শোকো ইশিকাওয়া জাতিসংঘের সংস্থা ইউএন উইমেনের বাংলাদেশ প্রতিনিধি। বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়ন, অগ্রগতি এবং সাম্প্রতিক ধর্ষণপ্রবণতা নিয়ে তিনি প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মশিউল আলম

default-image

প্রথম আলো: ১৯৯৫ সালে চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে নারীবিষয়ক চতুর্থ আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। তারপর ২৫ বছর চলে গেছে। এ সম্মেলনের ২৫তম বর্ষপূর্তিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, নারীর ক্ষমতায়নের পথে বাংলাদেশ ব্যাপক অগ্রগতি সাধন করেছে। ইউএন উইমেনের বাংলাদেশ প্রতিনিধি হিসেবে এ বিষয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন কী? নারীর ক্ষমতায়নে বাংলাদেশ আসলে কতটা এগিয়েছে?

শোকো ইশিকাওয়া: ২৫ বছর যথেষ্ট সময়। এ সময়ের মধ্যে বাংলাদেশে এবং সারা পৃথিবীতে নারী উন্নয়নের ক্ষেত্রে বেশ অগ্রগতি হয়েছে। বাংলাদেশ সরকার খুব জোরালো উদ্যোগ নিয়েছে, বিশেষত মেয়েদের শিক্ষার ক্ষেত্রে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে মেয়েশিশুরা ছেলেশিশুদের প্রায় সমান হয়েছে। মাধ্যমিক স্তরেও মেয়েশিশুদের শিক্ষাবৃত্তি ও অন্যান্য উদ্যোগের ফলে বেশ অগ্রগতি হয়েছে। তবে বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ার হার এখনো বেশি। নারীদের অগ্রগতির অন্য ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে আছে স্বাস্থ্য ও জীবনমান। ২০০০ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত প্রসূতি ও মাতৃমৃত্যুর হার কমেছে প্রায় ৬০ শতাংশ। কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের নারীরা বেশ এগিয়েছেন। ১৯৯৫ সালের দিকে এ দেশে নারীদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ ছিল প্রায় ১০ শতাংশ আর এখন তা ৩৬ শতাংশ। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় এগিয়ে গেছে। এ ক্ষেত্রে এ অঞ্চলের গড় প্রায় ২৬ শতাংশ। বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পে তো নারীরাই প্রধান শ্রমশক্তি। সব মিলিয়ে গত ২৫ বছরে বাংলাদেশ নারী উন্নয়নের পথে অনেক অগ্রসর হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

প্রথম আলো: এসব কীভাবে সম্ভব হলো? সরকারের প্রচেষ্টায়, নাকি বাংলাদেশের সমাজের নিজের অন্তর্নিহিত শক্তিই নারীদের ক্রমে এগিয়ে নিয়ে গেছে?

শোকো ইশিকাওয়া: সরকারের নীতিগত পদক্ষেপের যথেষ্ট ভূমিকা আছে। বাংলাদেশে ২০১১ সালে গৃহীত জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতিকে বলা যেতে পারে বেইজিং প্ল্যাটফর্ম অ্যান্ড অ্যাকশন প্ল্যানের এক বিশদ জাতীয় সংস্করণ, যেটা আজ থেকে ২৫ বছর আগে গৃহীত হয়েছিল। নারীর ক্ষমতায়ন, নারী অধিকার, পুরুষের সঙ্গে নারীর সমতা ইত্যাদি বিষয়ে বাংলাদেশের বেশ ব্যাপক, বিস্তৃত, বিশদ নীতিগত রূপরেখা (পলিসি ব্লুপ্রিন্ট) আছে। এ ছাড়া গৃহের অভ্যন্তরে নারীর প্রতি সহিংস আচরণ, বাল্যবিবাহ ইত্যাদি কমানোর বিষয়েও বাংলাদেশের জাতীয় কর্মপরিকল্পনা ক্রিয়াশীল আছে। এভাবে যদি নীতিগত ও আইনগত রূপরেখাগুলোর দিকে তাকানো হয়, তাহলে দেখা যাবে, বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়ন ও উন্নয়নের লক্ষ্যে শক্তিশালী উদ্যোগ আছে। তা ছাড়া এ দেশে একটি শক্তিশালী নাগরিক সমাজ আছে, যারা সরকারের ওপর ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করে চলেছে।

প্রথম আলো: বাংলাদেশে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নারীদের অংশগ্রহণ যত বেড়েছে, তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে নারীর সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন ঘটেনি। নারীর অর্থনৈতিক অবস্থা যেমনই হোক না কেন, পরিবারে ও সমাজে তার অধীনতা থেকেই যাচ্ছে। সামাজিক-সাংস্কৃতিক দিক থেকে পুরুষের প্রবল আধিপত্যের কারণে জেন্ডার ইকুয়ালিটি বা লৈঙ্গিক সমতা অর্জনের ক্ষেত্রে তেমন অগ্রগতি ঘটছে না। এ বিষয়ে আপনি কী বলেন?

শোকো ইশিকাওয়া: আপনি ঠিক বলেছেন। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নারীর অংশগ্রহণ বেড়ে যদিও ৩৬ শতাংশ হয়েছে, তবু তঁাদের ক্ষমতায়নে ঘাটতি রয়ে গেছে। কারণ, তাঁরা এখনো খুবই কম মজুরিতে কাজ করছেন, তঁাদের মধ্যে দক্ষ শ্রমিকের সংখ্যাও কম। এমনকি যে তৈরি পোশাকশিল্পে নারীরাই প্রধান শ্রমশক্তি, সেখানেও তাঁরা পড়ে আছেন নিচের দিকে। ব্যবস্থাপক বা সুপারভাইজার পর্যায়ে তাঁরা নেই বললেই চলে। সুতরাং এটা সত্য যে এভাবে নারীর যথেষ্ট ক্ষমতায়ন ঘটছে না। আর অর্থনীতির অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত নারীর সংখ্যা অনেক বেশি। তঁাদের আয় ন্যূনতম, তঁারা কোনো সামাজিক সুরক্ষাও পাচ্ছেন না। কর্মরত নারীদের প্রতি ১০ দশের মধ্যে ৯ জনেরই এ অবস্থা।

প্রথম আলো: বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের এক গবেষণায় দেখা গেছে, যে কাজ করে একজন পুরুষ ৪০০ টাকা মজুরি পান, সেই একই কাজ করে একজন নারী পান ২৫০ টাকা। অর্থাৎ লৈঙ্গিক বৈষম্য শুধু সামাজিক-রাজনৈতিক ক্ষেত্রেই নয়, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও ব্যাপক।

শোকো ইশিকাওয়া: হ্যাঁ, এরকম তো আছেই। এমনকি ২৯ শতাংশ নারী নিজ নিজ গৃহকর্মে কাজ করেন কোনোপ্রকার পারিশ্রমিক ছাড়া তাঁরা গৃহস্থালিতে কাজ করছেন, উৎপাদনে অবদান রাখছেন, কিন্তু তার বিনিময়ে একটি টাকাও পাচ্ছেন না। তাঁদের মাতৃত্বকালীন ছুটি নেই, কর্মঘণ্টার বাঁধাধরা নিয়ম নেই, কোনোরকমের সামাজিক সুরক্ষা নেই...

প্রথম আলো: বাংলাদেশে নারীর প্রধানতম সমস্যা হলো নিরাপত্তাহীনতা। ধর্ষণ যেন মহামারির আকার ধারণ করেছে, নারীর প্রতি অন্যান্য সহিংসতা আছেই। এ সমস্যার সমাধান কী?

শোকো ইশিকাওয়া: এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পরিস্থিতি খুবই উদ্বেগজনক। প্রতিদিন ধর্ষণের খবর আসছে, এ মুহূর্তে ধর্ষণই সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয়। সংবাদমাধ্যম সূত্রে পাওয়া এনজিওগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, এ বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ৮৮৯টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য হলো ধর্ষণের মামলা হয়েছে ২ হাজার ১৭টি। ২০১৭ সালে ধর্ষণ মামলা হয়েছিল ৩ হাজার ৯১৭টি। বিবিএস এসব তথ্য পেয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে। অর্থাৎ সংবাদমাধ্যমে ধর্ষণের খবর খুবই কম আসছে আর পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবও শুধু মামলা হয়েছে এমন তথ্যের ভিত্তিতে পাওয়া। বাস্তবে ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে আরও বেশি। ঘটনায় মামলা হচ্ছে না, খবরও প্রকাশিত হচ্ছে না। আসলে এ ক্ষেত্রে বিচারহীনতার পরিবেশ কাজ করছে। এ মুহূর্তে প্রয়োজন ধর্ষণের মামলাগুলো কীভাবে চালানো হয়েছে, কারা এগুলো কীভাবে পরিচালনা করেছেন, এসব খুব ভালোভাবে খতিয়ে দেখা।

বিজ্ঞাপন

প্রথম আলো: ধর্ষণ মামলার নিষ্পত্তি ও ধর্ষকদের শাস্তির চিত্র তো ভীষণ হতাশাব্যঞ্জক।

শোকো ইশিকাওয়া: বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন সবচেয়ে অকার্যকর আইনগুলোর একটি। কারণ, এ আইনের অধীনে দায়ের করা মামলাগুলোর দ্বারা ন্যায়বিচার পাওয়া যাচ্ছে না। মাত্র ৩ শতাংশ মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে। সুতরাং খতিয়ে দেখতে হবে সমস্যাগুলো কোথায়, পুরো ব্যবস্থার মধ্যে কী কাজ করছে না। আমি সরকারের প্রতি আহ্বান জানাব, প্রতিটি ধর্ষণের মামলায় আইন প্রয়োগ ও বিচার সম্পন্ন করার প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপ খতিয়ে দেখা হোক। ধর্ষণের মামলাগুলো কারা পরিচালনা করছেন, কীভাবে পরিচালনা করছেন; কেন সিংহভাগ মামলার নিষ্পত্তি হচ্ছে না—এ সবকিছু খুব ভালোভাবে খতিয়ে দেখা হোক। ওয়ান–স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার, কাউন্সেলিং সেন্টার—এসব যথেষ্ট নয়। ধর্ষণের বিচার সম্পন্ন করে ধর্ষকদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। তা ছাড়া ফৌজদারি দণ্ডবিধিতে ধর্ষণের সংজ্ঞাও পর্যালোচনা করতে হবে। এ অপরাধকে বিস্তৃত করে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করতে হবে, যাতে করে ধর্ষণের শিকার একজন নারীও ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত না হন।

প্রথম আলো: আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের একাংশের মধ্যে এমন মানসিকতা কাজ করে যে ধর্ষণের শিকার নারীর হয়তো চারিত্রিক ত্রুটি আছে। ধর্ষণ মামলায় আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে এ মানসিকতা নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

শোকো ইশিকাওয়া: ঠিক। এ রকম মানসিকতা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতে, এমনকি বিচারব্যবস্থার মধ্যেও আছে। সে জন্য পুলিশের সদস্যদের প্রশিক্ষণ দরকার। নারীর প্রতি তাঁদের শ্রদ্ধাবোধ ও সংবেদনশীলতা বাড়ানোর উদ্যোগ দরকার। আর দরকার পুলিশে নারী সদস্যের সংখ্যা অনেক বাড়ানো। আর যেটা করতে হবে, তা হলো নারীর প্রতি পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। ২০১১ সালের এক গবেষণায় আমরা দেখেছি, নারীকে যৌন নির্যাতন করেছেন এমন পুরুষদের প্রায় ৩০ শতাংশ বলেছেন, তাঁরা মনে করেন নারীদের সঙ্গে এ রকম আচরণ করার অধিকার তাঁদের আছে। তাঁরা বলেছেন যে তাঁরা নারীদের শাস্তি দিয়েছেন এবং শাস্তি দেওয়ার মাধ্যমে নিজের ক্রোধ মিটিয়েছেন, এ অধিকার তাঁদের আছে। ৭৭ শতাংশ শহুরে পুরুষ এবং ৮১ শতাংশ গ্রামাঞ্চলের পুরুষ বলেছেন, তাঁরা মনে করেন যে যৌনতা হলো পুরুষের অধিকার। এ মানসিকতা হলো টক্সিক ম্যাসকুলিনিটি বা বিষাক্ত পৌরুষের মানসিকতা। নারীকে ধর্ষণসহ অন্যান্য সহিংসতা এবং অপমান থেকে রক্ষা করতে হলে সমাজকে এ বিষাক্ত পৌরুষ থেকে মুক্ত করতে হবে।

প্রথম আলো: আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

শোকো ইশিকাওয়া: আপনাকেও ধন্যবাদ।

মন্তব্য পড়ুন 0