default-image

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমেদ শিক্ষা নিয়েই কাজ করেছেন জীবনের দীর্ঘ সময়। কোভিড পরিস্থিতিতে সংকটে পড়া দেশের শিক্ষাব্যবস্থার নানা চ্যালেঞ্জ, মোকাবিলার পথ ও সামগ্রিকভাবে শিক্ষাসংক্রান্ত কিছু প্রসঙ্গ নিয়ে তিনি কথা বলেছেন প্রথম আলোর সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন এ কে এম জাকারিয়া

প্রথম আলো: করোনায় শিক্ষার যে ক্ষতি হলো তা মোকাবিলায় সরকার কিছু গুচ্ছ পরিকল্পনা নিয়েছে। এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে ফেরানোর উদ্যোগ চলছে। দুই পরীক্ষার তারিখ নিয়ে ভাবা হচ্ছে। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জগুলো কী?

মনজুর আহমেদ: করোনা মহামারি থেকে কবে ও কীভাবে রেহাই পাওয়া যাবে, তা বলা কঠিন। প্রায় পুরো বছর শিক্ষার কাজ বন্ধ রাখার পর আর কত দিন এভাবে চলতে পারে? স্বাস্থ্য ও জীবনের ঝুঁকি ও শিক্ষার ক্ষতির মধ্যে হিসাব-নিকাশের রফা কীভাবে হবে, তা নিয়ে দোলাচলে আছেন নীতিনির্ধারকেরা। তবে বোঝা যাচ্ছে, সরকার মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকের পাবলিক পরীক্ষাগুলোর আয়োজন করে এই স্তরের শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার গুরুত্ব দিচ্ছে। ২০২১-এর মাঝামাঝি সময়ে এই পরীক্ষাগুলো অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা হচ্ছে। অন্য স্তরের শিক্ষার্থীদেরও পর্যায়ক্রমে বিদ্যালয়ে নিয়ে আসার কথা বিবেচিত হচ্ছে।

পরীক্ষার আয়োজন ও শিক্ষার্থীদের নিরাপদে বিদ্যালয়ে ফিরিয়ে আনার প্রধান শর্ত হবে স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তাবিধি মেনে চলা নিশ্চিত করা। বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের জন্য মুখোশ পরা, হাত ধোয়া ও পরিচ্ছন্নতার ব্যবস্থা এবং শ্রেণিকক্ষে দূরত্ব বজায় রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। কেন্দ্র থেকে শুধু নির্দেশ দিলেই হবে না। প্রতিটি বিদ্যালয়ে নিজস্ব পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে। প্রতিটি উপজেলায় এ জন্য শিক্ষা কর্মকর্তা, স্থানীয় সরকার ও শিক্ষাসংশ্লিষ্ট এনজিওদের নিয়ে কর্মদল গঠন করে বিদ্যালয়গুলোর প্রয়োজন বিবেচনা করতে হবে। এর জন্য আর্থিক সহায়তাও নিশ্চিত করতে হবে।

বিজ্ঞাপন

যদি ফেব্রুয়ারি মাসে স্কুলগুলো খুলে দেওয়া হয়, তাহলে কার্যত দুই বছরের পড়া ১০ মাসে পড়তে হবে। এর জন্য তো বিশেষ প্রস্তুতি ও নির্দেশনার প্রয়োজন আছে। সেটা কি হওয়া উচিত বলে মনে করেন?

মনজুর আহমেদ: দুই বছরের ক্ষতি ১০ মাসে পূরণ করা সম্ভব নয়। এ জন্য দুটি কৌশল গ্রহণ করতে হবে। প্রথমত, ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার জন্য আগামী দুই শিক্ষাবর্ষের (২০২১ ও ২০২২) জন্য পরিকল্পনা করতে হবে। দ্বিতীয়ত, এই সময়ের জন্য পাঠক্রমের বিন্যাস নতুনভাবে করতে হবে। পাঠক্রম থেকে কিছু কম গুরুত্বের বিষয় বাদ দিয়ে মৌলিক দক্ষতায় বেশি সময় ও শ্রম দিতে হবে এবং পরীক্ষার প্রস্তুতি ও আয়োজনে সময় কমিয়ে পাঠদানে সময় বাড়াতে হবে।

প্রাথমিক স্তরে বাংলা ও অঙ্কে অনেক সময় দিতে হবে। মাধ্যমিকে বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে জোর দিতে হবে। বিদ্যালয়ের মধ্যে ও পাবলিক পরীক্ষার আয়োজন ও প্রস্তুতির সময় কমাতে হবে। সংকটের সুযোগ নিয়ে শিক্ষা বর্ষপঞ্জির পরিবর্তনের কথা ভাবা যেতে পারে। বাংলাদেশের আবহাওয়া প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও তাপমাত্রা বিবেচনায় বর্তমান খ্রিষ্টীয় পঞ্জিকা অনুযায়ী শিক্ষাবর্ষ উপযুক্ত নয় বলে অনেকে মনে করেন। অন্য অনেক দেশের মতো সেপ্টেম্বর থেকে জুন পর্যন্ত শিক্ষাবর্ষ ও জুলাই-আগস্টে দীর্ঘ গ্রীষ্মের ছুটি শিক্ষার জন্য সময়ের যথার্থ ব্যবহার বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। ২০২১-এর শিক্ষাবর্ষ ফেব্রুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ধরে সেপ্টেম্বর থেকে ২০২২-এর জুন পর্যন্ত নতুন শিক্ষাবর্ষ প্রবর্তন হতে পারে। বর্তমান বছরে গ্রীষ্মের ছুটি না রেখে ও অন্য ছুটি সীমিত রেখে বছরটি শেষ করা যেতে পারে।

করোনার কারণে ২০২০ সালের পিএসসি, জেএসসি ও জেডিসির মতো পরীক্ষাগুলো হয়নি। এই পরীক্ষাগুলো উঠিয়ে দেওয়ার পক্ষে জোরালো মত রয়েছে। আপনার অবস্থান কী?

মনজুর আহমেদ: পিএসসি ও জেএসসি-জেডিসি পরীক্ষা প্রবর্তনের যে উদ্দেশ্য ছিল, তা সফল হয়নি। বরং শিক্ষার নিম্নস্তরে এই পরীক্ষাগুলো মুখস্থবিদ্যা, প্রাইভেট কোচিং ও বাণিজ্যিক গাইড বইয়ের ওপর নির্ভরতা বাড়িয়ে দিয়েছে। শিশুরা শিক্ষার্থীর পরিবর্তে পরীক্ষার্থীতে পরিণত হয়েছে। প্রশ্নপত্র ফাঁসসহ নানা দুর্নীতির প্রভাব বেড়েছে।

২০২২ সালে যে নতুন শিক্ষাক্রম চালুর কাজ চলছে, তাতে নানা সংস্কারের মধ্যে শিক্ষার্থী মূল্যায়ন বিবেচনায় আছে। বিদ্যালয়ভিত্তিক ধারাবাহিক মূল্যায়নকে অধিকতর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এবং প্রাথমিক ও নিম্নমাধ্যমিকের বর্তমান পাবলিক পরীক্ষাকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। শিক্ষার্থী ও শিক্ষা মূল্যায়নে যথার্থ সংস্কারের জন্য এই পরীক্ষাগুলো উঠিয়ে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষকদের শিক্ষার্থীর অর্জন যাচাইয়ের দক্ষতা বৃদ্ধি প্রয়োজন। এ জন্য প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা ও গবেষণার ব্যবস্থাও দরকার।

উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রেও বড় ক্ষতি হয়েছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অনলাইন শিক্ষাক্রমের মাধ্যমে সেই ক্ষতি অনেকটা কাটাতে পারলেও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পারেনি। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার্থীদের জীবন থেকে কি তাহলে একটি বা দুটি শিক্ষাবর্ষ হারিয়ে যাবে? এই ক্ষতি পুষিয়ে ওঠার পথ কী?

মনজুর আহমেদ: বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের এই উদ্যোগ অপেক্ষাকৃত কার্যকর হয়েছে। কারণ, আগে থেকেই তাদের তথ্যপ্রযুক্তিতে কিছু প্রস্তুতি ছিল। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অপেক্ষাকৃত বিত্তবান বলে তাদের প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগও বেশি। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের করোনাকালে প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রস্তুতি বিশেষ ছিল না। শিক্ষকদেরও আনুপাতিকভাবে প্রযুক্তি দক্ষতা ছিল সীমিত।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রায় পুরো শিক্ষাবর্ষ হারিয়ে যাওয়ার পর ডিগ্রি কোর্সগুলোর সমাপ্তি পিছিয়ে গেছে, সেশনজটের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। এই ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার জন্য দুই থেকে তিন শিক্ষাবর্ষের মধ্যে কার্যপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। ছুটির সময় কমিয়ে, অতিরিক্ত ক্লাসের ব্যবস্থা করে পাঠক্রমে কিছু পুনর্বিন্যাস করে পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে। প্রযুক্তিগত দূরশিক্ষণ ও শ্রেণিকক্ষের শিক্ষার সমন্বয় করতে হবে। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি বিভাগ ও ইনস্টিটিউটের নিজস্ব কার্যক্রম স্থির করতে হবে বিশ্ববিদ্যালয় একাডেমিক কাউন্সিলের সার্বিক নির্দেশনার আওতায়। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনকে ভূমিকা নিতে হবে এ ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে উৎসাহিত করতে ও তাদের উদ্যোগের পর্যালোচনায়।

নতুন শিক্ষাক্রম চালু হচ্ছে। সেখানে বিজ্ঞান, মানবিক ও বাণিজ্য এই বিভাগগুলো থাকছে না। এই সমন্বয়কে কীভাবে দেখছেন?

মনজুর আহমেদ: শিক্ষার বিষয় অনুযায়ী বিজ্ঞান, মানবিক ও বাণিজ্য ইত্যাদি ধারা থাকছে না, তা নয়। ধারার বিভাজন নবম শ্রেণি থেকে না করে একাদশ শ্রেণি থেকে শুরু করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এই ব্যবস্থাই ছিল আশির দশক পর্যন্ত। একুশ শতকের জন্য দক্ষতা ও জ্ঞানের ধরন বিবেচনায় বিভিন্ন ধারায় বিভাজন মাধ্যমিক পর্যায়ে কড়াকড়িভাবে প্রয়োগ না করা সমীচীন বলে মনে করা হচ্ছে। ভাষা, গণিত, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে যথেষ্ট দক্ষতা সব শিক্ষার্থীর জন্য পেশাগত জীবনে ও উচ্চশিক্ষায় সাফল্যের জন্য প্রয়োজন মনে করা হচ্ছে। যুক্তিশীলতা, সৃজনশীলতা, সমস্যা বিশ্লেষণ ও সমাধানের দক্ষতা বিষয়ভিত্তিক জ্ঞানের চেয়েও বেশি প্রাসঙ্গিক বলে বিবেচিত হচ্ছে। এই উদ্দেশ্যে সব শিক্ষার্থীকে মাধ্যমিক স্তরে কিছু অতি প্রয়োজনীয় সাধারণ দক্ষতা অর্জনে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে নতুন শিক্ষাক্রমে।

তবে এই উদ্দেশ্য সফল করতে হলে বিজ্ঞান, গণিত, ইংরেজি ও প্রযুক্তির জন্য যথেষ্ট সংখ্যক যোগ্য ও দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে বর্তমানে অনেক ঘাটতি রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

কোভিড পরিস্থিতির চাপে পড়ে আমরা বুঝতে পেরেছি যে অনলাইনের মাধ্যমে শিক্ষা কার্যক্রমের অনেক কিছুই করা সম্ভব। কোভিড চলে গেলে ভবিষ্যতে এই মাধ্যমকে আরও কার্যকরভাবে ব্যবহারের পথ কী?

মনজুর আহমেদ: যেসব দুর্বলতা, সুযোগের বৈষম্য ও মানে ঘাটতি শিক্ষাব্যবস্থায় ছিল, সেগুলো করোনাকালে প্রকট আকারে দেখা দিয়েছে। আমাদের লক্ষ্য আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়া হতে পারে না। করোনাকালের অভিজ্ঞতার শিক্ষা নিয়ে শিক্ষা উদ্ধারের কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। এই প্রচেষ্টার একটি প্রধান অনুষঙ্গ হবে প্রযুক্তির সঠিক ও ব্যাপকতর ব্যবহার। দূরশিক্ষণ ও সম্মুখশিক্ষণের সংমিশ্রণে ‘নতুন স্বাভাবিক’–এর রূপরেখা তৈরি করতে হবে। ল্যাপটপ, স্মার্টফোন, ট্যাবলেট এসব সামগ্রী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ও শিক্ষার্থীদের জন্য প্রাপ্তি বাড়াতে হবে। ইন্টারনেট ও ওয়াইফাই সংযোগ সহজলভ্য হতে হবে। এ জন্য টেলিযোগাযোগ কর্তৃপক্ষ নিয়ন্ত্রণ সংস্থা ও সেবাদানকারী বাণিজ্য প্রতিষ্ঠানগুলোসহ সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

একইভাবে শিক্ষার বিষয়বস্তু বাংলা ভাষায় প্রযুক্তির মাধ্যমে ব্যাপকভাবে সহজলভ্য করতে হবে। শিক্ষকদের প্রযুক্তিনির্ভর পাঠদানের জন্য তৈরি করতে হবে। প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার সহজলভ্যতা ও ব্যবহার দক্ষতার বৈষম্য নতুন সামাজিক বৈষম্য ও বিভাজন তৈরি করছে। এ ক্ষেত্রে শিক্ষকদের মধ্যস্থতা প্রয়োজন, তাঁরা পিছিয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের সহায়তা ও পরামর্শ দেবেন। শিক্ষকের নিষ্ঠা, সততা, নৈতিকতা ও দায়িত্বশীলতায় শিক্ষার নতুন দিগন্তের উদয় ঘটতে পারে। এ জন্য শিক্ষকের দক্ষতা, যোগ্যতা, প্রস্তুতি ও মর্যাদা নিয়ে নতুন ভাবনা প্রয়োজন। নতুন ভাবনা নিয়ে অন্তত দশসালা পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে হবে।

প্রথম আলো: আপনাকে ধন্যবাদ।

মনজুর আহমেদ: আপনাকেও ধন্যবাদ।

সাক্ষাৎকার থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন