বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

রোকেয়ার জন্ম ১৮৮০ সালের ৯ ডিসেম্বর। রংপুর জেলার মিঠাপুকুর উপজেলার অন্তর্গত পায়রাবন্দ গ্রামে। তাঁর বাবা জহীরুদ্দিন মোহাম্মদ আবু আলী হায়দার সাবের একজন শিক্ষিত জমিদার ছিলেন। তাঁর মা ছিলেন রাহাতুন্নেসা সাবেরা চৌধুরানী। তাঁর বাবা আরবি, উর্দু, ফারসি, বাংলা, হিন্দি ও ইংরেজি ভাষায় পারদর্শী হলেও মেয়েদের শিক্ষার ব্যাপারে ছিলেন রক্ষণশীল। তবে তাঁর বড় দুই ভাই ছিলেন বিদ্যানুরাগী ও আধুনিকতা মনস্ক। রোকেয়ার বড় বোন করিমুন্নেসাও ছিলেন বিদ্যোৎসাহী ও সাহিত্যানুরাগী। রোকেয়ার শিক্ষালাভ, সাহিত্যচর্চা এবং সামগ্রিক মূল্যবোধ গঠনের শুরু হয় বড় ভাই–বোনদের হাত ধরে। তাঁদের সমর্থন ও সহায়তায় রোকেয়া বাংলা, ইংরেজি, উর্দু, ফারসি ও আরবি আয়ত্ত করেন।

১৮৯৮ সালে তৎকালীন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট, সমাজসচেতন, কুসংস্কারমুক্ত ও প্রগতিশীল দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন উর্দুভাষী সৈয়দ সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে রোকেয়ার বিয়ে হয়। উদার ও মুক্ত মনের অধিকারী স্বামীর সহায়তায় তাঁর সাহিত্যচর্চার শুরু। এর মধ্যেই মহীয়সী এই নারীর স্বামী মারা যান ১৯০৯ সালে কিন্তু তিনি থেমে যাননি। কোলের দুই কন্যাসন্তানকে নিয়ে এগিয়ে গেছেন। নারীদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় আজীবন সংগ্রাম করেছেন। বাড়ি বাড়ি গিয়ে মেয়েদের ও তাদের পরিবারের লোকদের শিক্ষার গুরুত্ব বুঝিয়েছেন, যেখানে সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুলের যাত্রা শুরু করেন মাত্র পাঁচজন ছাত্রী নিয়ে। কয়েক বছরের মধ্যে সেখানে ছাত্রীসংখ্যা ১০০ ছাড়িয়ে যায়। তিনি ১৯১৬ সালে মুসলিম বাঙালি নারীদের সংগঠন আঞ্জুমানে খাওয়াতীনে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করেন। এই প্রতিষ্ঠান দুস্থ নারীদের লেখাপড়া ও হাতের কাজ শেখানো হতো।

নারীদের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি আজীবন কাজ করে গেছেন। তাঁর মতে, নারী সহিংসতা প্রতিরোধে নারীদের প্রতিষ্ঠিত হতে হবে। সরকারি কর্মকর্তা, ম্যাজিস্ট্রেট, জজ, ব্যারিস্টারসহ সব ধরনের পদে যোগ্যতা বলে নারীদের আসীন হওয়ার অনুপ্রেরণা দেন তিনি। তাঁর মতে, স্বামীর গৃহে যে শ্রম দিয়ে নারীরা অবহেলিত হয়, সেই শ্রম বাইরে দিলে তারা স্বাধীনভাবে জীবিকা অর্জন করে মুক্তির স্বাদ পেতে পারে।

১৯০৫ সালে তাঁর প্রথম ইংরেজি রচনা ‘সুলতানাস ড্রিম’ মাদ্রাজ থেকে প্রকাশিত একটি পত্রিকায় ছাপানোর পর সাহিত্যিক হিসেবে তিনি পরিচিত হয়ে ওঠেন। ‘সুলতানার স্বপ্ন’কে বিশ্বের নারীবাদী সাহিত্যে একটি মাইলফলক ধরা হয়। প্রবন্ধ, গল্প, উপন্যাসের মধ্য দিয়ে তিনি নারীশিক্ষার প্রয়োজনীয়তা আর লিঙ্গসমতার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেছেন। হাস্যরস আর ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের সাহায্যে পিতৃতান্ত্রিক সমাজে নারীর উপেক্ষা আর অবমাননার স্থান তুলে ধরেছেন। তিনি নারীর অলংকারকে দাসত্বের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তাঁর মতে, জেলখানায় দেওয়া হয় লোহার শিকল আর নারীদের দেওয়া হয় সোনার শিকল (চুড়ি, হার, পায়ের মল ইত্যাদি), যা নারীদের জন্য অবমাননাকর। তাঁর রচিত ‘মতিচূর’, ‘পদ্মরাগ’, ‘অবরোধবাসিনী’ ইত্যাদি সৃজনশীল রচনাগুলো নারীবাদের লিখিত দলিলস্বরূপ। গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হওয়ার আগে লেখাগুলো নবনূর, সওগাত, মোহাম্মদী ইত্যাদি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।

নারী আন্দোলনের পথিকৃৎ মহীয়সী এই নারীকে সম্মান জানিয়ে রংপুর জেলায় বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বাংলাদেশে প্রথম কোনো নারীর নামে প্রতিষ্ঠিত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এটি। এ ছাড়া দেশের অনেকগুলো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে ছাত্রীদের আবাসিক হলের নামকরণ করা হয়েছে রোকেয়া হল নামে। নারী উন্নয়নে অবদান রাখার জন্য প্রতিবছর ৯ ডিসেম্বর বিশিষ্ট নারীদের ‘বেগম রোকেয়া পদক’ দেওয়া হয়।

১৯৩২ সালের ৯ ডিসেম্বর কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন রোকেয়া, সেখানেই তাঁর কবর। বাঙালি আধুনিক যুগের ইতিহাসে যে নারীকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়, তিনি হচ্ছেন রোকেয়া। নারীর ক্ষমতায়নের যে শুভসূচনা তিনি করে গেছেন, তা অনুসরণ করেই আজ বাংলার নারীরা চিকিৎসক, প্রকৌশলী, পাইলট, শিক্ষক, পুলিশ, সেনা-নৌ-বিমানবাহিনীর সদস্য। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী, স্পিকারসহ রাষ্ট্রীয় ও সরকারের শীর্ষ ও গুরুত্বপূর্ণ পদে আছেন নারীরা। রোকেয়ার জন্ম ও মৃত্যুদিনে তাঁকে সশ্রদ্ধ স্মরণ করছি।

নুসরাত জাহান
শিক্ষার্থী, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা

চিঠি থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন