default-image
বিজ্ঞাপন
মোহাম্মদ কবির হাসান একজন বাংলাদেশি-আমেরিকান অর্থনীতিবিদ। তিনি ইউনিভার্সিটি অব নিউ অরলিন্সের ডিপার্টমেন্ট অব ইকোনমিকস ও ফাইন্যান্সের প্রফেসর অব ফাইন্যান্স হিসেবে কর্মরত আছেন। বর্তমানে তিনি একই বিশ্ববিদ্যালয়ে হাইবারনিয়া প্রফেসর অব ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্স, হ্যানকক হুইটনি চেয়ার প্রফেসর ইন বিজনেস এবং ব্যাংক ওয়ান প্রফেসর ইন বিজনেস নামে তিনটি বিশেষ অধিকারী চেয়ার প্রফেসর হিসেবে অধিষ্ঠিত আছেন। তিনি ২০১৬ সালের ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (আইডিবি) ইসলামিক ব্যাংকিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। প্রফেসর হাসান যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের গুস্তাভাস এডলফাস কলেজ থেকে ১৯৮৫ সালে অর্থনীতি ও গণিতে স্নাতক ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। এরপর ১৯৮৭ সালে ইউনিভার্সিটি অব নেব্রাস্কা-লিংকন থেকে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর ও ১৯৯০ সালে ফাইন্যান্সে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি বিভিন্ন সময়ে বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল, আফ্রিকান উন্নয়ন ব্যাংক, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি), ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক, জাতিসংঘ উন্নয়ন কার্যক্রম (ইউএনডিপি), বাংলাদেশ ব্যাংক, সৌদি আরবের মুদ্রা কর্তৃপক্ষ, তুরস্কের সরকারসহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সংস্থায় পরামর্শক ও উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এ ছাড়া প্রফেসর হাসান অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড অডিটিং অর্গানাইজেশন ফর দ্য ইসলামিক ফাইন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশনের (এএওআইএফআই) নীতি ও শাসনব্যবস্থা কমিটির বোর্ড সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। ইমেইল ও টেলিফোনে সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মিজানুর রহমান খান

প্রথম আলো: মাথাপিছু জিডিপিতে বাংলাদেশ কেন ভারতকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে? আপনি কি মনে করেন এই ধারা অব্যাহত থাকবে?

কবির হাসান: সাম্প্রতিক ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুকের (ডাব্লিউইও) প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, ২০২০ সালে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ মাথাপিছু জিডিপি অর্থাৎ ১ হাজার ৮৮৮ মার্কিন ডলার অর্জন করবে, যা ভারতের সম্ভাব্য মাথাপিছু জিডিপি ১ হাজার ৮৮৭ মার্কিন ডলার থেকে সামান্য বেশি হবে। উন্নয়নশীল দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য এটা একটি ধনাত্মক দিক; তবে এটাতে এ অঞ্চলের অন্যান্য দেশের অর্থনৈতিক দিকটাও, বিশেষ করে ভারত ও পাকিস্তান তুলনার স্বার্থে বিবেচ্য।

পাকিস্তানের উন্নয়ন সূচক বাধাগ্রস্ত হয়েছে মূলত উগ্র সন্ত্রাসবাদ, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের অবনতি এবং ব্যাপক দুর্নীতির কারণে। বাংলাদেশ পাকিস্তানের থেকে স্বাধীনতা অর্জনের পর অর্থনৈতিকভাবে অনেক চড়াই–উতরাই পেরিয়ে এই শতকে এসে একটি উল্লেখযোগ্য উন্নয়নের দেখা পেয়েছে। ভারত একটি বিশ্ব পরাশক্তি এবং নিঃসন্দেহে এই অঞ্চলের বড় শক্তি। যদিও তাদের মাথাপিছু জিডিপি ২০২০ সালে বাংলাদেশের চেয়ে কিঞ্চিৎ কম হতে যাচ্ছে তবুও তাদের সামগ্রিক জিডিপি বাংলাদেশের চেয়ে অনেক গুণ বড়। মাথাপিছু পরিসংখ্যানের ক্ষেত্রে ভারতের ১ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন জনসংখ্যার তুলনায় বাংলাদেশের ১৬৫ মিলিয়ন জনসংখ্যা অনেক কম। এ ছাড়া ভারতের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারও সবচেয়ে বেশি (বিগত ১৫ বছরে ২১ শতাংশ)। সব মিলিয়ে বাংলাদেশ বিগত দশকে মাথাপিছু জিডিপির পার্থক্য কমিয়ে আনতে পেরেছে। যদিও কোভিড-১৯ সংক্রান্ত মহামারিতে সারা বিশ্বের অচলাবস্থার কারণে আইএমএফও এই পরিসংখ্যানকে স্থিতিশীল বিবেচনা করছে না। তাই বাংলাদেশ তার অর্থনৈতিক উন্নয়ন চালু রাখবে মর্মে আশা করা গেলেও ভারতের থেকে মাথাপিছু জিডিপিতেও দৃশ্যমান ভবিষ্যতেও এগিয়ে থাকবে, এ ব্যাপারে নিশ্চিত করে বলা যায় না।

একুশ শতকের বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন পর্যালোচনা করলে অনেক উল্লেখযোগ্য দিক পাওয়া যায়, একই সঙ্গে কিছু ভবিষ্যৎ আকস্মিকতার সম্ভাবনাও থেকে যায়, যার মাধ্যমে উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হতে পারে। উন্নয়নে মূল সহায়ক ছিল বৈশ্বিক তৈরি পোশাকশিল্পে বাংলাদেশের অবস্থান যেখানে নারী শ্রমিকদের কর্মসংস্থান রয়েছে। এ ছাড়া এই খাত বাংলাদেশকে লিঙ্গ সমতার র‍্যাঙ্কিংয়ে বিশ্বের ওপরের সারির ৫০ দেশের মধ্যে অবস্থান দিয়েছে, যেখানে ভারত ও পাকিস্তানের অবস্থান অনেক নিচে। বাংলাদেশ এতদঞ্চলে সম্ভাব্য বাণিজ্য সহায়ক দেশ হিসেবে বিকশিত হচ্ছে। এ ছাড়া এশিয়ার অন্যান্য দেশ, উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপে বাণিজ্য সম্পর্ক সম্প্রসারিত হচ্ছে। এগুলো বিবেচনায় নিয়েও বাংলাদেশকে দুটি বিষয়ে অধিকতর মনোযোগী হতে হবে, যা সামগ্রিক উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। প্রথমত, এক বর্ধনশীল অর্থনৈতিক বৈষম্য, যা দারিদ্র্য সীমার নিচে অবস্থানকারী একটা বৃহৎ জনগোষ্ঠীর সঙ্গে বিত্তবান বা সম্পদশালীদের মধ্যে তৈরি হচ্ছে। এবং দ্বিতীয়ত, দুর্নীতিপরায়ণ ও বিষাক্ত দ্বিপক্ষীয় রাজনীতি, যা জনগণের থেকে অর্থ কেড়ে নিচ্ছে। এসব বিষয়ে মনোযোগ ও উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ ক্রমবর্ধমান অর্থনীতিকে আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবে বলে আমার মনে হয়। বাংলাদেশ একটি আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে ও সম্পদশালী কূটনৈতিক অবস্থান নিয়ে বিকশিত হওয়ার সার্বিক সক্ষমতা রাখে।

বাংলাদেশ বিগত দুই দশক ধরে ৬.০+ শতাংশ হারে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার বজায় রেখেছে, যার মধ্যে বিগত ২০১৮-১৯ অর্থবছরে সর্বাধিক ৮.৫ শতাংশ ছুঁয়েছে। যদিও কোভিড-১৯ সংকটকালীন পরিস্থিতিতে ২০১৯-২০ অর্থবছরে এই হার কমে ৫.২ শতাংশে নেমেছে। তথাপি বাংলাদেশ ২০২০-২১ অর্থবছরের শেষে ৮.২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। এই লক্ষ্যমাত্রা কতটা বাস্তবিক বলে আপনি মনে করেন?

কবির হাসান: এটা সত্য যে বাংলাদেশ বিগত দুই দশকে এক প্রকার স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধি অর্জনে সক্ষম হয়েছে, তথাপি এখনো কোভিড-১৯–পরবর্তী সময়ের সামষ্টিক অর্থনৈতিক অবস্থা অনুমান করা কষ্টসাধ্য; কারণ, বাংলাদেশসহ গোটা বিশ্বের কাছেই কোভিড-১৯ একটি নতুন অভিজ্ঞতা। কোনো ভ্যাকসিন বা কার্যকরী চিকিৎসা প্রবর্তন না করা পর্যন্ত সারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকারই বড় আকারের সংযত পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হচ্ছে। যার ফলে বৈশ্বিক এক অর্থনৈতিক সংকোচন সাধিত হয়েছে। আমরা যদি সামষ্টিক অর্থনীতির খাতগুলোকে যা জিডিপিতে প্রভাব ফেলে যেমন অভ্যন্তরীণ খরচ, বিনিয়োগ (সরকারি ও বেসরকারি উভয়ই), সরকারি ব্যয় এবং নেট রপ্তানি ইত্যাদিকে খাত অনুযায়ী মূল্যায়ন করতে পারি, তাহলে আমরা লক্ষ্যমাত্রা সম্পর্কে ধারণা নিতে পারি। ব্র্যাকের এক সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, কোভিড ১৯ মহামারির কারণে সারা দেশের ৯৫ শতাংশ জনগোষ্ঠীর আয়ে প্রভাব পড়েছে। আয় কমে গেলে স্বাভাবিকভাবেই ব্যয় ও সংকুচিত হবে। যদিও গত তিন মাসের (জুলাই-সেপ্টেম্বর, ২০২০) রপ্তানি আয়ে ধনাত্মক ধারা দেখা যাচ্ছে, তথাপি মানুষের কর্মসংস্থান কমে যাওয়ার দরুন নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের চাহিদা পূরণে অপ্রতুলতা দেখে দিচ্ছে, বেসরকারি বিনিয়োগ কোভিড-১৯–এর অনিশ্চয়তার কারণে অনেকটা স্থবির হয়ে পড়েছে, সরকারি বিনিয়োগ এমনকি মেগা প্রজেক্টগুলোও; উদাহরণ হিসেবে মেট্রোরেল প্রকল্প কিছুটা শ্লথ হয়ে পড়েছে। তাই সমস্ত সামষ্টিক অর্থনৈতিক উপাদানগুলোর প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা ছাড়া জিডিপির এমন উচ্চ প্রবৃদ্ধি হার (৮.০+ শতাংশ) অর্জন করা চ্যালেঞ্জিং।

বিজ্ঞাপন

সরকার অর্থনীতির চাকা চালু রাখার স্বার্থে রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাকশিল্পসহ বিভিন্ন খাতে প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। লক্ষ্য অর্জনে এসব ভূমিকা কতটা সাফল্যের দেখা পেতে পারে?

কবির হাসান: সরকার ইতিমধ্যে রপ্তানিমুখী শিল্পে বিভিন্ন তহবিল সুবিধা ঘোষণা করেছে, যার মধ্যে আছে তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিক ও কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাবদ ৫ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা, রপ্তানি সহায়ক তহবিলকে ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার থেকে বৃদ্ধি করে ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীতকরণ, বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে রপ্তানির ক্ষেত্রে জাহাজীকরণের আগে পুনঃ অর্থায়ন স্কিমের আওতায় ৫ হাজার কোটি টাকার তহবিল গঠন। এসব পদক্ষেপের কারণে ইতিমধ্যে কিছু সুফল পাওয়াও যাচ্ছে, যেমন বিগত তিন মাসের (জুলাই-সেপ্টেম্বর, ২০২০) রপ্তানি আয় প্রায় ৯৮৯ কোটি মার্কিন ডলার, যা ২০১৯ সালের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ২ দশমিক ৫৮ শতাংশ বেশি।

এ ছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত বড় শিল্পগুলোর চলতি মূলধনবাবদ ঋণ হিসেবে ৩০ হাজার কোটি টাকা ঋণসুবিধা এবং কুটির, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে ভর্তুকি স্বল্প সুদহারে ২০ হাজার কোটি টাকা ঋণসহায়তা প্রদান করা হচ্ছে। যেহেতু এই তহবিল প্রদান করা হচ্ছে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে (সরকার সুদের ভর্তুকির অর্থ জোগান দিচ্ছে), তাই এই ঋণসুবিধা দেওয়া অনেকটা বাণিজ্যিক ব্যাংকের ঋণ পোর্টফোলিওর ওপরে নির্ভর করে, অর্থাৎ ব্যাংকগুলো এসব ক্ষতিগ্রস্ত খাতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও সুদৃঢ় লাভ-ক্ষতি পর্যালোচনা করে অগ্রসর হবে।

এ ছাড়া সম্প্রতি (এপ্রিল ০১, ২০২০) সরকার/বাংলাদেশ ব্যাংক সকল প্রকার ঋণ ও অগ্রিমের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ সুদহারের মাত্রা নির্ধারণ করেছে (রপ্তানি ক্রেডিট কার্ড ব্যতীত), যা ব্যাংকগুলোর প্রতি উপর্যুপরি চাপ সৃষ্টি করেছে, বিশেষ করে ক্ষুদ্র, স্বল্প ও মাঝারি শিল্পের ঋণের ক্ষেত্রে যেগুলোর উচ্চ প্রশাসনিক ও তদারকি খরচের কারণে।

বেকারত্ব একটি বড় সমস্যা হয়ে ধরা দিচ্ছে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে, যদিও বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির একটি। কোভিড-১৯ মহামারি এই বেকারত্বের পরিবেশকে আরও গুরুতর করে তুলছে। আপনি এই সমস্যাকে কীভাবে দেখেন।

কবির হাসান: যদিও বাংলাদেশ বিগত দুই দশক ধরে ৬.০+ প্রবৃদ্ধির হার বজায় রাখতে পেরেছে, তথাপি এই উচ্চ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারেনি। বিবিএসের সর্বশেষ শ্রমশক্তি প্রতিবেদন (এলএফএস) [২০১৬-১৭] অনুযায়ী যুব বেকারত্বের হার ১২ দশমিক ৩ শতাংশ। আমি আলাদা করে যুব কর্মসংস্থানের অভাবের কথা উল্লেখ করলাম কারণ বর্তমানে মোট জনসংখ্যার উল্লেখযোগ্য অংশ যুব সম্প্রদায় এবং মোট বেকারত্বের ৭৯ দশমিক ৬ শতাংশ যুব সম্প্রদায়।
এলএফএসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০৩-১০ সময়ে কর্মসংস্থান বেড়েছে ৩ দশমিক ১ শতাংশ, পক্ষান্তরে ২০১০-১৬ সময়কালে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি কমে দাঁড়িয়েছে বার্ষিক ১ দশমিক ৮ শতাংশে, যা শ্রমশক্তির ২ দশমিক ১ শতাংশ প্রবৃদ্ধির চেয়ে কম। সম্ভবত, তৈরি পোশাকশিল্পে অটোমেশনের কারণে অদক্ষ শ্রমিকের চাহিদা কিছু ক্ষেত্রে কমেছে। যেহেতু আরএমজি খাতে নারী শ্রমিক বেশি কাজ করে থাকেন, তাই ২০১০ থেকে নারী কর্মসংস্থানে একটা নিম্নমুখী ধারা লক্ষ করা যাচ্ছে।

কর্মসংস্থান তৈরিতে রাষ্ট্রের সাফল্য-অসাফল্যকে কীভাবে দেখছেন।

কবির হাসান: পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অধীন সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ পরিচালিত একটি সাম্প্রতিক [২০১৯] গবেষণায় উঠে এসেছে, রাষ্ট্র কর্মসংস্থান তৈরিতে কমই উন্নতি করতে পেরেছে এবং বর্তমানে আইএলওর প্রতিবেদন অনুযায়ী [বৈশ্বিক কর্মসংস্থান ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি: ধারা ২০১৮] ৯০ শতাংশ কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে অনিবন্ধিত খাতসমূহে। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিআইডিএস) জরিপমতে, বিশ্ববিদ্যালয় গ্র্যাজুয়েটদের মধ্যে বেকারত্বের হার ৩৮ দশমিক ৬ শতাংশ, যেখানে এলএফএসের তথ্যমতে ৪৬ শতাংশ বেকার জনগোষ্ঠী স্নাতক ডিগ্রিসম্পন্ন। আমি মনে করি, কর্মক্ষেত্রে চাহিদার সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার অসামঞ্জস্য এবং বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ ও কর্মক্ষেত্রের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব এ ধরনের বেকারত্বের পেছনে কারণ হিসেবে কাজ করে। এ ছাড়া বিগত কয়েক বছরের সামাজিক-রাজনৈতিক কারণে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগের স্থবিরতাও উল্লিখিত খাতে বেকারত্বের একটি বড় কারণ। সরকারি খাতেও ২০১৬-১৭ অর্থবছরে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে লক্ষ্যমাত্রার প্রায় অর্ধেক। সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা (২০১৬-২০২০) অনুযায়ী, উল্লিখিত সময়কালে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৯ লাখ, যেখানে অর্জিত হয়েছে মাত্র ১৭ দশমিক ৮ লাখ কর্মসংস্থান।

করোনায় কর্মহীন মানুষের ভবিষ্যৎ কী দেখেন।

কবির হাসান: যেহেতু অধিকাংশ কর্মজীবী জনসংখ্যা অনিবন্ধিত খাতে নিযুক্ত আছে, তাই এই কোভিড-১৯ প্রাদুর্ভাব সামগ্রিক কর্মসংস্থান পরিস্থিতিকে বৈরী করে তুলেছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের ধারণা অনুযায়ী, প্রায় ১৪ লাখ জনগোষ্ঠী কর্মহীন হয়ে পড়তে পারে এই মহামারির কারণে। সম্প্রতি বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঢাকা ও চট্টগ্রামে যথাক্রমে প্রায় ৭৬ শতাংশ ও ৫৯ শতাংশ কর্মসংস্থান হ্রাস পেয়েছে এই মহামারির কারণে। বাংলাদেশ তৈরি পোশাক উৎপাদনকারী ও রপ্তানিকারক অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) হিসাব অনুযায়ী, ১০৬টি তৈরি পোশাক কারখানা প্রায় ৭০ হাজার কর্মী ছাঁটাই করেছে। এ ছাড়া ৮২ শতাংশ কর্মীর আয় কমেছে কোভিড–পূর্ব অবস্থার আয়ের চেয়ে। অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান তাদের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা কমিয়েছে, যার মধ্যে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানও আছে। যাহোক, সরকার সম্প্রতি তিনটি বিশেষায়িত ব্যাংক—পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক, প্রবাসীকল্যাণ ব্যাংক ও কর্মসংস্থান ব্যাংক এবং একটি ঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান পল্লী কর্ম–সহায়ক ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে ক্ষুদ্র ও যুব উদ্যোক্তাদের জন্য ২ হাজার কোটি টাকার একটি ঋণ তহবিল গঠন করেছে। এ ছাড়া ১০০ কোটি টাকার একটি বিশেষ বাজেট তহবিল গঠন করা হয়েছে গরিব ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আত্মকর্মসংস্থান সুবিধা বৃদ্ধি করার লক্ষ্যে।

একজন বাংলাদেশি-আমেরিকান হিসেবে ইসলামি অর্থনীতি নিয়ে বিশ্বব্যাপী কাজ করেছেন। গুণগত মান প্রশ্নে সাধারণ ব্যাংকিং থেকে বাংলাদেশের ইসলামি ব্যাংকিং কী করে আলাদা?

কবির হাসান: বাংলাদেশে ইসলামি অর্থায়নের পথচলা শুরু ১৯৮৩ সালে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। ইসলামি অর্থায়ন আয়তনে বাংলাদেশের মোট ব্যাংকিং খাতের প্রায় ২৫ শতাংশ এবং এর বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার প্রায় ১৪ শতাংশ। এ ছাড়া প্রচলিত ব্যাংকিং খাতের তুলনায় ইসলামি অর্থায়নে বিনিয়োগে মূলধনে মুনাফার হার বা রিটার্ন অন ইকুইটি বেশি এবং খেলাপি ঋণের পরিমাণও তুলনামূলকভাবে কম।
ইসলামিক ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস বোর্ডের ২০২০–এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ডিসেম্বর ২০১৯ অবধি বাংলাদেশে ৮টি পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ব্যাংক, ১৭টি প্রচলিত ব্যাংক যেগুলোর ইসলামি ব্যাংকিং শাখা বা সুবিধা (যার মধ্যে ২টিতে শাখা ও সুবিধা দুই–ই আছে) নিয়ে ইসলামি অর্থায়ন কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। এ ছাড়া তিনটি প্রচলিত ব্যাংক (যেগুলো ইসলামি ব্যাংকিং শাখা বা সুবিধার মাধ্যমে ইসলামিক অর্থায়ন কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে) পূর্ণাঙ্গ রূপে ইসলামি ব্যাংকিং চালানোর সনদ পেয়েছে। আমানত ও বিনিয়োগের হিসাব অনুসারে ২০১৯–এর ডিসেম্বর মাস শেষের স্থিতি অনুযায়ী, বাংলাদেশের মোট ব্যাংকিং খাতের এক–চতুর্থাংশ ইসলামি ব্যাংকিং খাতের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে। ২০১৮ থেকে ২০১৯ সালে বাংলাদেশের মোট আমানতে প্রবৃদ্ধি ১২ দশমিক ৫৭ শতাংশ, যখন মোট বিনিয়োগে প্রবৃদ্ধি ১০ দশিমক ২৩ শতাংশ। খেলাপি ঋণ ২০১৯ সালে উল্লেখযোগ্য আকারে কমেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও প্রচেষ্টার ফলে খেলাপি ঋণ কমানোর পাশাপাশি ইসলামি ব্যাংকিং খাতের আমানত ও বিনিয়োগের হারে প্রবৃদ্ধি সম্ভব হয়েছে।

ইসলামি অর্থায়নসংক্রান্ত কোনো আইন বাংলাদেশের সংসদ করেনি। মন্তব্য করুন।

কবির হাসান: সম্পদের দিক থেকে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক ইসলামি ব্যাংকিং র‍্যাঙ্কিং-এ ১১তম অবস্থানে আছে। আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ইসলামি অর্থায়নের একটি সমন্বিত প্রক্রিয়া এবং বাংলাদেশে ইসলামি অর্থায়ন, সামগ্রিক আর্থিক অন্তর্ভুক্তি কার্যক্রমে গোটা বিশ্বের কাছেই একটি রোল মডেল। দেশের বেসরকারি ব্যাংকিং খাতের ২৫ শতাংশ, বিশ্বের ইসলামি ব্যাংকিং কার্যক্রমের ৩৫ শতাংশ গ্রাহক এবং বৈশ্বিক ইসলামি ক্ষুদ্রঋণের ৫০ শতাংশ নিয়ে বাংলাদেশ গোটা বিশ্বের সামগ্রিক ইসলামি অর্থায়ন খাতের এক উল্লেখযোগ্য অংশীদার। ইসলামি ব্যাংকগুলো তার মোট বিনিয়োগের ২৮ শতাংশ করে থাকে দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) কার্যক্রমে। বাংলাদেশ ব্যাংকও কৃষিভিত্তিক এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে শরিয়াহভিত্তিক পুনঃ অর্থায়ন পরিষেবা চালু করেছে। বাংলাদেশ ইসলামি ব্যাংকগুলোর স্বল্পমেয়াদি তারল্য ব্যবস্থাপনায় স্বল্পমেয়াদি সুকুক বন্ড চালু করেছে। এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংক প্রথম করপোরেট মুদারাবা দীর্ঘস্থায়ী বন্ড (এমপিবি) চালু করেছে, যা শুধু এর স্থায়িত্বকাল ব্যতীত অনেকাংশেই সুকুকের অনুরূপ।
ইসলামি ব্যাংকগুলো বিভিন্ন ঝুঁকি-বণ্টন চুক্তি যেমন মুরাবাহা, মুদারাবা এবং মুশারাকার মাধ্যমে বাংলাদেশে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি প্রক্রিয়াকে উৎসাহিত করছে। প্রচলিত ব্যাংকিং পরিষেবার পাশাপাশি ইসলামি ব্যাংকগুলো বাংলাদেশে সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিকাঠামোতে প্রক্রিয়াগত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হচ্ছে। কিন্তু এখনো কোনো ইসলামি ব্যাংকিং বা অর্থায়নের নির্দিষ্ট আইন নেই, বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন প্রবিধি ও সার্কুলারের মাধ্যমেই পরিচালিত বা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। আর দেরি না করে এখনই বাংলাদেশে একটি পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ব্যাংকিং আইন ও নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্যও আলাদা আইন করার উপযুক্ত সময়। বাংলাদেশ সরকার ও আর্থিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠানকে এ–সংক্রান্ত আইন প্রণয়নে সহায়তা করতে আমি ব্যক্তিগতভাবে সর্বদা আগ্রহী।

ইসলামি অর্থায়ন কেন বৈশিষ্ট্যপূর্ণ?

কবির হাসান: ইসলামি অর্থায়ন শরিয়াহভিত্তিক নিয়মনীতি কেন্দ্র করে পরিচালিত হয়, তাই মুসলিম বিনিয়োগকারীদের কাছে শরিয়াহসম্মত মূলধনে বিনিয়োগের মাধ্যমে আর্থিক সেবার সুযোগ এবং অমুসলিমদের জন্যও নৈতিকতাসম্পন্ন প্রক্রিয়ায় বিনিয়োগের সুযোগ পাওয়া যায়। ইসলামি অর্থায়নের গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো, শরিয়াহ বিধান অনুযায়ী উচ্চ নৈতিক মূল্যবোধ সমুন্নত রাখা, সমাজে সম্পদের বণ্টনের সাম্যতা বিধানে কাজ করা এবং ধর্মীয় বিশ্বাস ও মূল্যবোধ বজায় রেখে জীবন, পরম্পরা, বুদ্ধিবৃত্তি ও সম্পদকে সুরক্ষিত রাখা। সুদ (রিবা), জুয়া (মাইসির) ও অস্বচ্ছতা (ঘারার) শরিয়াহ আইনে নিষিদ্ধ। এসব উচ্চ মানের জন্যই ইসলামি অর্থায়ন খাতের প্রবৃদ্ধির হার উল্লেখযোগ্য ও ত্বরিত গতিসম্পন্ন হিসেবে প্রতীয়মান। ইসলামি ব্যাংকিংয়ের নীতি, বেতন বা মজুরির সাম্য, পুরস্কার কাঠামো এবং আর্থসামাজিক সাম্য প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখে। বর্তমানে অনেকেই বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এমন সম্পদে বিনিয়োগ করতে চায়, যা সমাজের কাজে লাগবে এবং যা একটি নৈতিক কাঠামো মেনে চলবে। আর এসব বিষয়ের সমন্বয় ঘটছে বলেই আন্তর্জাতিক কাঠামোতেই ইসলামি অর্থায়ন খাতে প্রবৃদ্ধি সাধিত হচ্ছে।

ইসলামি ব্যাংকগুলো কীভাবে কোভিড-১৯ সংশ্লিষ্ট সংকটে ভূমিকা রাখতে পারে?

কবির হাসান: বাংলাদেশে বর্তমানে ৮টি ব্যাংক আছে, যেগুলো ইসলামি ব্যাংকিং (শরিয়াহ আইন মেনে) নিয়ম অনুযায়ী পরিচালিত হয়। যার মধ্যে ৭টিই সক্রিয়ভাবে করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা বা সিএসআর কার্যক্রমের মাধ্যমে বৃহৎ সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, এই কার্যক্রমের সমন্বিত ব্যয় প্রায় ৫২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা একটা উল্লেখযোগ্য পরিমাণ; তথাপিও সব প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত সিএসআর কার্যক্রমের উদ্যোগ নিলে আরও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখা সম্ভব। বহু উন্নয়ন গবেষণায় দেখা গেছে, সীমিতসংখ্যক খাতে অধিক সহায়তা অনেক ক্ষেত্রেই বেশি খাতে অল্প করে সহায়তার চেয়ে বেশি উপযোগী বা ভূমিকা রাখতে সক্ষম। বিশেষ করে এই মহামারি থেকে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আর্থসামাজিক বৈষম্য প্রশস্ত হচ্ছে; যা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তারল্যসংকট বা মুদ্রাপ্রবাহে স্বল্পতা আনতে পারে। এহেন পরিস্থিতে ইসলামি ব্যাংকগুলোর সমন্বিত প্রয়াশ, সংকট মোকাবিলায় ভালো ভূমিকা রাখতে পারে।

কিন্তু ইসলামি অর্থায়ন নিয়ে বিরুদ্ধমতও আছে, এমনকি মুসলিম অর্থনীতিবিদদের মধ্যেও।

কবির হাসান: ধন্যবাদ হ্যাঁ, রিবা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ধনাত্মক অর্থেই একটি বিতর্ক আছে যে আধুনিক অর্থব্যবস্থার সুদ আর পবিত্র কোরআনে উল্লিখিত রিবা একই কি না? এটা একটা ধর্মতাত্ত্বিক বিতর্ক, যা চলতেও থাকবে। আমি যেটা খোঁজার চেষ্টা করি, সেটা হলো রিবার অর্থনৈতিক অবস্থানটা কী এবং কীভাবে এটি অর্থনীতিকে প্রভাবিত করছে? এ বিষয়ে আমার যেটা মনে হয়, তা হলো যারা ইসলামি অর্থায়নকে বিরুদ্ধাচরণ করে, তাদের পবিত্র কোরআন, হাদিস ও ইসলামি আইন শাসন সম্পর্কে সীমিত বোধগম্যতা আছে। আমার কাছে এই বিরুদ্ধাচরণকারীর সংখ্যাটা গৌণই মনে হয়।

কিন্তু চলমান ইসলামি ব্যাংকিং নিয়েও সমালোচনা আছে। বলা হয়, পশ্চিমা ব্যাংকিংয়ের সঙ্গে মিল অনেক।

কবির হাসান: হ্যাঁ, বর্তমানে ইসলামি ব্যাংকিংয়ের অনেক রীতিতেই পশ্চিমা ব্যাংকিং কার্যক্রমের সঙ্গে সাদৃশ্য দেখতে পাওয়া যায়, কিন্তু এসব কার্যক্রমের ক্ষেত্রেও ইসলামি শরিয়াহ পরিপন্থী কিছু নেই। এখানে আবার আমরা ওই ‘ফর্ম বনাম সাবস্ট্যান্স’বিতর্কে এসে পৌঁছাই, যা সুদবিহীন ব্যাংকিং ব্যবস্থার এক প্রকার ব্যষ্টিক বনাম সামষ্টিক পর্যালোচনা। পন্থাগত দিক দিয়ে ইসলামি ব্যাংকিং বৈধ, কিন্তু প্রক্রিয়াগত দিক দিয়ে তারা প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার অনেকটাই সদৃশ। এটা এমনই থাকবে কারণ পশ্চিমা ব্যাংকিং কাঠামো বা মডেল ইসলামি ব্যাংকিং বাস্তবায়নের জন্য অনুকূল নয়। ইসলামি অর্থায়ন শুধু ব্যাংকিংই নয়, যা আমরা অনেক দেশেই দেখতে পাই। স্বভাবগতভাবেই ব্যাংকিং বিষয়টা অনেকটা স্বল্পমেয়াদি, হোক সেটা ইসলামি বা পাশ্চাত্য ধারা মেনে চলা। ইসলামি অর্থায়নের অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে ব্যাংকিং, মূলধনি বাজার, ইনস্যুরেন্স, সামাজিক অর্থায়ন, জাকাত, ওয়াক্ফ এবং দাতব্য ক্ষেত্রসমূহ। ইসলামি অর্থায়ন সব সময় কাজ করে ঝুঁকি বণ্টনের বিষয়ে, শুধু দেনাদার ও পাওনাদারের লেনদেনের বিষয় হিসেবে নয়। আমাদের নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানকেও ইসলামি অর্থায়নের আওতাভুক্ত করে প্রতিষ্ঠা করতে হবে, না হলে শুধু ইসলামি ব্যাংকিং কার্যক্রম দিয়েই ইসলামি অর্থায়নব্যবস্থা সম্পন্ন করা সম্ভব হবে না। এ ছাড়া ইসলামি ব্যাংকিং কার্যক্রম যেহেতু সম্পদভিত্তিক বিনিয়োগ, সেহেতু এটি মাত্রাতিরিক্ত দায় তৈরিতে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, যা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে দীর্ঘ মেয়াদে বাধা সৃষ্টি করে।

বাংলাদেশের ইসলামি অর্থায়ন খাত বিষয়ে আপনার কোনো সুনির্দিষ্ট পরামর্শ বা মতামত আছে?

কবির হাসান: বাংলাদেশ ইতিমধ্যে বৈশ্বিক ইসলামি অর্থায়ন খাতের এক উল্লেখযোগ্য অংশীদার হয়ে আছে। কিন্তু এখনো অনেক কিছু করার বাঁকি আছে। প্রথমত, বাংলাদেশ সরকারের এই খাত নিয়ে সুনির্দিষ্ট আইনকানুন ও নিয়মনীতি নির্ধারণ ও প্রয়োগ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, এই খাতের টেকসই উন্নয়নের জন্য চারটি ক্ষেত্রে শূন্যস্থান পূরণ করতে হবে।
তথ্য ও প্রচারস্বল্পতা: সচেতনতা ও সঠিক তথ্য প্রচারের মাধ্যমে ইসলামি অর্থায়নসংশ্লিষ্ট ভুল ধারণা, ভুল বোঝা এবং ভুল তথ্যকে দূর করতে হবে। আস্থার অভাব: সামাজিক ব্যবসা ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব আনার মতো বিনিয়োগের মাধ্যমে ইসলামি অর্থায়ন খাতের অংশীদারদের মধ্যে অনাস্থা দূর করতে কাজ করতে হবে। উদ্ভাবনী চিন্তার অভাব: সামষ্টিক ও ব্যষ্টিক মাকসিদের মধ্যে সামঞ্জস্য বজায় রাখতে হবে। তথাকথিত ফর্ম বনাম সাবস্ট্যান্সের (অর্থায়ন প্রকৌশল) সামঞ্জস্য বিধান করতে হবে। মেধার সমন্বয়ের অভাব: একঝাঁক নতুন ও উদ্যমী মেধাবী বিশেষজ্ঞকে তৈরি বা মূল্যায়ন করতে হবে, যারা ইসলামি রীতিনীতি ও আইনকানুন ভালোভাবে জানবে, অন্য প্রচলিত অর্থায়ন সম্পর্কেও বিশদ ধারণা রাখবে এবং একটা উপযোগী সমন্বয় সাধনে মেধার প্রয়োগ করবে।

বিজ্ঞাপন

ইসলামি ব্যাংকিংয়ের প্রভাব দেশ থেকে দেশে কেমন?

কবির হাসান: উদীয়মান মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলো বা অন্যান্য দেশেও ইমপ্যাক্ট ইনভেস্টিং বা প্রভাব বিনিয়োগ খুব ভালোভাবে প্রায়োগিক, তাই ইসলামি অর্থায়নের প্রভাব বিনিয়োগকে ভিত্তি হিসেবে ধরে এসব দেশে এগোতে হবে। এমন অনেক দেশেই যেমন বাংলাদেশ, পাকিস্তান, মিসর, মরক্কো, নাইজেরিয়া ও কাজাখস্তান তাদের জনগণের চাহিদা, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং অসম্পর্কিত বিনিয়োগের প্রত্যাবর্তন মাথায় রেখে বিনিয়োগ খাত নির্ধারণে বাধ্য হচ্ছে। একই সঙ্গে এসব দেশের সামাজিক দিকগুলোও বিবেচনায় নিতে হবে। এসব দিক অনেক বড় বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলোও (যেমন ইসলামিক উন্নয়ন ব্যাংক গ্রুপ, আন্তর্জাতিক অর্থায়ন করপোরেশন, পুনর্নির্মাণ ও উন্নয়ন সংশ্লিষ্ট ইউরোপিয়ান ব্যাংক, কমনওয়েলথ উন্নয়ন করপোরেশন এবং বহির্বিশ্বে বেসরকারি বিনিয়োগ করপোরেশন) বিবেচনায় নেয়, যখন এসব বাজারে বিনিয়োগ করে থাকে।

ইসলামি অর্থায়ন ও ব্যাংকিংয়ে প্রয়োগের জন্য কীভাবে নিয়মকানুন গ্রহণ করা হয়েছে?

কবির হাসান: নিয়ন্ত্রণকারী অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য সবচেয়ে প্রচলিত আন্তর্জাতিক মানদণ্ড নির্ধারিত হয় ব্যাংকিং তদারকি সংশ্লিষ্ট ব্যাসেল কমিটির দ্বারা। এ ছাড়া আইএফএসবি এবং এএওআইএফআইও বহুল প্রচলিত। জাতীয় শরিয়াহ বোর্ড এবং জাতীয় শরিয়াহ পরিপালন পদক্ষেপসমূহ ইসলামি অর্থায়নের প্রয়োজন পূরণে ভালো ভূমিকা রাখতে পারে। ইসলামি অর্থায়নের অবকাঠামো উন্নয়ন, ঋণ-সম্পদের যথাযথ মূল্যায়ন এবং যথাযথ অনুশাসন নিশ্চিতকল্পে করবিধিও আরোপ করা প্রয়োজন। বাংলাদেশ সরকার এ ক্ষেত্রে মালয়েশিয়া, তুরস্ক এবং ইন্দোনেশিয়ার বিধিবিধান পর্যালোচনা করে বা ধারণা নিয়ে নিজস্ব ইসলামি ব্যাংকিং এবং অর্থায়নের আইনকানুন নির্ধারণ করতে পারে।

প্রথম আলো: আপনাকে ধন্যবাদ।

কবির হাসান: ধন্যবাদ

মন্তব্য পড়ুন 0