ফাঁকা মহাসড়কে মন জুড়িয়ে সাইকেল চালাচ্ছে দুই বন্ধু। তারা জানে করোনাভাইরাসের জন্য বাইরে বের হলে মাস্ক পরতে হবে।
ফাঁকা মহাসড়কে মন জুড়িয়ে সাইকেল চালাচ্ছে দুই বন্ধু। তারা জানে করোনাভাইরাসের জন্য বাইরে বের হলে মাস্ক পরতে হবে। ছবি: দীপু মালাকার

করোনাভাইরাসের প্রথম ধাক্কার ভয়, উৎকণ্ঠা ও পরিস্থিতির উন্নতি স্বাভাবিক না হতেই দ্বিতীয় দফা সংক্রমণ তীব্রতর হচ্ছে। ফ্রান্স, জার্মানি, ভারত, যুক্তরাজ্যসহ বেশ কিছু দেশে এরই মধ্যে এর প্রভাব লক্ষণীয়। বাংলাদেশেও দ্বিতীয় ঢেউ চলছে মর্মে মন্তব্য করেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহেদ মালেক। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, কোভিড-১৯ বিদায় হওয়ার এখনো অনেক দেরি। কেননা, প্রতিটি মহামারির দুই, এমনকি তিনটি পর্যন্ত ওয়েভ থাকতে পারে। উনিশ শতকের স্প্যানিশ ফ্লুতে দেখা গিয়েছিল তিনটি ওয়েভ, যার দ্বিতীয় ওয়েভ ছিল প্রথমটির চাইতে আরও ভয়ানক। কথা হচ্ছে, আগত এই দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবিলার জন্য বাংলাদেশ আসলে কতটা প্রস্তুত? সরকারের নো মাস্ক নো সার্ভিস নীতি কতটা মানছে দেশের জনগণ?

মাস্ক একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ ও প্রয়োজনীয় নিত্যদিনের সঙ্গী করোনা মহামারির এই সময়ে। বিশেষজ্ঞরা শুরু থেকেই মাস্ককে কোভিড-১৯ মোকাবিলায় অন্যতম সুরক্ষাকবচ বলে আসছেন। সম্প্রতি সারা বিশ্বে কোভিড-১৯–এর দ্বিতীয় ঢেউ একের পর এক রেকর্ড করে যাচ্ছে। এক দিনে সর্বোচ্চ আক্রান্ত ও মৃত্যুর রেকর্ডও হচ্ছে নিয়মিতই। বাংলাদেশে সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী মোট আক্রান্ত ৪ লাখ ৫৮ হাজার ৭১১; সুস্থ ৩ লাখ ৭৩ হাজার ৬৭৬; মৃত্যু ৬ হাজার ৫৪৪ জন। এমন অবস্থায়, প্রতিষেধকবিহীন এই ভাইরাসের মোকাবিলায় একমাত্র অবলম্বন হচ্ছে সচেতনতা ও মাস্কের ব্যবহার। এরই মধ্যে সরকারিভাবে মাস্ক ব্যবহার করা বাধ্যতামূলক করা হলেও স্বাস্থ্যসম্মত মাস্কের ব্যবহারে আমরা অতটা সচেতন হচ্ছি না।

বিজ্ঞাপন

পুলিশ ও প্রশাসনের লাঠিচার্জের ভয়ে কিংবা সরকারি বিধিমালার কারণে অনেকে জোর করে মাস্ক পরেন। তা–ও দেখা যায়, বেশির ভাগ সময় মাস্কটা পুলিশের ভয়ে পকেটে নিয়ে বের হচ্ছে, পুলিশ দেখলে মুখে দেয়, নয়তো পকেটেই শোভা পাচ্ছে। এদিন কর্ণফুলী কমপ্লেক্স-চট্টগ্রামের কাঁচাবাজারে সবজি কিনছিলাম। সবজিবিক্রেতার থুতনিতে মাস্ক ছিল, তাঁর সহকারীর ছিল পকেটে। হঠাৎ করে পাশে একজন বলে উঠলেন, পুলিশ আসছে মাস্ক পরুন। সবজিবিক্রেতা তখন নিজেরটাও মুখে পরিধান করলেন, সঙ্গে তাঁর সহকারীকেও নির্দেশ দিলেন। কিন্তু অবাক করা বিষয় হলো, ওই সহকারী দেখে বললেন, পুলিশ কোথায়, আরে ভাই উনি আমাদের দাদা। অর্থাৎ, পুলিশ তাঁদের পরিচিত। তাই আর মাস্ক পরারও কোনো প্রয়োজন নেই এবং পরেওনি। সত্যিকার চিত্র এমন। মাস্ক কি তাহলে আমরা পুলিশের লাঠি খাওয়া থেকে বাঁচতে পরছি?

অন্যদিকে দেখা যায়, কেউ কেউ মাস্ক পরেছেন ঠিকই, কিন্তু যখনই কারও সঙ্গে কথা বলতে যাবেন, তখনই মাস্কটা থুতনিতে নামিয়ে কথা বলেন। অর্থাৎ, সারা দিন মুখে মাস্কটা পরে থাকেন, কিন্তু যেই কারও সঙ্গে আলাপ করছেন, মাস্কটা মুখ থেকে নামিয়ে নিচ্ছেন। তাহলে মাস্ক ব্যবহারের উদ্দেশ্য কতটা সফল হলো? অথচ দরকারই ছিল কথা বলার সময় মাস্কটি আরও সতর্কতার সঙ্গে মুখে সুন্দরভাবে পরা। গণমানুষের মধ্যে এই বিষয়ে সচেতনতা না এলে করোনার মতো মহামারির দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবিলা নিশ্চিত কঠিন হবে।

এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলেছে, ব্যবহৃত মাস্ক যেন যত্রতত্র না ফেলা হয়। ব্যবহৃত মাস্ককে ডাস্টবিনে না ফেলে পুড়িয়ে ফেলার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু সোনার বাংলার রাস্তাঘাট, অলিতে-গলিতে মানুষের ব্যবহৃত সার্জিক্যাল মাস্কের ছড়াছড়ি না দেখতে পাওয়াটাই যেন দুর্লভ চিত্র। সেই ৮ মার্চ ২০১৯, বাংলাদেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হওয়ার পর থেকে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে সরকারিভাবে নেওয়া হয়েছে নানা পদক্ষেপ। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, সরকারের সব রকম পদক্ষেপ তখনই সফল হয়, যদি আমরা জনগণ সচেতন হই।

অথচ দুঃখজনক হলেও সত্যি যে গণপরিবহন, দোকানপাট থেকে শুরু করে হাটবাজার; কোথাও কেউ স্বাস্থ্যবিধি মানছেন না। ভ্রাম্যমাণ আদালত মাঠে নেমেছেন মাস্ক পরতে মানুষকে বাধ্য করার জন্য। তবু হুঁশ ফিরছে না আমাদের। আসুন আমরা পরিস্থিতির নাজুকতা মোকাবিলায় আরও সচেতন হই, মাস্ক ব্যবহারে নিজে আগ্রহী হই, অন্যকেও উদ্বুদ্ধ করি। কথা বলার সময় মুখের মাস্ক না নামিয়ে কথা বলি।

মো. নেজাম উদ্দিন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন