না-বোধক শব্দের ব্যবহার কমাতে হবে

একদা এক বাবা তাঁর ছেলেকে তাঁদের পারিবারিক লাইব্রেরিতে নিয়ে (আঙুল দিয়ে দেখিয়ে) বলেন, ‘এখানে যে কটি বই আছে, সব কটি তুমি পড়বে শুধু এই ড্রয়ারের বইগুলো বাদে।’ কিছুদিন পর ছেলেটি বাবার কাছে গিয়ে বলল, ‘বাবা, তুমি আমাকে ড্রয়ারের সেই বই পড়তে নিষেধ করলে কেন? আমি লাইব্রেরির সব বই পড়েছি সঙ্গে ড্রয়ারের বইগুলোও। আমার মনে হলো, পুরো লাইব্রেরির মধ্যে শুধু সেই ড্রয়ারের বইগুলোই আমার জীবনে কাজে আসবে।’

তখন বাবা একটি হাসি দিয়ে বলেন, ‘আমি চেয়েছিলাম যাতে তুমি অবশ্যই সেই বইগুলো পড়। আমি যদি সরাসরি বলতাম যে তুমি এই বইগুলো পড়, তাহলে তুমি আমার কথায় ততটা গুরুত্ব দিতে না। বরং উপহাস করে উড়িয়ে দিতে। কিন্তু আমি যখন তোমাকে বইগুলো পড়তে নিষেধ করেছি, তখন এই বইগুলোর প্রতি তোমার কৌতূহল আরও বেড়ে গেছে এবং আমি এটাই চেয়েছিলাম।’

বিজ্ঞাপন

হিউম্যান সাইকোলজি বলে, মানুষকে যে কাজগুলো করতে নিষেধ করা হয়, তার সেই কাজের প্রতি আগ্রহ ও কৌতূহল আরও বেড়ে যায়। এবং সেই নিষিদ্ধ কাজগুলোই বেশি বেশি করতে পছন্দ করে। বলা যেতে পারে, তারা না-বোধককে হ্যাঁ-বোধক মনে করে।

আমরা প্রায় সময়ই বলে থাকি, ‘মাদককে না বলুন, পর্নোগ্রাফিকে না বলুন, জঙ্গিবাদকে না বলুন ইত্যাদি। আপেক্ষিক দিক থেকে আমরা ‘না’ বলতে ‘না’ কেই বোঝাই। কিন্তু সমাজে কিছু লোক আছে যাদের কিছু করতে নিষেধ করলে, তারা সেই কাজই আরও বেশি করে। কারণ, সেই ‘না’ বলার মধ্যে তারা কৌতূহল খুঁজে পায়। সেই কাজের প্রতি তাদের আগ্রহ আরও বেড়ে যায়। ফলে তারা সেই কাজের প্রতি ধাবিত হয় এবং অনাকাঙ্ক্ষিত বা অগোচরেই তারা বিভিন্ন সামাজিক অপরাধে লিপ্ত হয়। বলা যায়, সামাজিক কিছু অপরাধ আমাদের বহুল প্রচলিত না-বোধক শব্দের কারণেও হয়ে থাকে।

আমরা সেই না-বোধক শব্দের বদলে হ্যাঁ-বোধক শব্দের প্রচলন করতে পারি। যেমন ‘মাদককে না বলুন’-এর বদলে বলতে পারি ‘মাদক মৃত্যু ঘটায়,’ ‘পর্নোগ্রাফিকে না বলুন’-এর বদলে বলতে পারি ‘পর্নোগ্রাফি মানবতার জন্য হুমকিস্বরূপ’ ইত্যাদি।

হিউম্যান সাইকোলজির এই অংশকে বলা হয়, ‘লস এভারশন’, অর্থাৎ আমাদের ব্রেন লস বা ক্ষতিকে কখনো গ্রহণ করতে চায় না। যদি বলা হয় যে ‘মাদক মৃত্যু ঘটায়’, এখানে ব্রেইন যখন দেখছে তার লস হচ্ছে, তখন সে ওই কাজ করতে আর উৎসাহিত বা কৌতূহলী হবে না। হিউম্যান ব্রেন লস বা ক্ষতিকে সহজে মেনে নিতে পারে না। তাই ব্রেইন যেদিকে লস বা ক্ষতির আভাস দেখে, সেদিকে আর এগোতে চায় না। এটাই হচ্ছে হিউম্যান ব্রেনের খেলা।

এতে হয়তো পুরোপুরি অপরাধ দমন করা যাবে না। তবে কিছুটা হলেও প্রশমন করা যাবে। আর মানুষের মধ্যে কোনো ধরনের নেগেটিভিও কাজ করবে না। বিশেষ করে বাচ্চাদের ক্ষেত্রে না-বোধক শব্দের ব্যবহার না করাই উত্তম এবং মনোবিজ্ঞানীরাও তা-ই বলেন।

মুন্সী মুহাম্মদ জুয়েল, দর্শন বিভাগ, চট্টগ্রাম কলেজ, চট্টগ্রাম

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0