুলো—বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, টঙ্গী খাল ও বালু প্রকৃতপক্ষে ‘ইকোলজিক্যালি ডেড’। এ ভয়াবহ মাত্রার দূষণের মূল কারণ, দূষণকারীদের আইনের আওতায় আনা যায়নি অথবা আইনের আওতায় আনা হয়নি। এই চার নদীর দূষণের প্রধান কারণ, বাসাবাড়ির পয়োবর্জ্য সিটি করপোরেশনের স্টর্ম ড্রেনের মাধ্যমে নগরীর খালগুলো দিয়ে সরাসরি নদীতে নির্গত হওয়া। প্রায় দুই কোটি নাগরিকের এই ঢাকা এখন একটি পয়োবর্জ্যবিপর্যস্ত নগরী। এই বিপর্যয়ের মূল কারণ, নগরীতে পর্যাপ্ত সু৵য়ারেজ লাইন নির্মাণে ঢাকা ওয়াসার অমার্জনীয় ব্যর্থতা। ঢাকা মহানগরী এবং এর আশপাশের শিল্পকারখানাগুলো থেকে অব্যাহতভাবে নদীগুলোতে নানাবিধ কৌশলে রাসায়নিক বর্জ্য ফেলা হয়। জৈব-অজৈব বর্জ্যের কারণে ঢাকার চারপাশের নদীগুলো এমনকি শীতলক্ষ্যা, বংশী, লবণদহ, খীরো নদীও আজ দূষণের কারণে ‘ইকোলজিক্যালি ডেড’-এ পরিণত হয়েছে।

গত ১৬ মার্চে তুরাগ নদের তীরে দাঁড়িয়ে নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে আমি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আগামী জন্মবার্ষিকী অর্থাৎ, ২০২৩ সালের ১৭ মার্চের মধ্যে ঢাকার চারপাশের নদী দূষণমুক্ত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করি। সেই সঙ্গে দূষণকারী সব সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের প্রতি নদী, জলাভূমিতে দূষণ বন্ধ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়। অচিরেই কমিশনের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট সব সরকারি-বেসরকারি সংস্থা, প্রতিষ্ঠানকে দূষণ বন্ধে সুনির্দিষ্ট কার্যক্রম গ্রহণের নির্দেশনা দেওয়া হবে। যেসব প্রতিষ্ঠান দূষণ বন্ধে ব্যর্থ হবে, তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

নদী দখলমুক্ত করার নামে বিআইডব্লিউটিএকে মাঝেমধ্যে অভিযান চালাতে দেখা যায়। আবার কিছুদিন পর প্রভাবশালীরা সেখানে স্থাপনা তৈরি করেন। এই উচ্ছেদ উচ্ছেদ খেলা কি চলতেই থাকবে?

মনজুর আহমেদ চৌধুরী: দখলদার উচ্ছেদ করার দায়িত্ব বিআইডব্লিউটিএ ও জেলা প্রশাসনের। তাদের কাজে শৈথিল্য থাকা অসম্ভব নয়। এ ধরনের অভিযোগ আমরাও মাঝেমধে৵ পাই। কিন্তু জনবলের অভাবে তদন্ত করা সম্ভব হয় না। প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগের পর এ ধরনের সব অভিযোগ খতিয়ে দেখা হবে।

নদী দখল রোধে নদীর সীমানা চিহ্নিত করা জরুরি। সেই কাজ আপনারা কতটা করেছেন। একশ্রেণির ভূমি কর্মকর্তা নদীকে সমতল ভূমি দেখিয়ে নদীর দখলকে বৈধতা দিচ্ছেন। তাঁদের বিরুদ্ধে আপনারা কোনো ব্যবস্থা নিয়েছেন কি?

মনজুর আহমেদ চৌধুরী: নদীর সীমানা নির্ধারণ করা জটিল কাজ। তবে ইতিমধ্যে বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু নদের সীমানা চিহ্নিত করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে প্রতিটি নদীরই সীমানা চিহ্নিত করার জন্য জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্দেশনা দিয়েছে।

ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের যে অভিন্ন ৫৭টি নদী আছে, সেগুলো প্রবাহ রক্ষা ও দূষণ বন্ধে সংশ্লিষ্ট দেশের সঙ্গে সমন্বিত কোনো উদ্যোগ কি বাংলাদেশ নিয়েছে? এ ক্ষেত্রে নদী কমিশন কী পারে?

মনজুর আহমেদ চৌধুরী: এ বিষয়ে দেখভালের জন্য একটা যৌথ নদী কমিশন আছে। তারা সহায়তা চাইলে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন সহায়তা দিতে প্রস্তুত আছে।

আপনাকে ধন্যবাদ।

মনজুর আহমেদ চৌধুরী: আপনাকেও ধন্যবাদ।

সাক্ষাৎকার থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন