default-image

প্রথম আলো: পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনের আগে তৃণমূল থেকে যখন নবীন নেতারা বেরোতে শুরু করলেন, তখনই গুরুত্ব বাড়ল সিনিয়র নেতাদের। এটাকে আপনি কীভাবে দেখছেন?

সুখেন্দুশেখর রায়: দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের প্রায় সবাই নির্বাচনে লড়ছেন। এমপিদের নিজস্ব বড় কেন্দ্র রয়েছে, তাঁদের সেটা দেখতে হচ্ছে। এই অবস্থায় রাজ্যসভার এমপি যেমন আমি, দোলা সেন বা ডেরেক ও’ব্রায়েন অপেক্ষাকৃতভাবে কম ব্যস্ত। কারণ, এখন সংসদে অধিবেশন চলছে না, ফলে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে যাঁরা কম বয়সী, তাঁদেরও দল সমান গুরুত্ব দিচ্ছে।

প্রথম আলো: আপনি নন্দীগ্রামে বেশ খানিকটা সময় কাটিয়েছেন, তাই আপনাকে একটা প্রশ্ন করি। ওখানে বিজেপির প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারী একটা সাম্প্রদায়িক লাইনে পাকিস্তানের প্রসঙ্গ এনে প্রচার করলেন; এটা নিয়ে খুব জোরালোভাবে তৃণমূল প্রতিবাদ করল না। সিপিআই–এমএল (কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া মার্ক্সিস্ট-লেনিনিস্ট) নির্বাচন কমিশনে অভিযোগ করল, আপনারা করলেন না…

সুখেন্দুশেখর রায়: আমরা নির্বাচন কমিশনে যাইনি, কারণ কমিশনের কাছে আমাদের কোনো প্রত্যাশা নেই। তবে আমাদের প্রচারে এর জবাব ভালোভাবে দেওয়া হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের একাধিক রায় রয়েছে, কোনো রাজনৈতিক দল ধর্মকে ব্যবহার করতে পারবে না। কিন্তু বিজেপি তার জন্মলগ্ন থেকে সাম্প্রদায়িকতা ছড়াচ্ছে, এখন সেটাকে প্রাতিষ্ঠানিক চেহারা দিয়েছে।

প্রথম আলো: সমালোচনা রয়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিভ্রান্তিকর সংখ্যালঘু রাজনীতির। তিনি যা করেছেন যেমন ইমামদের ভাতা দেওয়া, তার ফলে হিন্দু ভোট এক জায়গায় চলে এসেছে। এই অভিযোগটা বামপন্থীরাও করে।

সুখেন্দুশেখর রায়: এটা হাস্যকর যুক্তি। কোথায় ইমামদের ভাতা দেওয়া হলো, পুরোহিতদের কিছু অনুদান দেওয়া হলো, এটা আলোচ্য হতে পারে না। আর বামপন্থীদের কথা যত কম বলা যায়, ততই ভালো। তারা এখনো ১০ বছর আগের হারের দুঃখ ভুলতে পারেনি। তাদের মধ্যে প্রতিশোধস্পৃহা কাজ করছে। বামেরা সব সময় সুবিধাবাদের পক্ষে থেকেছে, এখানে তৃণমূলকে সরাতে বিজেপির সঙ্গে হাত মিলিয়েছে।

বিজ্ঞাপন

প্রথম আলো: দায়িত্ব তৃণমূলের ওপরেও বর্তায়। আপনারা ২০১১ সালে ক্ষমতায় আসার পর এমনভাবে বামপন্থীদের মারধর করেছেন, তারা খেপে গিয়ে বিজেপিকে ভোট দিতে আরম্ভ করেছে…

সুখেন্দুশেখর রায়: মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো নেত্রী ছিলেন বলে পশ্চিমবঙ্গে রক্তগঙ্গা বয়ে যায়নি। ৫০ হাজারের বেশি বিরোধী কর্মীকে খুন করেছে সিপিআই–এম (কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া, মার্ক্সিস্ট)। সিপিআই–এমকে ভোট না দেওয়ায় হাত কেটে নেওয়া হয়েছে। মানুষের তীব্র রাগ ছিল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানতেন সিপিআই–এমের বিরুদ্ধে তীব্র জনরোষ রয়েছে, ফলে গোড়া থেকেই তিনি লাগাম টেনেছিলেন। ফলে সেভাবে আঘাত নামেনি। এখন এই মারধরের যুক্তি দেখিয়ে বিজেপিকে রাজ্যে আনার চেষ্টা করছে। কংগ্রেসের সঙ্গে হাত মিলিয়ে তৃণমূলকে সরাতে চাইছে। দুজনে দুরন্ত শত্রু, কিন্তু যেহেতু ডুবে যাচ্ছে, তাই কোনো রকমে পরস্পরকে ধরে ভেসে ওঠার চেষ্টা করছে, তৃণমূলকে হারিয়ে।

প্রথম আলো: নির্বাচন কমিশন চাইলে আটটার পরিবর্তে ৮০ দফায় নির্বাচন করাতে পারত। হাজার হাজার কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী এনেছে, ভোট চলাকালীন প্রার্থীদের সারাক্ষণই জেরা করেছে কেন্দ্রীয় সংস্থা। দেখা গেল, নির্বাচন কমিশন যা খুশি করতে পারে। সংবিধানে কি নির্বাচনের সময় রাজ্যের হাতে কোনো ক্ষমতাই দেওয়া নেই?

সুখেন্দুশেখর রায়: শাসক দল বিজেপি নির্লজ্জভাবে নির্বাচন করাচ্ছে। কংগ্রেসও এটা করেনি।

প্রথম আলো: কিন্তু এটাও তো কোথাও লেখা নেই যে নির্বাচন কমিশন এইভাবে ভোট করাতে পারবে না, আট দফায় ভোট করাতে পারবে না, এত বাহিনী আনতে পারবে না, তাই না?

সুখেন্দুশেখর রায়: এটা যেমন লেখা নেই, তেমন এ–ও বলা যাবে না যে এটা কোথাও লেখা আছে। এটা দুভাবেই ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। সংবিধানে সবকিছু লেখা থাকে না। কনভেনশন (প্রথা) বলে একটা ব্যাপার রয়েছে। পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে বড় সংবিধান হচ্ছে আমাদের। তারপরও এটা হচ্ছে, কারণ সংবিধান রক্ষা করার দায়িত্ব যাদের, তারা এটাকে নষ্ট করছে।

প্রথম আলো: লেখা নেই মানেই কমিশন বেআইনি কাজ কিছু করছে না…

সুখেন্দুশেখর রায়: এখানে কি আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে? উত্তর প্রদেশের মতো রোজ খুন হচ্ছে? পুলিশের লাগাতার অত্যাচার চলছে, নাকি এখানে যুদ্ধ হচ্ছে? কী হচ্ছে এখানে যে এইভাবে ভোট করাতে হবে? আমরা আজকে প্রথম নির্বাচন দেখছি না। কবে থেকে শুরু হলো দফায় দফায় নির্বাচন? আগে এক-দুই দফায় নির্বাচন হতো। কেন্দ্রীয় বাহিনীর দরকারটা বাম ফ্রন্টের আমলে হলো, কারণ তারা ভোট দিতে দিত না…

প্রথম আলো: তাহলে আপনি মোটামুটিভাবে অমিত শাহর বক্তব্যটাই মেনে নিচ্ছেন যে এই কেন্দ্রীয় বাহিনী দিয়েই তো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ক্ষমতায় এসেছেন?

সুখেন্দুশেখর রায়: আমরা কেন্দ্রীয় বাহিনী দিয়ে ক্ষমতায় আসিনি, আমরা জনগণের ভোটে ক্ষমতায় এসেছি…

প্রথম আলো: কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কেন্দ্রীয় বাহিনী দিয়ে ভোট করানো সমর্থন করেছিলেন…

সুখেন্দুশেখর রায়: কারণ, বাম ফ্রন্ট কাউকে ভোটকেন্দ্রে যেতে দিত না, হাত কেটে নেওয়া হতো।

প্রথম আলো: আপনার কথা থেকে একটা ব্যাপার পরিষ্কার…সংবিধানে এমন কিছু বলা নেই যে নির্বাচন কমিশন কী করতে পারে আর কী করতে পারে না। অন্তত নির্বাচনের ক্ষেত্রে সাংবিধানিক গন্ডগোল আছে, রাজ্যের বিশেষ কিছু করার নেই…

সুখেন্দুশেখর রায়: সাংবিধানিক গন্ডগোল কিছু নেই। যাঁরা সংবিধান তৈরি করেছিলেন, তাঁরা আমাদের থেকে কম বুঝতেন না। অনেকগুলো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান, যেমন নির্বাচন কমিশন, যেমন বিচারব্যবস্থা, এদের হাতে প্রচুর ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট একাধিক মামলায় বলেছিলেন যে বৃহত্তর স্বার্থে তাঁরা এই ক্ষমতার ব্যবহার করবেন। এখন ক্ষমতার যদি অপব্যবহার করে তবে মানুষের অসুবিধা হয়, গণতন্ত্রের ওপর আঘাত আসে।

বিজ্ঞাপন

প্রথম আলো: আপনি একটা নৈতিক প্রশ্ন তুলছেন, কিন্তু এটা একটা আইনি প্রশ্ন…

সুখেন্দুশেখর রায়: আমি রাজনৈতিক, আইনি, প্রশাসনিক এবং সাংবিধানিক প্রশ্ন তুলছি।

প্রথম আলো: আমার প্রশ্ন, নির্বাচন কমিশন বেআইনি তো কিছু করেনি। তারা তো বাহিনী আনতে পারে, অসংখ্য দফায় নির্বাচনও করাতে পারে?

সুখেন্দুশেখর রায়: পুরোপুরি বেআইনি কাজ করেছে। যে কাজের কোনো জাস্টিফিকেশন নেই, ব্যাখ্যা নেই, তা পুরোপুরি বেআইনি।

প্রথম আলো: তাহলে এর বিরুদ্ধে মামলা করলেন না কেন?

সুখেন্দুশেখর রায়: মামলা করব কার কাছে?

প্রথম আলো: সুপ্রিম কোর্টে যেতে পারতেন।

সুখেন্দুশেখর রায়: আমরা জানি কোথায় মামলা করতে হয়, কীভাবে করতে হয়। কিন্তু প্রশ্নটা হলো মামলা করে সুবিচার পাওয়া যাবে কি? সরকার সাংবিধানিক সংস্থাগুলোকে পদানত করেছে, যা ইতিপূর্বে ঘটেনি। ভারতে গণতন্ত্র দুর্বল হয়ে পড়েছে, মানুষ গণতন্ত্রের ওপর আস্থা হারাচ্ছে।

প্রথম আলো: আমরা একটা জিনিস এবারে নির্বাচনে দেখলাম যে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন চলাকালীন বাংলাদেশ গেলেন এবং সেখানে একটি ধর্মীয় গোষ্ঠীর মন্দিরে গেলেন, এই ব্যাপারটাকে তৃণমূল কীভাবে দেখে?

সুখেন্দুশেখর রায়: অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রতিবেশীকে জড়ানো উচিত নয়। ভারতের আরও বেশি সতর্ক থাকা উচিত। প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনের সময় তাঁর কূটনৈতিক সফরকে রাজনৈতিক সফরের কাজে লাগালেন। হয়তো এর আগেও নির্বাচনের সময় প্রধানমন্ত্রীরা দেশের বাইরে গিয়েছেন; কিন্তু ফিরে এসে সেটাকে নির্বাচনের কাজে লাগাননি। তিনি তো আগেও অনেকবার বাংলাদেশে গেছেন, কখনো কি তিনি হরিচাঁদ-গুরুচাঁদ ঠাকুরের মন্দিরে গেছেন? তা–ও ওই সম্প্রদায়ের একজন নেতা ও তাঁদের দলের এমপিকে সঙ্গে নিয়ে? শুধু এটাই নয়, তিনি বলে বসলেন যে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে তিনি জেল খেটেছেন। এর মানে কী? এর কোনো প্রমাণ নেই। এত সমালোচনা হলো, সামাজিক মাধ্যমে তিরস্কৃত হলেন, কিন্তু দলের পক্ষ থেকে তাঁর বক্তব্যের সমর্থনে কেউ একটা বিশ্বাসযোগ্য কথা বলতে পারলেন না, কোনো প্রমাণ দেখাতে পারলেন না। পাশাপাশি দেখুন, ওনার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ধারাবাহিকভাবে বলে চলেছেন যে বাংলাদেশ থেকে অনুপ্রবেশকারী ভারতে ঢুকেছে। বাংলাদেশ থেকে বলা হয়েছে, সেখান থেকে মানুষ ভারতে যায় না। কারণ, সেখানে জীবনযাপনের মানের অনেক উন্নতি হয়েছে। সাম্প্রতিক বিশ্বব্যাংকের রিপোর্টেও সে কথা বলা হয়েছে। কিন্তু ওনারা যুক্তি, পড়াশোনা এই সবে বিশ্বাস করেন না।

প্রথম আলো: এই সাংঘাতিক চাপের মধ্যে নির্বাচনে আপনাদের ফল কেমন হবে?

সুখেন্দুশেখর রায়: বাঙালি জাতিসত্তার ওপর আক্রমণ হয়েছে এই নির্বাচনে। আমার ধারণা, এর জবাব মানুষ ভোটের মাধ্যমে দেবেন।

প্রথম আলো: আপনাকে ধন্যবাদ।

সুখেন্দুশেখর রায়: আপনাকেও ধন্যবাদ।

সাক্ষাৎকার থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন