বাহান্নর একুশে ফেব্রুয়ারির সকালে ভিক্টোরিয়া পার্ক এলাকা থেকে ছয়–সাত হাজার স্কুলছাত্র মিছিল করে ইউনিভার্সিটিতে গিয়েছিল। সেই মিছিলের নেতৃত্বে ছিলাম আমি। আমি তখন ইউনিভার্সিটিতে পদার্থবিদ্যা এবং গণিতের সম্মানের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। ২০ ফেব্রুয়ারি আনুমানিক বেলা তিনটার সময় মাইকযোগে ঘোষণা করা হয়েছিল যে পুনরাদেশ না দেওয়া পর্যন্ত ঢাকা শহরে ১৪৪ ধারা বলবৎ করা হলো।
১৪৪ ধারা জারি করা হয় বাঙালি ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট হায়দর আলিকে বদলি করে উর্দুভাষী কোরেশিকে সেই পদে নিয়োগের মাধ্যমে। পূর্ব বাংলার প্রধানমন্ত্রীকে না জানিয়ে এই অপকর্ম করা হয়েছিল। পূর্ব বাংলার সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন পাঞ্জাবি আইসিএস অফিসার আজিজ আহমদ। তাঁকে নিয়োগ দিয়েছিলেন স্বয়ং মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ।
একুশে ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে আটটার সময় ভিক্টোরিয়া পার্কের পূর্ব দিকে অবস্থিত সেন্ট গ্রেগরিজ স্কুলের গেটে এককভাবে স্লোগান দিতে থাকি ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’। দুজন ব্রাদার এসে গেটে তালা লাগিয়ে দেন। আমি সেখান থেকে সদরঘাটের ইস্ট বেঙ্গল ইনস্টিটিউশনে গিয়ে আবার স্লোগান দিতে থাকি ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’। এবার আমি সফল হলাম। স্কুলের ছেলেরা বেরিয়ে এসে আমার সঙ্গে স্লোগান দিতে থাকে।
আমি ইস্ট বেঙ্গল ইনস্টিটিউশনের ছাত্রদের নিয়ে মিছিল করে নর্থব্রুক হল পেরিয়ে জুবিলী স্কুলে স্লোগান দিতে থাকি। জুবিলী স্কুল ছিল সেই আমলের ঢাকার এক বিখ্যাত স্কুল। এখানেও আমি স্কুলে ধর্মঘট করাতে সফল হলাম। সম্মিলিত ছাত্রদের নিয়ে আবার ভিক্টোরিয়া পার্ক এলাকায় ফেরত এলাম। তখনকার ঢাকার স্কুলগুলো ওই এলাকায় অবস্থিত ছিল। ইতিমধ্যে মোসলেম হাইস্কুল, কলেজিয়েট স্কুল এবং পোগোজ স্কুলের ছাত্ররা আমাদের সঙ্গে যোগ দেয়।
আমি এই ছাত্রদের নিয়ে নবাবপুর রোড ধরে এগোতে থাকি। রথখোলার ডানদিকে মোড় নিয়ে গ্র্যাজুয়েট স্কুলের সামনে আসি। স্কুলের কর্তৃপক্ষ গেটে তালা লাগিয়ে দিলে অনেক ছাত্র স্কুলের দেয়াল ডিঙিয়ে আমাদের সঙ্গে যোগ দেয়। মিছিল নিয়ে আবার নবাবপুর রোড দিয়ে উত্তর দিকে এগোতে থাকি। নবাবপুর রোডের পূর্ব পাশে ছিল প্রিয়নাথ স্কুল। পরে এর নামকরণ হয় নবাবপুর গভর্নমেন্ট হাইস্কুল। এর ছাত্রসংখ্যা ছিল অনেক।
মিছিল নিয়ে আমরা যখন এই স্কুলে পৌঁছালাম, কাপ্তান বাজারের কমিউনিস্ট পার্টির শাখা অফিসের দু-তিনজন কমরেড আমাদের সহায়তা করতে এগিয়ে আসেন।
মিছিলের অগ্রভাগ যখন নবাবপুর লেভেল ক্রসিং পার হয়, তখন দেখতে পেলাম নারীশিক্ষা মন্দিরের আট-দশজন ছাত্রী গভর্নর হাউসের পাশ দিয়ে মিছিল করে আসছে।
ছাত্রীদের এই দলটিকে আমাদের মিছিলের পুরো ভাগে স্থান দিই। পুরো মিছিলটিকে নিয়ে রমনা পোস্ট অফিসের সামনে দিয়ে, আজকে নগর ভবন, পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স পেরিয়ে এশিয়াটিক সোসাইটির দক্ষিণ পাশ দিয়ে ইউনিভার্সিটির কলাভবনে প্রবেশ করি। তখন দুপুর সাড়ে ১২টা পেরিয়েছে। এর পরের ইতিহাস সবার জানা।
২২ ফেব্রুয়ারি গায়েবানা জানাজার পরে লাখো লোকের মিছিল কার্জন হলের উত্তর পাশের সড়ক দিয়ে যখন অগ্রসর হচ্ছিল, গণিত বিভাগের জার্মান অধ্যাপক ম্যাক্স পিনল্ বললেন, ‘দিস ইজ রেভল্যুশন, দিস ইজ রেভল্যুশন’। এটা বিপ্লব।
একুশে ফেব্রুয়ারির ভাষা আন্দোলনের পরই নির্মিত হয় শহীদ মিনার। যতদূর মনে পড়ে ২৩ ফেব্রুয়ারি ছাত্র–জনতা কয়েক ঘণ্টার মধ্যে শহীদ মিনার নির্মাণ করেছিলেন। নির্মাণকাজে দু-তিনটা ইট আমিও বয়ে এনেছিলাম।
যে শহীদ মিনারটার ছবি আমার স্মৃতিতে ভাস্বর, সেটা আজকের শহীদ মিনার নয়। পাকিস্তানি দুর্বৃত্তরা প্রথম শহীদ মিনার ভেঙে দিয়েছিল ২৬–২৭ ফেব্রুয়ারি। আলাদা নকশায় সেটি পুনর্নিমাণ করা হয়েছিল। সেটাকেও পাকিস্তানি দুর্বৃত্তরা ভেঙে ফেলেছিল।
রফিকুল ইসলাম
গুলশান, ঢাকা।
[email protected]

বিজ্ঞাপন
চিঠি থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন