বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

এ অভিমান কি সাময়িক নাকি আজীবনের সেটা আমার পক্ষে বলা সম্ভব নয়। তবে কিছুটা অনুমান করতে পারি যে উৎসবমুখর সেই ভোটের দিনগুলো ফিরে আসার জন্য সুসময়ের অপেক্ষায় হিমালয়ের ওপরে বসবাস করছে। সময় হলে ঠিকই ফিরে আসবে।

গত ১১ নভেম্বর ঝিনাইদহ জেলার মহেশপুর উপজেলার ইউপি নির্বাচন হয়ে গেল। সেখানকার একজন কুতুবউদ্দিন (ছদ্মনাম) ৫০ বছর বয়সী মানুষের সঙ্গে কথা হলো। তিনি বললেন, ২০ বছর আগেও সবাই মিলে আনন্দ করতে করতে ভোটকেন্দ্রে যেতাম। এখন তো আর সেই সুযোগ নেই। তাই এবার ভোটকেন্দ্রে যাওয়া হয়ে ওঠেনি।

এবার আমার নিজের কথাই বলি। আমার বয়স তখন ১০ বছর। সেই সময় একটি নির্বাচন হয়েছিল আমার গ্রামে। নির্বাচনের এক সপ্তাহ আগে থেকে ভীষণ আনন্দিত হয়েছিলাম। চারদিকে মাইকের শব্দ। ছোট ছোট লিফলেটের অপেক্ষায় সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত রাস্তায় থাকতাম অধীর আগ্রহ নিয়ে। দুই একটা বড় পোস্টার হাতে পাওয়া মানে আকাশের চাঁদ হাতে পাওয়ার মতো অবস্থা।

নির্বাচনের আগের দিন দাদি বলে রেখেছিল, আমাকে ভোটকেন্দ্রে নিয়ে যাবে। সেদিন রাতে আর ঘুম হয়নি। সারা রাত দাদিকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে ছিলাম। কারণ, দাদি যদি সকালে উঠে আমাকে না নিয়ে চলে যায় সেই ভয়ে। সকাল হলে দাদি ডেকে দিল। তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে উঠে হাত-মুখ পরিষ্কার করে নিলাম। আম্মু নতুন জামাকাপড় পরিয়ে দিলেন। সঙ্গে নতুন জুতাটাও দিলেন। সেটি ছিল মূলত ঈদের জুতা। যাহোক, রওনা দিলাম দাদির সঙ্গে। ভোটকেন্দ্রে পৌঁছে দেখি শত শত মানুষের প্রচণ্ড ভিড়। রাস্তার দুই ধারে খাবারের দোকানপাট বসেছে। একজন আমার দাদিকে জিজ্ঞাসা করল, তোমার সঙ্গে বাচ্চাটি কে? দাদি উত্তর দিল আমার পুতাছেলে (আঞ্চলিক ভাষা)। সঙ্গে সঙ্গে আমার হাত ধরে নিয়ে দাদিকে বলল তোমার পোতাছেলে আমার সঙ্গে পাঁপড় ভাজা খাবে। তুমি সেই সুযোগে ভোট দিয়ে এসো।

দূর থেকে তাকিয়ে দেখলাম বিশাল লম্বা লাইন। আমাদের প্রাইমারি স্কুল মাঠে এত বড় বড় ১২টি লম্বা লাইন দেখে অবাক হলাম। ওরা ওইখানে কী করছে? তখন ভোট কি জিনিস জানতাম না তাই। ভোট শেষে বাড়ি ফিরলাম আনন্দ করতে করতে।

আরেকটি উদাহরণ দিলে মন্দ হয় না। রাকিব আহমেদ (ছদ্মনাম) পাশের বাড়ির এক শুভাকাঙ্ক্ষীকে বললেন, ‘ভাই, ভোট দিতে যাবেন না?’ তিনি জবাবে বললেন, ‘নিজের খেয়ে পরের হাতে মার খেতে যাব নাকি?’ তিনি আরও বললেন, ভোট কি আর আগের মতো হয়? দেখেন গিয়ে আমার ভোট দেওয়া হয়ে গেছে। ভোট নাকি এখন আর দেওয়া লাগে না। এমনিতেই হয়ে যায়। শুনেছি আজকাল নির্বাচনেও অটো পাস হচ্ছে। তারপর দুজনই অট্টহাসিতে মেতে উঠলেন।

বর্তমান সময়ের নির্বাচন দেখে সব শ্রেণির মানুষ হাসি–ঠাট্টা করার সুযোগ পাচ্ছে। এ লজ্জা ইসির নাকি ক্ষমতাসীন দলের? বর্তমান সময়ে নির্বাচনের কথা শুনলেই সাধারণ মানুষ ভয় পায়। এখন নির্বাচন একটি আতঙ্কের নাম। বর্তমান সময়ের ৭০ শতাংশ ‘নির্বাচিত’ নেতা হাসিনার মাত্র।

আরেকটা বিষয় লক্ষ করা যায়। সেটি হচ্ছে একটি সমাজ বা গ্রামে যদি দরিদ্র পরিবার থাকে। তাহলে ইউপি নির্বাচন আসলে তাদের জন্য বিপদ। কারণ, তারা নাকি ভোট টাকায় বিক্রি করে দেয়। নির্বাচনে দাঁড়ানো প্রভাবশালী কোনো ব্যক্তি যদি ভোটে হেরে যান, নির্যাতনের মুখে পড়ে পার্শ্ববর্তী কোনো দরিদ্র পরিবার। এমনকি তাদের একঘরে করে দেওয়ার ঘটনাও ঘটে।

এখন যাঁরা নিজেদের নেতা বলে দাবি করেন, জনপ্রতিনিধি হতে চান, তাঁরা জানেন না একজন নেতার গুণাবলি কী। নেতা হতে হলে ন্যূনতম মানবিক জ্ঞান থাকা জরুরি এবং উত্তম চরিত্রের অধিকারী হতে হয়। পরোপকারী হতে হয়। মানুষের পাশে থাকতে হয়। জোর করে প্রকৃত নেতা হওয়া যায় না। কিন্তু এখনকার নির্বাচনের মাধ্যমে কিছু ব্যক্তি যেন একপ্রকার জোর করেই নেতা বনে যাচ্ছেন। তাঁরা জনগণের মতামত শোনেন না, তাঁরা উল্টো জনগণকে দাবিয়ে রাখার চেষ্টা করেন।

একজন বিশুদ্ধ জনপ্রতিনিধি পেতে প্রয়োজন স্বচ্ছ নির্বাচন। সেই সঙ্গে সুচিন্তা, জবাবদিহি, আইনের সঠিক ব্যবহার হলে ফিরবে উৎসবমুখর ভোটের দিনগুলোও।

শিশির মাহমুদ
ঢাকা

চিঠি থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন