বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

প্রথম আলো: কিন্তু নিয়মকানুন বা স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার বিষয়টি আসলে কতটা কার্যকর করা সম্ভব?

আবু জামিল ফয়সাল: এটা কতটুকু সম্ভব তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। অতীতেও এটা খুব কার্যকর করা যায়নি। গণপরিবহনের ক্ষেত্রে এক সিট খালি রাখার কথা বলা হচ্ছে। তা হোক, কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে মাস্ক পরা। আমি মনে করি, সরকারের উচিত শুধু মাস্ক নিয়ে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা। সব জোর এর ওপর দেওয়া। অনেক বিধিনিষেধ আমরা জারি করি, যেগুলো কার্যকর করা যায় না। কিন্তু মাস্কের বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে মাস্ক ব্যবহারের বিষয়টি নিশ্চিত করা অনেকটাই সম্ভব। প্রয়োজনে আমরা বিনা পয়সায় মাস্ক সরবরাহ করতে পারি। এতে কত টাকা লাগবে? ১০০ কোটি টাকা এই খাতে বরাদ্দ করুন, ডিসি–এসপিদের কাছে মাস্ক দিন, তারা স্থানীয় পর্যায়ে বিতরণ করুক। স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ করা যেতে পারে। আমি মনে করি, মাস্ক নিয়ে একটি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা উচিত। সরকারের উচিত মাস্ক ব্যবহারে সবাইকে উৎসাহিত ও উদ্বুদ্ধ করতে সম্ভাব্য সব মাধ্যমকে কাজে লাগানো। তরুণ ও যুবকদের এ কাজে সম্পৃক্ত করতে হবে। ছাত্রছাত্রী, রেড ক্রিসেন্ট, গার্ল গাইডস এদের কাজে লাগানো যায়। স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে তাদের সামান্য সম্মানী দেওয়া যেতে পারে। এদের মাধ্যমেই কিছু করা সম্ভব।

প্রথম আলো: ঈদ পর্যন্ত আট দিন যে শিথিলতা দেওয়া হলো, মানুষের চলাচলের বিধিনিষেধ যে তুলে দেওয়া হলো, এর ফলাফল কী?

আবু জামিল ফয়সাল: আমার মনে হয়, সংক্রমণ আরও বাড়বে। আমরা সবাই সংক্রমিত হয়ে যাব। এমন পরিস্থিতিতে যাতে আমরা গুরুতর অসুস্থ হয়ে না যাই, সে ব্যাপারে আমাদের সচেতন থাকতে হবে। তবে মৃত্যু বাড়বে।

প্রথম আলো: তার মানে সব প্রকৃতির ওপর ছেড়ে দিতে হবে?

আবু জামিল ফয়সাল: তা নয়। আমাদের কিছু করার আছে। যেমন আমরা ব্রিদিং এক্সারসাইজ করতে পারি। ফুসফুসের যে ব্যায়াম আছে, তা করতে পারি। আমরা সবাই যদি সচেতন হই, এসব এক্সারসাইজ করি, তাহলে এখন অক্সিজেনের জন্য যে সংখ্যায় রোগীকে হাসপাতালে যেতে হচ্ছে, তা অন্তত ২০ ভাগ কমে যাবে। যথাযথ নিয়ম মেনে এসব এক্সারসাইজ করা গেলে ফুসফুসের সক্ষমতা বাড়বে।

প্রথম আলো: এই যে আট দিনের জন্য বিধিনিষেধ শিথিল করা হলো, আপনি বলছেন এতে সংক্রমণ বাড়বে, মৃত্যু বাড়বে, আমাদের সামনে কি আর কোনো পথ ছিল না?

আবু জামিল ফয়সাল: আর কোনো পথ ছিল কি না জানি না। এই যে ৫০-৬০ লাখ লোক বাড়ি যায়, তাদের আপনি কী করবেন? বিধিনিষেধ দিয়ে তো আগে তাদের ঠেকানো যায়নি। এই মানুষগুলো এখন ট্রেনে–বাসে চড়বে, তারা যাতে মাস্ক পরে চলে, সেটা নিশ্চিত যেন করা যায়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

প্রথম আলো: ঈদের কারণে আট দিনের শিথিলতার পর আবার ১৫ দিনের জন্য কঠোর বিধিনিষেধের ঘোষণা দিয়ে রেখেছে সরকার। তখন তৈরি পোশাকসহ শিল্পকলকারখানাও বন্ধ থাকবে বলা হয়েছে। এর কী প্রভাব পড়তে পারে?

আবু জামিল ফয়সাল: বিধিনিষেধ কতটা শক্ত ও সফলভাবে কার্যকর করা যাবে, তার ওপর ফলাফল নির্ভর করবে। সংক্রমণ যখন ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়, তখন সবকিছু বন্ধ করে দিলে সংক্রমণ স্বাভাবিকভাবেই কমবে। কিন্তু আমরা এরই মধ্যে বহু ধরনের বিধিনিষেধ দেখেছি। বলা হচ্ছে কঠোর, কিন্তু বাস্তবে তেমন কিছু নেই। দেড় বছরের বেশি সময় ধরে আমরা নানা ধরনের বিধিনিষেধ বা লকডাউনের কথা বলেছি, কিন্তু তা কার্যকর করা হয়নি। আমার তো মনে হয় আমরা বিধিনিষেধ বিষয়টিকে খেলো করে ফেলেছি।

প্রথম আলো: আপনি আগে বলেছেন, সংক্রমণ যেভাবে বাড়ছে, তাত আমরা সবাই হয়তো সংক্রমিত হয়ে যাব। সে ক্ষেত্রে তো হার্ড ইমিউনিটি হয়ে যাওয়ার কথা।

আবু জামিল ফয়সাল: ৮০ ভাগ লোক সংক্রমিত হলে অর্থাৎ এই সংখ্যক লোকের মধ্যে অ্যান্টিবডি তৈরি হলে বাকি ২০ ভাগের মাধ্যমে সংক্রমণের ঝুঁকি কমে যায়। এমন পরিস্থিতিকে হার্ড ইমিউনিটি বলা হয়। এখন বাংলাদেশে যে মাত্রায় সংক্রমণ চলছে, তাতে এই ধাক্কায় যদি সবাই সংক্রমিত হয়ে যায়, তবে হার্ড ইমিউনিটি হতে পারে। একই সঙ্গে এখন আবার নতুন করে টিকা দেওয়া শুরু হয়েছে। টিকা দেওয়ার গতি যত জোরদার হবে, হার্ড ইমিউনিটি তৈরির সম্ভাবনাও তত বাড়বে।

প্রথম আলো: আমরা তো দেখছি দুই ডোজ টিকা নেওয়ার পরও কেউ কেউ আক্রান্ত হয়েছেন।

আবু জামিল ফয়সাল: কিছু ক্ষেত্রে হয়তো তা হয়েছে। কিন্তু দুই ডোজ টিকা নেওয়ার পর কেউ করোনায় আক্রান্ত হলে তার মৃত্যু নেই বললেই চলে। রোগীর অবস্থা ক্রিটিক্যাল হওয়ার আশঙ্কাও অনেক কমে। অক্সিজেন বা হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার প্রয়োজনীয়তাও অনেক কমে যায়। সবকিছু মিলিয়ে টিকার ব্যাপারে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। আমরা দেখছি যে টিকা নেওয়ার ব্যাপারে মানুষের আগ্রহ ও আস্থা আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে।

প্রথম আলো: দুই ডোজ টিকার পর বুস্টার ডোজের বিষয়টি এখন আলোচনায় এসেছে। বুস্টার ডোজ কতটা জরুরি?

আবু জামিল ফয়সাল: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে কোনো নির্দেশনা পাওয়া যায়নি। তবে অনেক দেশে এ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। এটা আমাদের মনে রাখতে হবে যে করোনাভাইরাস পৃথিবী থেকে সহজে বিদায় নিচ্ছে না। এটা থাকবে। হয়তো ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো থেকে যাবে। পশ্চিমের দেশগুলোতে যে প্রতিবছর ইনফ্লুয়েঞ্জার ডোজ নেয়, এ ক্ষেত্রেও হয়তো তেমন হবে।

প্রথম আলো: সামনে নতুন ঢেউয়ের আশঙ্কা করছেন কি?

আবু জামিল ফয়সাল: এখন আমরা একটি ঢেউয়ের মধ্যে আছি। সেটা আগে কমতে হবে, তখন নতুন ঢেউয়ের প্রশ্ন আসবে। করোনাভাইরাসের যেহেতু কমিউনিটি ট্রান্সমিশন হয়ে গেছে, তাই নতুন নতুন ঢেউ আসতেই থাকবে। ঈদের আগে যদি সংক্রমণের প্রবণতা কিছু কমের দিকে থাকে এবং ঈদের পর যদি আবার তা বেড়ে যায়, তবে তাকে নতুন ঢেউ হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে। আমার ধারণা, আগস্টের মাঝামাঝি আমরা সংক্রমণের একটি চূড়ায় পৌঁছাতে পারি।

প্রথম আলো: করোনা সংক্রমণ ও এর রোগী ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশ এখন ব্যতিব্যস্ত। করোনার বাইরে আমাদের জন্য সামনে নতুন কোনো স্বাস্থ্যঝুঁকির আশঙ্কা রয়েছি কি? আপনি কোন দিকটিতে নজর রাখা জরুরি বলে মনে করছেন?

আবু জামিল ফয়সাল: এখন কোভিড মোকাবিলায় আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি। আমরা যে কায়দায় লকডাউন বা বিধিনিষেধ কার্যকর করার চেষ্টা করছি, তার মাধ্যমে হয়তো অবস্থার খুব পরিবর্তন ঘটানো যাবে না। টিকার মাধ্যমে হয়তো একসময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসবে। কিন্তু আমার মনে হয় সামনে আমাদের যক্ষ্মার দিকে গভীর মনোযোগ দিতে হবে। বিসিজি টিকা আবিষ্কার হয়েছে আজ থেকে ১০০ বছর আগে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে আমাদের দেশে এখনো প্রতি ১ লাখে ২২১ জন যক্ষ্মায় আক্রান্ত হচ্ছে। এই সংখ্যা আমরা কোনোভাবেই কমাতে পারছি না। যথাযথ চিকিৎসা না পেলে যক্ষ্মা রোগীরা মাল্টি ড্রাগ রেজিস্ট্যান্স হয়ে উঠতে পারে; যা আমাদের দেশের জন্য বিপজ্জনক স্বাস্থ্যঝুঁকি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। নতুন বিসিজি টিকা উৎপাদনের দিকে আমাদের মনোযোগী হতে হবে। বাংলাদেশের উচিত এ ব্যাপারে চেষ্টা শুরু করা।

প্রথম আলো: আপনাকে ধন্যবাদ।

আবু জামিল ফয়সাল: আপনাকেও ধন্যবাদ।

সাক্ষাৎকার থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন