মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় এগিয়ে আসুন

করোনা মহামারির কারণে বিশ্বজুড়ে মানসিক স্বাস্থ্য মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখে। বিশেষজ্ঞদের মতে, করোনার সেকেন্ড ওয়েব আসবে আর সেটা হবে মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক। তাই মানসিক স্বাস্থ্য-সমস্যা করোনা মহামারির মতো বৈশ্বিক সমস্যা। করোনার করাল গ্রাসে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত স্বাস্থ্য খাত। স্বাস্থ্য ঝুঁকি, প্রিয়জন হারানোর ভয়, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ইত্যাদির ফলে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হওয়ার ফলে মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য ব্যাপকভাবে ক্ষতির মুখে পড়েছে।

একটি জরিপে দেখা গেছে, পৃথিবীতে ৪০ শতাংশ মানুষ মানসিক চাপে রয়েছে এই মহামারির প্রভাবে। অতিরিক্ত মানসিক চাপে মানুষের মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়, উচ্চরক্তচাপ বেড়ে যায়, বুক ধড়ফড় করে, ব্যথা ব্যথা করে, ঘুমে ব্যাঘাত ঘটে, শ্বাস নিতে সমস্যা হয়, কোনো কিছুতে মন বসে না, খাওয়ার রুচি কমে যায়, বিষণ্নতা বেড়ে যায়, কর্মদক্ষতা হারিয়ে যায়, আত্মবিশ্বাস কমে যায়, অস্থিরতা বাড়ে, সহজ বিষয়কে সহজভাবে মেনে নিতে পারে না। ফলে একদিকে যেমন নিজের কর্মদক্ষতা কমে যায় ঠিক তেমনি মানসিক স্বাস্থ্যের ব্যাপক ক্ষতি হয়।

বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলো শারীরিক স্বাস্থ্যের মতো মানসিক স্বাস্থ্যর ওপর গুরুত্ব দিলেও আমাদের দেশে কোনো এক অদ্ভুত কারণে মানসিক স্বাস্থ্য-সমস্যা নিয়ে মানুষের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই, এমনকি মানসিক স্বাস্থ্য-সমস্যা চরম পর্যায়ে পৌঁছালেও চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয় না। সামাজিক কুসংস্কারের কারণে অনেকে রোগ গোপন করার চেষ্টা করে।

২০১৮-১৯ সালের মানসিক স্বাস্থ্য জরিপে দেখা যায়, প্রায় ১৭ শতাংশ মানুষ মানসিক স্বাস্থ্য-সমস্যায় ভুগছে, যার মধ্যে ৯৪ শতাংশ কোনো চিকিৎসা নেয় না। এই মহামারিতে মানসিক রোগীর সংখ্যা কয়েক গুণ বাড়বে, তা সহজেই অনুমেয়। সারা দিন বাড়িতে বসে থেকে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর খারাপ প্রভাব পড়ছে, যা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

শারীরিক সুস্থতার সঙ্গে মানসিক সুস্থতাও জরুরি। মানসিক চাপে শারীরিক স্বাস্থ্যের ব্যাপক ক্ষতি হয়, শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে, কাজ করার ক্ষমতা কমে যায়। চীন, ইতালি ও যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রায় ৩০ শতাংশ মানুষ পিটিএসডিতে (পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার) ভুগবে। তাই এটাকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য না করে গুরুত্ব সহকারে নিতে হবে।

আমাদের দেশে মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে অসচেতনতা বড় উদ্বেগের বিষয়। তাই সরকারি-বেসরকারি মহলকে এ বিষয়ে জরুরি ভিত্তিতে পদক্ষেপ নিতে হবে। মানসিক চিকিৎসায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়াতে বিভিন্ন সভা, সেমিনার ছাড়াও গণমাধ্যমে প্রচারণা চালাতে হবে। এ দেশে মানসিক রোগ নিয়ে পড়াশোনা করলেও অনেকে পেশা হিসেবে এটাকে কেউ নিতে চায় না। ফলে প্রতি দুই লাখ মানুষের জন্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক রয়েছেন মাত্র একজন। আবার অনেক চিকিৎসক বোঝেন না যে, মানুষটি মানসিক রোগে আক্রান্ত। ফলে রোগী ব্যাপক স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে পড়ে।

সরকারিভাবে জেলা-উপজেলা পর্যায়ে মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরিধি বাড়াতে হবে। শারীরিক স্বাস্থ্যের মতো মানসিক স্বাস্থ্যও গুরুত্বপূর্ণ, এই বিষয়ে প্রচারণা চালাতে হবে। বিশেষজ্ঞদের শহরকেন্দ্রিক প্রবণতা থেকে বের করে আনতে হবে। করোনা মহামারির সেকেন্ড ওয়েব মোকাবিলা করতে সাধারণ মানুষকেও এগিয়ে আসতে হবে। কোনোভাবেই চাপ নেওয়া যাবে না। এই বিশাল অবসরকে উপভোগ্য করে তুলতে হবে। সুস্থ পৃথিবীতে কাজের চাপে হয়তো প্রিয় বই কিংবা প্রিয় সিনেমাটা দেখা হয়ে ওঠেনি এই বিশাল অবসরে, না করা কাজগুলো করে ফেলতে হবে। আশা রাখতে হবে এই দুর্দিনের শেষ হয়ে সুদিনের দেখা মিলবে।

হাবিবা খাতুন শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0