গণপিটুনিতে হত্যার দায় রাষ্ট্র ও বিচারব্যবস্থার

আমাদের সমাজ ভয়াবহ অসহিষ্ণু ও উগ্রবাদের দিকে যাত্রা করছে। সামাজিক জীবনে কোথাও সহনশীলতা নেই। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সাইকোপ্যাথ বা মানসিকভাবে অসুস্থ না হলে, মানবিক গুণ না হারালে কোনো ব্যক্তিগোষ্ঠীর পক্ষে কোনো সম্মিলিত খুন করা সম্ভব হয় না। আমাদের দেশে অন্যান্য অপরাধের মতো গণপিটুনিও ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। কোনো গুজবে কারণ অনুসন্ধান ব্যতীত অথবা সন্দেহের বশে উত্তেজিত জনতা এককের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে হত্যা করছে, সঙ্গে লাশ পুড়িয়ে দেওয়া, অঙ্গহানি করার মতো ন্যক্কারজনক ঘটনাও ঘটে যাচ্ছে। তবে এসব হত্যার ইতিহাস নতুন নয়, বরং সুদূরপ্রসারী।

আমরা এর আগেও রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় সম্মিলিত হত্যা ও লাশের ওপর নৃত্যের চিত্রও দেখেছি। গণপিটুনি শব্দের আভিধানিক অর্থ গণপ্রহার। একে প্রচলিত অর্থে গণধোলাই বলা হয়। গণপিটুনির ঘটনা পৃথিবীব্যাপী ‘মব লিঞ্চিং’ নামে পরিচিত। কোনো উত্তেজিত জনতা দ্বারা এককের বা দলের ওপর যদি অতর্কিত হামলা চালানো হয়, তাকে গণপিটুনি বলে। এ নিয়ে বিখ্যাত মনোবিজ্ঞানী গুস্তাভ লে বোঁ বলেন, জনতার ভিড়ে ব্যক্তির ব্যক্তিসত্তার বিলুপ্তি ঘটে। জনতার সম্মিলিত মন তখন বিপজ্জনক সিদ্ধান্ত নেয়। তবে একটি বিষয় উল্লেখ করার মতো, তা হলো একক হত্যা আর সম্মিলিত হত্যার সাইকোলজিক্যাল প্রেক্ষাপট এক নয়। অন্য হত্যাকারীদের একটি অপরাধপ্রবণতা কাজ করে। তারা এটি নিয়ে আতঙ্কের মধ্যে থাকে। কিন্তু সম্মিলিত হত্যাচিত্রগুলো দেখলে মনে হয়, তারা এ হত্যার দ্বারা সমাজকে পাপমুক্ত করে সংস্কার করছে। নিজেরা এর দ্বারা পুণ্য অর্জন করছে। আইন–বিচার সবকিছুকে জলাঞ্জলি দিয়ে তারা নিজেরা গণ–আদালত সৃষ্টি করে বসে। কিন্তু বিষয়টি বাংলাদেশ সংবিধান ও মানবাধিকার সনদের সম্পূর্ণ পরিপন্থী।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশে গণপিটুনি ব্যাপকহারে বেড়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে বিচারহীনতাকেই দায়ী করা যায়। মানুষের একটি সাধারণ প্রবণতা হলো মানুষ যখন আইনি প্রতিকার লাভে ব্যর্থ হয়, তখনই আইনের ওপর অনাস্থায় ভোগে। ফলে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়। বিচারহীনতা, আইনের ফাঁকফোকর, দীর্ঘসূত্রতার জন্যই মানুষ আইনের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলেছে। আর এ জন্যই এখন সাধারণ মানুষ খুনি, ধর্ষকসহ অন্যান্য অপরাধীর বিচার না চেয়ে ক্রসফায়ারের আন্দোলন করে।

মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্যমতে, ২০১১-২০১৯ সাল পর্যন্ত দেশে ৮০০ মানুষ গণপিটুনিতে নিহত হয়েছে, কিন্তু এর কোনোটির উল্লেখযোগ্য বিচার হয়েছে, এমন তথ্য নেই। দ্বিতীয়ত, এসব সহিংসতার জন্য মানুষের নির্বিকার হিংস্র মনোভঙ্গি এবং অপরাপর মানুষের নিষ্ক্রিয়তা দায়ী। এ-বিষয়ক আইনজীবীদের মতে, ভিকটিম পরিবারগুলোর নির্লিপ্ততার জন্যও এসব মামলা বেশি দিন এগোয় না। এখানে মূল কারণ হলো মানুষ আইনের প্রতি আস্থা রাখতে পারে না। আবার পুলিশ বাদী, এমন মামলাগুলোতে অনেক অজ্ঞাতনামা আসামি থাকে। ভিকটিম পরিবারগুলোর অভিযোগ এবং মামলা চালিয়ে যাওয়ার সদিচ্ছার অভাবেও এসব মামলার অগ্রগতি নেই।

আমি এখানেও রাষ্ট্রকে দায়ী করতে চাই। কারণ, কেউ অভিযোগ করুক বা না করুক রাষ্ট্রের উচিত বিষয়গুলো অনুসন্ধান করা এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। সবশেষে বলতে চাই, মানবসভ্যতা ও আধুনিকতার স্বর্ণযুগেও এমন বর্বর, নৃশংস হত্যাযজ্ঞ চলতে দেওয়া যায় না। সরকারের এখনই সময় এরূপ বীভৎসতার ইতি টানতে উদ্যোগী হওয়া এবং এসব উগ্রবাদীদের বিচারের আওতায় এনে এসব অন্যায়ের প্রতি ভীতি সৃষ্টি করা। আমি মনে করি, সামাজিক কুসংস্কারমুক্ত শিক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি রাজনৈতিক অস্থিরতা কমিয়ে জনপ্রশাসনের ক্রিয়াশীল মনোভাবকে কাজে লাগিয়ে সুবিচার নিশ্চিত করা গেলে এমন অপরাধ অনেকটা কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।

ইস্রাফিল রনি: আইন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0