>করোনাজনিত সংকট উত্তরণে গত রোববার সরকার ৭২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকার সহায়তা কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। অর্থনীতির গতি ফেরাতে এই সহায়তা কতটা সহায়ক হবে, প্রান্তিক মানুষের জীবনমান উন্নয়নে সরকারের আরও কী করণীয় ইত্যাদি সম্পর্কে বলেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদ। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সোহরাব হাসান
default-image

প্রথম আলো: করোনাজনিত সংকট উত্তরণে সরকার ৭২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকার সহায়তা তহবিল গঠন করেছে। অর্থনীতির গতি ফেরাতে এটি কতটা সহায়ক হবে বলে মনে করেন?

সালেহউদ্দিন আহমেদ: আমি মনে করি, প্রধানমন্ত্রী যে সহায়তা তহবিল ঘোষণা করেছেন, সার্বিকভাবে দেখলে তাকে ইতিবাচকই বলতে হবে। প্রশ্ন হলো, এই কর্মসূচি কীভাবে বাস্তবায়িত হবে, কারা করবেন, তার ওপরই সফলতা–বিফলতা নির্ভর করে। পুরো কর্মসূচিটি ঋণনির্ভর। ফলে বড় ব্যবসায়ীরাই এর থেকে বেশি লাভবান হবেন। আমাদের ব্যাংকিং ব্যবস্থার এখন যে হাল, তাতে ব্যাংকগুলো কতটা দক্ষতা, সততা ও দ্রুততার সঙ্গে কাজটি করতে পারবে, সেই প্রশ্নও আছে।

প্রথম আলো: ব্যাংকগুলোতে আগে থেকেই তারল্যসংকট ছিল। তাদের পক্ষে স্বল্প সময়ে এত বড় অঙ্কের ঋণ জোগান দেওয়া সম্ভব হবে কি?

সালেহউদ্দিন: এ ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে এগিয়ে আসতে হবে। ২০০৮-২০০৯ সালে আমি যখন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, তখনো বিশ্বব্যাপী একটা আর্থিক মন্দা দেখা দিয়েছিল। সে সময় ব্রড মানির প্রবৃদ্ধি ছিল ২৫ শতাংশ। ফলে তারল্যসংকটে পড়তে হয়নি। এখনো এসএলআর (বিধিবদ্ধ তারল্য জমা) ও সিআরআর (নগদ জমার হার) কমিয়ে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মূলধন ব বাড়ানো যেতে পারে। কাজটি করতে হবে প্রচলিত ছকের বাইরে গিয়ে। সব ক্ষেত্রে আইএমএফের শর্ত মেনে কাজ করলে হবে না। এ ছাড়া সরকার বকেয়া ঋণ আদায়ের ওপর জোর দিতে পারে। 


প্রথম আলো: আপনি বলেছেন, সরকারের আর্থিক প্যাকেজে বড় ব্যবসায়ীরাই বেশি লাভবান হবেন। কিন্তু ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্যও তো ২০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

সালেহউদ্দিন: কিন্তু ব্যাংকগুলো বরাবর বড় ব্যবসায়ীদেরই অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে তারা বিনিয়োগে তেমন উৎসাহ দেখায় না। সে ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ১/২ শতাংশ সুদে ব্যাংকগুলোকে টাকার জোগান দিলে তারা ৯ শতাংশ হারে ঋণ দিতে পারবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের উদ্যোক্তাদের কাছে সুদের হারের চেয়েও অর্থের জোগানটা গুরুত্বপূর্ণ। তাদের ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে হলে অর্থের প্রবাহের নিশ্চয়তা থাকতে হবে।

প্রথম আলো: সরকার বলছে, মুদ্রা সরবরাহ বাড়বে। সে ক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতি বাড়ার আশঙ্কা আছে কি না?

সালেহউদ্দিন: আমাদের মূল্যস্ফীতি এখন ৫.৬ শতাংশ। ব্যবসায় অর্থের জোগান বাড়লে কর্মসংস্থানও বাড়বে। আমার ধারণা, মূল্যস্ফীতি কিছু বাড়লেও তেমন সমস্যা হবে না। যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি ২০ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন দেশটির বিশেষজ্ঞরা। আমাদের দেশীয় পণ্যের উৎপাদন কমবে না। কৃষিপণ্য, গবাদিপশু, হাঁসমুরগির উৎপাদন ঠিক থাকলে বাজার সহনীয় পর্যায়েই থাকবে আশা করি।

প্রথম আলো: করোনাসংকট আগামী বাজেটে কী ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করেন?

সালেহউদ্দিন: আমাদের একটি ধারণা আছে যে বাজেটে ঘাটতির পরিমাণ ৫ শতাংশের মধ্যে রাখতে হবে। আমি তো ৬/৭ হলেও কোনো সমস্যা দেখি না। ভারতের অনেক রাজ্যে বাজেট ঘাটতি অনেক বেশি। আমরা কোন খাতে টাকা খরচ করব, সেটা ঠিক করা প্রয়োজন। আমি মনে করি, সরকারি সংস্থা ও প্রকল্পের ব্যয় কমিয়ে আনতে হবে। অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প বাদ দিতে হবে। ব্যয়ের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। তাহলে আগামী বাজেট নিয়ে খুব বেশি দুশ্চিন্তা করতে হবে না।

প্রথম আলো: সরকার শিল্প খাতে প্রণোদনা দিয়েছে। কিন্তু এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত যে দরিদ্র মানুষ, তাদের জন্য আলাদা কোনো তহবিল নেই। সরকার বলেছে, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির অধীনে তাদের সহায়তা দেওয়া হবে।

সালেহউদ্দিন: দেশে দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে এ রকম মানুষের সংখ্যা ২২ শতাংশ, প্রায় ৪ কোটি। সরকার সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির অধীনে যে সহায়তা দিচ্ছে, তা যথেষ্ট নয়। ভিজিএফ বা ভিডিএফ কর্মসূচির নামে চাল-গম দেওয়া হয়। আমি মনে করি, চাল-গম নয়, নগদ টাকা দেওয়া প্রয়োজন। নগদ টাকা দিলে তারা খাবারের বাইরের চাহিদাও মেটাতে পারেন। যেমন প্রয়োজনীয় ওষুধ কেনা, বিদ্যুৎ বিল দেওয়া। নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনও বলেছেন, গরিব মানুষ ভালো ব্যবস্থাপক।

প্রথম আলো: সরকারের এই সহায়তা কর্মসূচির আওতায় কৃষি নেই। এটাকে কীভাবে দেখছেন?

সালেহউদ্দিন: কৃষি খাতে সহায়তা থাকা প্রয়োজন। করোনাসংকটের কারণে গরিব মানুষ শহরে কাজ হারিয়ে গ্রামে গিয়েছেন। কৃষি খাত চাঙা থাকলে সেখানেও তাঁদের কিছু কর্মসংস্থান হতে পারে। আর কৃষিতে মন্দা দেখা দিলে পুরো অর্থনীতির সর্বনাশ হয়ে যাবে। কৃষককে সরকার সার, বীজ ও কীটনাশকে কিছু কিছু ভর্তুকি দিয়ে থাকে। কিন্তু ভর্তুকিটা বাড়ানো প্রয়োজন। আবার কৃষি তো শুধু ধান-চাল নয়, এ সময়ে দুগ্ধ খামারিরা বিপাকে পড়েছেন। পোলট্রি খাতের সঙ্গে জড়িত ছোট ছোট খামারির অবস্থাও শোচনীয়। সামনে আমন চাষের মৌসুম। মৌসুম শুরুর আগেই কৃষকের প্রয়োজনীয় উপকরণ পৌঁছাতে হবে। হিসাবটা বের করা কঠিন নয়। দ্বিতীয়ত তাঁরা যাতে ন্যায্য দাম পান, সেটাও নিশ্চিত করতে হবে।

প্রথম আলো: এই সহায়তা কর্মসূচিতে আনুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত শ্রমিকেরা উপকৃত হবেন। কিন্তু অনানুষ্ঠানিক খাতে যাঁরা কাজ করেন, তাঁদের কী হবে?

সালেহউদ্দিন: অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত শ্রমিকের সংখ্যা আনুষ্ঠানিক খাতের চেয়ে অনেক বেশি। তাঁদের চাকরির কোনো নিশ্চয়তা নেই। তাঁরা বাড়ি থেকে ফিরে এলেও ছুটির সময়ের মজুরি পাবেন না। মালিকেরা বলবেন, যত দিন কাজ করছ, তত দিন মজুরি পাবে। এ কারণেই অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের আর্থিক সহায়তা জরুরি ছিল। তবে তাঁদের ঋণ দিলেও তো হবে না। অনুদান দিতে হবে। দোকান, রেস্তোরাঁয় যাঁরা কাজ করেন, যাঁরা ফুটপাতে হকারি করেন, তাঁরা আগামী ছয় মাস যাতে চলতে পারেন, সেই ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

প্রথম আলো: প্রবাসী শ্রমিকদের জন্যও কোনো প্রণোদনা নেই। অনেক দেশ তাঁদের ফিরে আসার জন্য চাপ দিচ্ছে।

সালেহউদ্দিন: প্রবাসী আয় আমাদের অর্থনীতির বড় শক্তি। এখানে সরকারের দুটো করণীয় আছে। প্রথমত যেসব দেশ প্রবাসী শ্রমিকদের ফিরে আসার জন্য চাপ দিচ্ছে, সেসব দেশের সঙ্গে কূটনৈতিকভাবে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করা। তাদের বোঝাতে হবে এই শ্রমিকেরাই তাদের অর্থনীতিকে সচল রেখেছেন। এখন তাঁদের ফেরত পাঠানো হবে অমানবিক। কিন্তু সমস্যা হলো আমাদের বেশির ভাগ শ্রমিক অদক্ষ। বিদেশে গিয়ে তাঁরা প্রতিকূল পরিবেশ ও অসম প্রতিযোগিতার মধ্যে পড়ে যান। এই অবস্থায় অন্যান্য দেশ যতটা দর-কষাকষি করতে পারবে, আমরা সেটি পারব না। ইতিমধ্যে বিদেশ থেকে অনেক শ্রমিক চলে এসেছেন বা আসতে বাধ্য হয়েছেন। তাঁরা যাতে এখানে কিছু করতে পারেন, সে জন্য আর্থিক সহায়তা দেওয়া যেতে পারে।

প্রথম আলো: সরকারের এসব সহায়তা যে উপকারভোগীদের কাছে পৌঁছাবে, তার নিশ্চয়তা কী?

সালেহউদ্দিন: সরকার যে সহায়তা কর্মসূচি ঘোষণা করছে, সেটি বাস্তবায়িত হবে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার মাধ্যমে। একেক মন্ত্রণালয় একটি বিষয় দেখবে। যেমন শিল্পের সহায়তার কাজটি করবে শিল্প মন্ত্রণালয়। প্রবাসীদের দেখভাল করার দায়িত্ব প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের। সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি বাস্তবায়িত হয়ে থাকে সমাজকল্যাণ ও স্থানীয় সরকারের মাধ্যমে। এসব কাজে একটি শক্তিশালী গাইডলাইন থাকা প্রয়োজন। মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন। সেটি না হলে সরকার যত ভালো কর্মসূচিই নিক না কেন, যাদের জন্য এই কর্মসূচি তাঁরা উপকার পাবেন না। এ কারণে সমন্বয় ও তদারকি বাড়াতে হবে।

প্রথম আলো: বর্তমান অবস্থার উত্তরণে এই আর্থিক কর্মসূচিই কি যথেষ্ট, না দীর্ঘমেয়াদি কোনো পরিকল্পনা নেওয়ার প্রয়োজন আছে বলে মনে করেন?

সালেহউদ্দিন: আমি মনে করি, দুই বছর মেয়াদি একটি অ্যাকশন প্ল্যান বা কর্মপরিকল্পনা নেওয়া প্রয়োজন। অর্থনীতিতে সচল, পুনরুদ্ধার এবং এগিয়ে নেওয়ার জন্য এই কর্মপরিকল্পনা নিতে হবে। বিচ্ছিন্ন বা বিক্ষিপ্ত কর্মসূচি সার্বিক অর্থনীতিতে গতিসঞ্চার করতে পারবে না।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0