বুয়েটের ছাত্রহত্যা ও ছাত্ররাজনীতি নিয়ে প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সহসভাপতি (ভিপি) নুরুল হক। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক রিয়াদুল করিম

প্রথম আলো: বুয়েটের একজন মেধাবী শিক্ষার্থীকে পিটিয়ে হত্যা করা হলো। একজন ছাত্রপ্রতিনিধি হিসেবে আপনি এই বিষয়টি কীভাবে দেখেন?
নুরুল: বর্তমানে সামগ্রিকভাবে এটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের একটা চিত্র। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠনের যে দখলদারি চলছে, যে নির্যাতন–নিপীড়ন চলছে শিক্ষার্থীদের ওপর, এটি তার একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ। এর আগেও অনেক শিক্ষার্থী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মারা গেছে। এফ রহমান হলে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে আবু বকর মারা গেছে। এসএম হলের শিক্ষার্থী ছিল হাফিজুর মোল্লা, ছাত্রলীগের নির্যাতনের শিকার হয়ে, গেস্ট রুম নির্যাতনের শিকার হয়ে বারান্দায় থেকে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে। এসএম হলের আরেকজন ছাত্র এহসান ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের সামান্য একটা ক্যালকুলেটর ধার দিয়েছিল, সেটা চাইতে গিয়ে রক্তাক্ত হয়েছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী সেই ছাত্র কষ্টে দেশ ছেড়েছে। 

বুয়েটের ঘটনাটা আজ ভালোভাবে আলোচনায় এসেছে। কিন্তু এ ধরনের ঘটনা আরও অনেক ঘটেছে। সেদিক থেকে আমি বলব, এটা হলো সামগ্রিকভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যে ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠনের একটা কর্তৃত্ববাদী নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থা চলছে, সেখানে যে নির্যাতনের শিকার হচ্ছে, তার একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ।

প্রথম আলো: দীর্ঘদিন থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে এই ধরনের নির্যাতন চলছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সব হলে গেস্টরুম কালচার আছে। এটা বন্ধ করার জন্য ডাকসুর কোনো উদ্যোগ আছে কি না?
নুরুল: আমি একজন সাধারণ ছাত্র থেকে এই ডাকসুর প্রতিনিধি নির্বাচিত হয়েছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণরুমে আমিও থেকেছি, গেস্টরুমে নির্যাতিত হয়েছি। সুতরাং ওই জায়গা আমি খুব ভালোভাবে জানি এবং ব্যথাটা অনুভব করি। সেই জায়গা থেকে নির্বাচনে আমাদের প্রধান একটা অ্যাজেন্ডা ছিল, আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে কাজ করব। গণরুম, গেস্টরুম, ভিন্ন মত দমনে নির্যাতন–নিপীড়ন বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেব। ভিন্নমতের ছাত্ররা যাতে পরিপূর্ণভাবে কাজ করতে না পারে, সে জন্য একটি বিতর্কিত নির্বাচন হয়েছে, যে নির্বাচনের ফলাফল হয়েছে ভোর রাতে। সে কারণে সাধারণ ছাত্ররা ভোট দিয়ে অনেককে নির্বাচিত করেছে, কিন্তু তাদের ফলাফল ঘোষণা করা হয়নি। আমরা দুজন, আমি ও সমাজসেবা সম্পাদক ভিন্ন মতের থেকে নির্বাচিত হয়েছি। আমরা কাজ করার জন্য নানাভাবে চেষ্টা করেছি। কিন্তু এই যে ছাত্রলীগের একটা দখলদারি, এটা শুধু ছাত্রলীগের দখলদারি নয়; এটা বাংলাদেশের পলিটিকসের একটা বৈশিষ্ট্য।
৯০-পরবর্তী সময়ে আমরা দেখেছি যে দল ক্ষমতায় থেকেছে, বিএনপি ক্ষমতায় থাকলে তাদের ছাত্রসংগঠন এই ক্যাম্পাসগুলোতে কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থার মধ্যে ছাত্রদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। এখন ছাত্রলীগ করছে। যেহেতু আওয়ামী লীগ একাধিকবার ক্ষমতায়, তাই তারা একটু বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। তাদের এই অপকর্মের সহযোগী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দলকানা প্রশাসন। কারণ, এখন তো প্রশাসক হিসেবে যাঁরা দলীয় আনুগত্য ভালো পালন করতে পারেন, তাঁদেরই দেওয়া হয়। গত ৩১ মার্চ এসএম হলে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করেছিল অছাত্র বহিরাগতদের বিতাড়নের। ডাকসু নির্বাচনের পরে তারা ভেবেছিল হয়তো অন্তত এটার একটা পরিবর্তন হবে। সে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার কারণে ফরিদ নামে উর্দু বিভাগের মাস্টার্সের এক শিক্ষার্থীকে মাথা ফাটিয়ে দেওয়া হয়েছিল। বিচার চাইতে গিয়ে আমি, শামসুন্নাহার হলের ভিপি ছাত্রলীগের হাতে লাঞ্ছিত ও হামলার শিকার হয়েছি। সেই হলের প্রভোস্টও ছাত্রলীগের হাতে লাঞ্ছিত হয়েছিলেন। সে ঘটনার বিচারে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সাত দিনের সময় নিয়েছিল। এখন পর্যন্ত করেনি। এই যখন বাস্তবতা এখান থেকে ভিপি হয়ে বা সমাজসেবা সম্পাদক হয়ে দুজনের কাজ করাটা খুবই কঠিন। কারণ, আমরা বলেছি যে ক্ষমতাসীন দল যারাই থাকে তাদের এই অপকর্মের সহযোগী হিসেবে ভূমিকা পালন করে এই দলকানা প্রশাসন। সেই জায়গা থেকে