default-image
মুক্তিযুদ্ধে চারুশিল্পীদের অবদান ছিল অপরিসীম। তাঁরা পোস্টার, ব্যানার, মঞ্চসজ্জা, পেছনের দৃশ্যপট আঁকার কাজসহ বিভিন্নভাবে অবদান রেখেছেন। বাংলাদেশের শিল্পীদের আঁকা ছবি নিয়ে ভারতে প্রথম ‘বাংলাদেশের শিল্পীদের চিত্র ও অঙ্কন প্রদর্শনী ১৯৭১’ শিরোনামে ওই বছরের ১৩ সেপ্টেম্বর একটি প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল তহবিল গঠনের পাশাপাশি বিশ্ববিবেকের কাছে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহতা তুলে ধরা। বহির্বিশ্বের কাছে সাহায্য ও সহযোগিতা কামনা করা। প্রদর্শনীতে ১৬ জন শিল্পীর ৬৫টি চিত্রকর্ম প্রদর্শিত হয়। শিল্পীদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন বীরেন সোম। তিনি উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে প্রবাসী মুজিবনগর সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়ের ডিজাইনার হিসেবে কাজ করেন তিনি। ২৩ মার্চ বিকেলে শিল্পী বীরেন সোমের সাক্ষাৎকার নেন আবু সাঈদ


আবু সাঈদ: আপনি কীভাবে ছাত্র সংগ্রাম ও আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হলেন? 

বীরেন সোম: আমার গ্রামের বাড়ি জামালপুরে। ১৯৬৪-৬৫ সালে ঢাকা আর্ট কলেজে (বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ) ভর্তি হই। প্রথম বর্ষ থেকেই ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ি। ওই সময়ে একুশে ফেব্রুয়ারিতে আর্ট কলেজের ছাত্ররা রাজপথসহ বিভিন্ন জায়গায় আলপানা আঁকতেন। শিল্পী ইমদাদ হোসেনের নেতৃত্বে নানা পর্যায়ে কাজ করতাম। এভাবে সব আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ি।

বীরেন সোম
জন্ম: ১৯৪৮ সালে ৩১ ডিসেম্বর, আমলাপাড়া, জামালপুর
বাবা: দেবেন্দ্র কুমার সোম
মা: কণক প্রভা সোম।

সাঈদ: ৬৬-এর ছয় দফার সঙ্গে তো আপনি যুক্ত ছিলেন। সে সম্পর্কে কিছু বলুন।
বীরেন: ওই সময়ে তো পুরো টগবগে তরুণ। তখন শিল্পীসমাজ, প্রগতিশীল ছাত্র ও সংস্কৃতিকর্মীদের সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটে। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। চারদিকে আন্দোলন ধীরে ধীরে বিকশিত হতে থাকে। আন্দোলনের একপর্যায়ে আওয়ামী লীগের প্রচার বিভাগের কর্মকর্তা নূরুল ইসলাম শিল্পী হাশেম খানের কাছে আসেন। তিনি ছয় দফার ঘোষণাপত্রের একটি নকশা করে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেন। তখন হাশেম খান বলেন, ছয় দফার আরও একটি মর্মার্থ আছে। তা হলো আমাদের দেশে ছয়টি ঋতু। ঋতুগুলো আমাদের জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ছয় দফাও ঠিক তেমনি করেই বাঙালি আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক অস্তিত্বের প্রতীক হিসেবে গৃহীত হবে। ঘোষণাপত্রের নকশার ডিজাইন দেখে বঙ্গবন্ধু খুশি হলেন। শিল্পী হাশেম খান মঞ্চের ডিজাইন সম্পন্ন করে লে-আউট দিয়ে মঞ্চের কাজ করার জন্য আমাকে বলেন। আমি, আবুল বারক আলভী ও মঞ্জুরুল হাই—এই তিনজন মিলে শিল্পী হাশেম খানের লে-আউট দিয়ে মঞ্চের কাজটা সম্পন্ন করি।

default-image



সাঈদ
: ১৯৬৯ সালে গণ-অভ্যুত্থানের আন্দোলন যখন তুঙ্গে, তখন কী করলেন?
বীরেন: আর্ট কলেজের শেষ বর্ষ ছাত্র ছিলাম। ২২ বছরের তরুণ। চারদিকে আন্দোলন। বাড়িতেও যাওয়া হয়নি। তখন এখনকার মতো সহজে যোগাযোগ করা যেত না। আর্ট কলেজের হোস্টেলটা হয়ে ওঠে বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। আমরা চিত্রশিল্পীরা হোস্টেলে রাত জেগে হাজার হাজার পোস্টার, কার্টুন, ব্যানারের কাজ করতাম। স্বাধীনতা—এই চারটি অক্ষরের প্ল্যাকার্ড নিয়ে আর্ট কলেজের ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষকেরা মিছিল বের করেছিলেন। ছাত্রছাত্রীরা উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের ওপরে ছাড়ার বই ‘উনসত্তরের ছাড়া’ প্রকাশ করেন। সেই বইয়ে আমিও সহযোগী হিসেবে কাজ করি।

default-image

সাঈদ: ১৯৭১ সালে কখন, কীভাবে ভারতে গেলেন?
বীরেন: ২১ এপ্রিল মধ্যরাতে ব্রহ্মপুত্র নদীর ওপার থেকে প্রচণ্ড গোলাগুলি ও মর্টারের আওয়াজ ভেসে আসতে লাগল। সেই আওয়াজ ক্রমে তীব্রতর হচ্ছিল। সমস্ত শেরপুর শহরে ছড়িয়ে পড়েছিল আতঙ্ক। পরদিন ভোরবেলা পরিবার-পরিজন নিয়ে অনেক কষ্ট করে সীমান্তের দিকে আমরা অগ্রসর হই। সেই দিনই হাজার হাজার শরণার্থীর সঙ্গে ভারতের মহেন্দ্রগঞ্জ সীমান্তে আমরা আশ্রয় নিই। ওখানে কিছুদিন থাকি। বড় বোন আগে থেকেই ছিলেন ভারতে।

সাঈদ: শুনেছি, মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতে বাংলাদেশের শিল্পীদের চিত্র প্রদর্শনী করা হয়? সেখানে আপনিও যুক্ত ছিলেন? কীভাবে যুক্ত হলেন? জানতে চাই।
বীরেন: মহেন্দ্রগঞ্জ সীমান্তে থেকে ১৬ মে কলকাতার উদ্দেশে রওনা হই। তখন দেশ থেকে অনেক শিল্পী ভারতে বিভিন্ন জায়গায় আশ্রয় নেন। শিল্পীদের সংখ্যা দিন দিন বাড়তে থাকে। প্রত্যেক শিল্পীর ইচ্ছে ছিল মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ করবেন। সবার ভেতরে দারুণ আগ্রহ। এ সময় কলকাতার জনপ্রিয় আনন্দবাজার পত্রিকা একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। সেখানে উল্লেখ্য ছিল, বাংলাদেশ থেকে আসা শিল্পীরা যেন কলকাতার আর্ট কলেজের অধ্যক্ষ চিন্তামণি করের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। ওখানে গিয়ে আমি জানতে পারি, কামরুল হাসান, মুস্তাফা মনোয়ার, নিতুন কুন্ডু, দেবদাস চক্রবর্তী, নাসির বিশ্বাস, প্রাণেশ মণ্ডল, রণজিত নিয়োগী, কাজী গিয়াস উদ্দিন, চন্দ্রশেখর দে, হাসি চক্রবর্তীসহ অনেকে বাংলাদেশ থেকে এসেছেন। শোনার পর মনটা ভরে গেল। পাকিস্তানিদের বর্বর অত্যাচার ও গণহত্যার চিত্র বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরা এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গড়ে তোলোর লক্ষ্যে চিন্তামনি কর ও কামরুল হাসানের নেতৃত্বে বাংলাদেশের শিল্পীদের আঁকা ছবি নিয়ে প্রদর্শনী আয়োজনের সিদ্ধান্ত হয়। উদ্যোক্তা হিসেবে এগিয়ে আসেন বিভিন্ন শিল্পী সংস্থা ও কলকাতার বাংলাদেশ শিল্পী-সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবী সহায়ক সমিতি। তখন বাংলাদেশ শিল্পী-সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবী সহায়ক সমিতির সভাপতি ছিলেন তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, সাধারণ সম্পাদক দীপেন্দ্র নাথ বন্দ্যোপাধ্যায়।

default-image

সাঈদ: ওখানে কীভাবে থাকলেন, কোথায় ছবি আঁকার কাজটা করলেন?
বীরেন: প্রদর্শনী শুরু হয় ১৩ সেপ্টেম্বর। কিন্তু আমরা কাজ শুরু করি তারও প্রায় দুই মাস আগে। সেখানে শিল্পীরা যাতে স্বাচ্ছন্দ্যে ছবি আঁকতে পারেন, সে জন্য উদ্যোক্তারা সাময়িকভাবে কোনো কোনো বাসায় শিল্পীদের আশ্রয় দেন। ছুটির পর কলকাতার আর্ট কলেজের ক্যানটিনে ছবি আঁকার ও থাকার ব্যবস্থা করেন। আমাদের রং, তুলি, কাগজ, ক্যানভাসসহ যাবতীয় আর্ট ম্যাটেরিয়াল সরবরাহ করা হতো। আর্থিকভাবে সহায়তা দিত বিড়লা একাডেমি অব আর্ট অ্যান্ড কালচার, মেসার্স জিমি লাহা প্রাইভেট লিমিটেড, আদভানী প্রাইভেট লিমিটেড, ক্যামলিন প্রাইভেট লিমিটেড, কোরেস প্রাইভেট লিমিটেড ও প্যাপিরাস প্রাইভেট লিমিটেড।

default-image

সাঈদ: প্রদর্শনী কে উদ্বোধন করেন?
বীরেন: ১৯৭১ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর বিড়লা একাডেমির এই প্রদর্শনী উদ্বোধন করেন প্রখ্যাত ভাস্কর শ্রী দেবী প্রসাদ রায়চৌধুরী।

সাঈদ: প্রদর্শনীতে কার কার চিত্রকর্ম ছিল?
বীরেন: প্রদর্শনীর ক্যাটালগে ১৭ শিল্পীর ৬৬টি শিল্পকর্ম দেওয়া ছিল। কিন্তু প্রদর্শিত হয় ১৬ জনের ৬৫টি চিত্রকর্ম। শিল্পীরা হলেন অঞ্জন বণিক (রক্তাক্ত বাংলাদেশ), কাজী গিয়াস উদ্দিন (শরণার্থী-১, শরণার্থী-২, শরণার্থী-৩, শরণার্থী-৪, শরণার্থী-৫, দুর্যোগ), কামরুল হাসান (কম্পোজিশন-১, কম্পোজিশন-২,

default-image

বাংলাদেশ-গণহত্যার আগে, বাংলাদেশ-গণহত্যার পরে, এপ্রিলের পূর্ণ চাঁদ), গোলাম মোহাম্মদ (সূর্য বিলোপ) চন্দ্রশেখর দে (নিষ্পাপ শিকার, চঞ্চল পাখি, স্কেচ-১, স্কেচ-২), দেবদাস চক্রবর্তী (ক্রুশবিদ্ধ মানবতা, স্বাধীনতার সৈনিক), নাসির বিশ্বাস (ধর্ষণ), নিতুন কুন্ডু (বাংলাদেশ ’৭১, সাহায্যের জন্য কান্না), প্রাণেশ মণ্ডল (শরণার্থী, সবুজ সোনালি জমিতে এলোপাতাড়ি গুলি, স্কেচ-১, স্কেচ-২) বরুণ মজুমদার (বাংলাদেশ), বিজয় সেন (জেনোসাইড, স্কেচ-১, স্কেচ-২), বীরেন সোম (কান্না, দুঃস্বপ্ন, স্কেচ-১, স্কেচ-২), মুস্তফা মনোয়ার (একীভবন, গর্বিতা মা, নারী এবং পশু, বাংলাদেশ-১, বাংলাদেশ-২, বাংলাদেশ-৩, স্মৃতি, ভূমি), রঞ্জিত নিয়োগী (ভয় এবং মৃত্যু, কালো দিগন্ত, মানবতার অবমাননা, উদিত সূর্য আমাদের, স্বাধীনতার জন্য), স্বপন চৌধুরী (বাংলাদেশ-১, বাংলাদেশ-২, বাংলাদেশ-৩, স্কেচ-১, স্কেচ-২, স্কেচ-৩, স্কেচ-৪, স্কেচ-৫, স্কেচ-৬, স্কেচ-৭, স্কেচ-৮, স্কেচ-৯, স্কেচ-১০) ও হাসি চক্রবর্তী (বাংলাদেশ-১, বাংলাদেশ-২, বাংলাদেশ-৩, বাংলাদেশ-৪, বাংলাদেশ-৫)।

default-image

সাঈদ: ছবিগুলোর বিষয়বস্তু কী ছিল?
বীরেন: শিল্পীদের তেলরং, জলরং, কালি-কলম ও মিশ্র মাধ্যমে আঁকা চিত্রগুলোয় ফুটে উঠেছিল স্বদেশবন্দনা, যুদ্ধে পাকিস্তান হানাদার বাহিনী ও তাদের সহযোগীদের নির্মম অত্যাচার, গণহত্যা, ধর্ষণ ও তার বিরুদ্ধে এ দেশের মুক্তিকামী জনতার প্রতিরোধের চিত্র।

সাঈদ: প্রদর্শনীতে কোন শিল্পীর ছবি বাদ পড়ে? কেন?
বীরেন: শিল্পী আবুল বারক আলভীর ছবি বাদ পড়ে। কারণ, তিনি শিল্পকর্ম জমা দিতে পারেননি। প্রদর্শনীর আগেই তিনি পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে ধরা পড়েন। জুলুম-নির্যাতনের শিকার হন।

সাঈদ: প্রদর্শনী দেখতে দর্শনার্থী কেমন আসত?
বীরেন: প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ প্রদর্শনীতে ভিড় করত।


সাঈদ: কলকাতা ছাড়া অন্য কোথাও কি প্রদর্শনী হয়েছিল?
বীরেন: কলকাতা ছাড়া দিল্লি ও মুম্বাইয়ে একই প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

সাঈদ: ছবিগুলো এখন কোথায় আছে?
বীরেন: মূল ছবিগুলো এখন পাওয়া যায় না। পাওয়ার উদ্যোগ কেউ নেয়নি। তবে কিছু ছবির প্রিন্ট কপি জাতীয় জাদুঘরে ও মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে আছে।

সাঈদ: মুক্তিযুদ্ধের এত বছর পর এখনকার অনুভূতি কী?
বীরেন: অনেক আশাবাদী। তরুণেরা ভালো কাজ করছেন। আরও ভালো কাজ করবেন। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে অনেক দেরিতে সনদ তুলেছি। অনেকে তো মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি না পেয়েই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন। এই শিল্পীদের আজও আমরা যথাযথভাবে সম্মান জানাতে পারিনি।

সাঈদ: আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ
বীরেন: আপনাকেও।

বিজ্ঞাপন
সাক্ষাৎকার থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন