বিজ্ঞাপন

কিশোর বয়সেই তাঁকে বিপ্লবের স্বপ্নে পেয়েছিল। আমৃত্যু সেই স্বপ্ন লালন করেছেন। কিন্তু তিনি তো বিপ্লব পাননি। না পাওয়ার কারণ আমরা সবাই জানি। সমাজ ও রাষ্ট্রে অনেক কিছুই ঘটেছে; কোনো কোনো পরিবর্তন বেশ বড় রকমের, কিন্তু আসল বিপ্লব যে সমাজ বিপ্লব, সেটা ঘটেনি। হায়দার ভাই সেই বিপ্লব সম্ভব করবার জন্য নিজের জীবন নিয়োগ করেছিলেন। সরেননি, নড়েননি।

ব্যক্তি হিসেবেও হায়দার ভাই ছিলেন অসাধারণ। আমার সুযোগ হয়েছিল তাঁর সঙ্গে একবার কলকাতায় যাওয়ার। সময়টা ছিল নজরুল জন্মশতবর্ষের। সোশ্যালিস্ট ইউনিটি সেন্টার অব ইন্ডিয়া পশ্চিমবঙ্গ শাখা বিপ্লবী কবির জন্মশতবর্ষ উদ্‌যাপন করছিল। সে উপলক্ষেই যাওয়া। সেখানে অনেকের সঙ্গে দেখা হয়েছে, আলাপ হয়েছে; অংশগ্রহণ ঘটেছে। সবটাই ছিল আনন্দের। কিন্তু সবচেয়ে বেশি আনন্দের ছিল হায়দার ভাইয়ের সঙ্গ। কলকাতা ছিল তাঁর নখদর্পণে। ছোটবেলায় আমিও কিছুকাল ওই শহরে কাটিয়েছি। আমরা দুজন অনেক জায়গায় গিয়েছি। দেখেছি, সাংস্কৃতিকভাবে তিনি কতটা উন্নতমানের ছিলেন।

বস্তুত সংস্কৃতিতে ছিল তাঁর বিশেষ অবস্থান। তাঁর নিজের সংস্কৃতিতে ছিল পরিচ্ছন্ন রুচি ও বৈজ্ঞানিকতা। সংস্কৃতি উন্নত না করতে পারলে যে সামাজিক বিপ্লব ঘটবে না, এটা তাঁর দল জানত। হায়দার ভাইও জানতেন বিশেষভাবে। আর ছিল নৈতিকতার বোধ। রাজনৈতিক নীতির প্রশ্নে যেমন অবিচল ছিলেন, তেমনি ব্যক্তিগত নৈতিকতার ব্যাপারেও ছিলেন অত্যন্ত শক্ত। শক্ত হতে তিনি অন্যদেরও বলতেন। নৈতিক মেরুদণ্ড যে দৈহিক মেরুদণ্ডের চেয়ে অধিক কার্যকর, এটা তাঁকে দেখে নতুন করে বুঝতাম।

মুবিনুল হায়দার চৌধুরীর ভেতর আত্মপ্রকাশের কোনো আগ্রহ ছিল না। নিজেকে তিনি প্রচ্ছন্ন রাখতে চাইতেন। সেটাও ছিল তাঁর সংস্কৃতি ও নৈতিকতার অংশ। ভাবতেন, তিনি জীবিত ও জীবন্ত থাকবেন তাঁর কাজের মধ্যে। কাজই হবে তাঁর পরিচয়। কাজে তাঁর বিরাম ছিল না। কিন্তু আবার অস্থিরতাও দেখিনি। রাজনীতিকদের মধ্যে তাঁর মতো অঙ্গীকারবদ্ধ অথচ মৃদুভাষী মানুষ আমি খুব কম দেখেছি। যুক্তি ছাড়া কথা বলতেন না; অথচ বিশ্বাসের ক্ষেত্রে ছিলেন অনড়।

ভেতরে নিশ্চয়ই অনেক রাগ ছিল। রাগ অনুরাগেরই ভিন্ন প্রকাশ। অনুরাগটা ছিল সুন্দর এক সমাজের প্রতি। আর সে জন্যই রাগটা ছিল বিদ্যমান সমাজব্যবস্থার অমানবিকতার ওপর। অনুরাগটা ছিল অত্যন্ত প্রবল, তাই রাগটাও ছিল গভীর ও গাঢ়। ঘৃণাহীন ভালোবাসা বলে তো কিছু নেই; হায়দার ভাই ভালোবাসতেন তাঁর স্বপ্নকে, বরং সে কারণেই ঘৃণা করতেন বিদ্যমান ব্যবস্থাকে। তাঁর সেই প্রেম ও ক্রোধ তাঁকে আজীবন ব্যস্ত রেখেছে। ব্যস্ত, কিন্তু অস্থির নন। তিনি জানতেন, বিপ্লব ছাড়া মুক্তি নেই।

পুঁজিবাদ এখন তার নিজেরই নিকৃষ্টতম ও নিষ্ঠুরতম পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে। পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম চলছে। চলবে। সেই সংগ্রামে হায়দার ভাই ছিলেন এবং থাকবেন। তাঁর মতো মানুষদের প্রয়োজন সব সময়ই ছিল, এখন অনেক বেশি। সমাজ বিপ্লবের পথে আমরা যতই এগোব, হায়দার ভাই ততই উজ্জ্বল হয়ে উঠবেন। তাঁর মতো মানুষদের প্রস্থান আছে, মৃত্যু নেই।

অস্বাভাবিক এক সময়ে অস্বাভাবিক সব ঘটনা ঘটছে। আমাদের অতি আপনজন মুবিনুল হায়দার চৌধুরী অসুস্থ ছিলেন, তাই বলে এত দ্রুত চলে যাবেন, এটা আমরা কেউ ভাবিনি। করোনায় আক্রান্ত হয়ে তাঁর মৃত্যু ঘটেনি। ঘটেছে নানান জটিল রোগাক্রান্তের কারণে। আর ওদিকে দেশ ও বিশ্বব্যাপী করোনা প্রাণহরণ করছে। আমাদের প্রত্যেকেরই আপনজনদের কেউ না কেউ চলে গেছেন। আমার আপন ভাইদের একজন, যার সঙ্গে আমার সম্পর্ক ছিল শুধু ভাইয়ের মতো নয়, বন্ধুর মতোও। সেও চলে গেল বছরখানেক আগে।

মুবিনুল হায়দার চৌধুরীর সঙ্গে আমার সম্পর্ক সামাজিক ছিল না, ছিল মতাদর্শিক। কেবল আমার নয়, এ দেশের বাম গণতান্ত্রিক আন্দোলনের বহু মানুষের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সম্পর্ক ছিল। সর্বোপরি মতাদর্শিক রাজনৈতিক চেতনায় ঋদ্ধ অবিচল অনড় কমরেড হায়দার তাঁর নীতিনিষ্ঠার জন্য ভিন্ন মতাবলম্বীদের কাছেও ছিলেন শ্রদ্ধার মানুষ।

অজাতশত্রু মানুষ সমাজে যে নেই এমন নয়; কিন্তু একই সঙ্গে রাজনৈতিক মতাদর্শ ও আন্দোলনের ব্যাপারে অনমনীয় এবং দল ও মতের সীমা অতিক্রম করে সবার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ হওয়ার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন এক দৃষ্টান্ত। কার্ল মার্ক্সের সমাধির পাশে দাঁড়িয়ে ফ্রেডরিক অ্যাঙ্গেলস বলেছিলেন, মতাদর্শগতভাবে মার্ক্সের বিরুদ্ধে অনেকেই ছিলেন, কিন্তু ব্যক্তিগত শত্রু একজনও ছিলেন কি না সন্দেহ; একই কথা খাঁটি মার্ক্সবাদী মুবিনুল হায়দার চৌধুরীর সম্পর্কেও সত্য।

লড়াকু ছিলেন। লড়ছিলেন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে, ব্যক্তির বিরুদ্ধে নয়। দৃষ্টিভঙ্গিটা ছিল বৈজ্ঞানিক, আবার একই সঙ্গে আবেগে সমৃদ্ধ।

মুখকে মুখোশে ঢেকে ফেলার সময় চলছে এখন। বলা হচ্ছে, এটা সাময়িক। করোনা নিয়ন্ত্রণে আসবে; তা আসবে ঠিকই, তবে আরও ভয়ংকর বিপদ আসার আশঙ্কা যে ঘুচে যাবে, তা নয়, সেটি থাকবে এবং সেই বিপদের মোকাবিলা করতে হলে শুধু বিপদ নয়, যে বিশ্বব্যবস্থা থেকে বিপদের পর বিপদের উদ্ভব, তাকে পাল্টে ফেলা চাই। চাই বিচ্ছিন্নতা হটিয়ে সংলগ্ন হওয়া, ঐক্য গড়ে তোলা। বৈপ্লবিক আন্দোলনকে বেগবান ও সর্বত্র বিস্তৃত করা।

ওই আন্দোলন যত এগোবে, কমরেড হায়দার ততই জীবন্ত হয়ে উঠবেন। তাঁর মুখের অনাবিল হাসি সবার হাসিতে পরিণত হবে এবং তাঁকে স্মরণ করা আনুষ্ঠানিক ব্যাপার হবে না, ব্যাপার হবে প্রাণের প্রতিধ্বনির। ওই আগামীকালের জন্যই তাঁরা লড়েছেন। এই লড়াই জয়ী হোক।

তাঁর অমর স্মৃতির প্রতি আমার গভীর শ্রদ্ধা রইল এবং কৃতজ্ঞতা রইল তাঁর কাজের জন্য। অনিবার্য সামাজিক বিপ্লব ত্বরান্বিত হোক।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক

স্মরণ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন