বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

মনে পড়ে, ১৯৮৩ সালের মাঝামাঝি সামরিক শাসনে বিপর্যস্ত বাংলাদেশ। ঝিনাইদহের কমিউনিস্ট পার্টির শৈলকুপা শাখা কমিটির বর্ধিত সভা চলছে। পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ ফরহাদ, দীর্ঘ বক্তৃতায় যুক্তিজাল বিস্তার করে জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লবের কর্মসূচি ব্যাখ্যা করছেন। যুবক-তরুণদের চোখেমুখে টগবগ করে ফুটছে বিপ্লবের স্বপ্ন। বক্তৃতায় আবেগ ছিল না, ছিল প্রখর যুক্তি ও বিশ্লেষণ; যা শ্রোতাদের সম্মোহিত করেছে। ফরহাদ তাঁদের স্বপ্ন বাস্তবায়নে মাত্র পাঁচটি বছর সময় চাইলেন।

কমরেড ফরহাদ ছিলেন পার্টির নিজস্ব প্রভাব, গণভিত্তি ও শক্তিবৃদ্ধির প্রবক্তা। কর্তব্যের জরুরি তাগিদ তাঁর মনে সদাই ক্রিয়াশীল, তাই সমাজের সব স্তরে অতিদ্রুত কাজ করছিলেন। নারী-ছাত্র-কৃষক-শ্রমিক-খেতমজুর-পেশাজীবীসহ পার্টির ছায়াতলে সমবেত হওয়া শত-হাজারো মানুষকে রাজনৈতিক ও আদর্শগতভাবে প্রশিক্ষিত করতে ‘গণ গ্রুপ’ গঠন ও ‘গণ ক্লাস’ চালু করলেন। জীবদ্দশায়ই দেশের প্রায় সব জেলা ও উপজেলায় পার্টি সংগঠন গড়ে তুললেন। ১৯৮৭ সালের চতুর্থ কংগ্রেসে সিপিবিকে ইউনিয়ন পর্যায়ে ছড়িয়ে দেওয়ার তাগিদ দিলেন। তরুণ প্রজন্মের চোখে বিপ্লবের পথরেখা দৃশ্যমান হলো, সমসাময়িক ও সমমনা দল এবং নেতাদের মধ্যে আস্থা ও সমঝোতার ভিত্তি গড়লেন। এভাবেই জননেতা ফরহাদ হলেন বাম রাজনীতির প্রথম-দ্বিতীয়-তৃতীয় প্রজন্মের নেতা-কর্মীদের সেতুবন্ধ। তাঁর চিন্তার স্বচ্ছতা, অভিজ্ঞতা, রণকৌশল, কর্মদক্ষতা ও নেতৃত্বগুণে অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক, সাম্যবাদী ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী রাজনীতির কেন্দ্রে পরিণত হলো সিপিবি।

উনসত্তরের আইয়ুববিরোধী গণ-অভ্যুত্থানের নেপথ্য নায়ক কমরেড ফরহাদ, আশির দশকে ১৫-দলীয় জোট গঠন ও ১৯৮৬ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই পরস্পরবিরোধী নেত্রী হাসিনা-খালেদার মধ্যে ১৫০-১৫০ আসনে সমঝোতা ও ঐক্যের অভিনব ফর্মুলা দিলেন। প্রমাদ গুনল সামরিক সরকার, আইন জারি হলো, কেউ পাঁচের অধিক আসনে প্রার্থী হতে পারবেন না। সে নির্বাচনে ছয়টি আসন জিতে দেশের সংসদীয় আন্দোলনের ইতিহাসে প্রথম কমিউনিস্টরা প্রকাশ্যে জাতীয় সংসদে প্রবেশ করল। সংসদের ভেতরে-বাইরে ভূমিকা রেখে প্রগতিশীল আন্দোলন বেগবান করার কার্যকর কৌশল নিলেন ফরহাদ। আশি ও নব্বইয়ের দশকের ক্রান্তিলগ্নে সামরিক স্বৈরাচার, এরশাদবিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে তিন জোটের যুগপৎ কর্মসূচির রূপরেখা উদ্ভাবন করে গণ-আন্দোলনকে গণ-অভ্যুত্থানে রূপান্তরিত করলেন। এভাবেই তিনি বাংলাদেশের জটিল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সংসদীয় রাজনীতি পুনরুদ্ধার এবং রাজনীতিকে মেহনতি মানুষের অধিকার আদায়ের ক্ষেত্রে পরিণত করেন।

ছাত্র আন্দোলনের কিশোর নেতা মোহম্মদ ফরহাদ জেলে গিয়েছিলেন, কলেজে ভর্তি হওয়ার আগেই জেলা ছাত্র ইউনিয়নের নির্বাচিত সম্পাদক আর দিনাজপুর সুরেন্দ্র কলেজে বিপুল ভোটের ব্যবধানে নির্বাচিত ছাত্র সংসদের সহসভাপতি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের এই মেধাবী ছাত্র ছিলেন নিরহংকার, মিষ্টভাষী ও নম্র স্বভাবের। ঐতিহাসিক সূত্রে ছাত্র আন্দোলনের গর্ভ থেকে উঠে এসে তিনি হলেন কমিউনিস্ট পার্টির নেতা। তেভাগা আন্দোলন ও ষাটের দশকে গণ-অভ্যুত্থানে শ্রমিকশ্রেণির সংস্পর্শে এসেছিলেন, ৪৯ বছরের সংক্ষিপ্ত জীবনে দীর্ঘ সময় কেটেছে আত্মগোপনে ও কারান্তরালে।

ষাটের দশকের সূচনালগ্নে রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষ পালন ও বাঙালি সংস্কৃতির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র প্রতিরোধ আন্দোলনে তিনি ছিলেন প্রেরণা ও রাজনৈতিক শক্তির জোগানদাতা। ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংস্কৃতি সংসদ ও ছাত্র ইউনিয়নের চালিকা শক্তি। তাঁর পৃষ্ঠপোষকতায় ঢাকায় বিখ্যাত গণসাহিত্য পত্রিকা আত্মপ্রকাশ করে এবং বুদ্ধিজীবী-শিল্পী-সাহিত্যিক মহলে সমাদৃত হয়। দেশ-বিদেশের সাহিত্য ও সংস্কৃতিচর্চার হালনাগাদ খবর রাখতেন তিনি। সংস্পর্শে আসা কর্মীদের ব্যক্তিগত সমস্যা, সাংস্কৃতিক রুচি, সাংগঠনিক কাজ—সব বিষয়ে পরামর্শ দিয়ে সুন্দর জীবন গঠনে সহায়তা করতেন। নারীকে শোষণ-নিপীড়ন-লাঞ্ছনার হাত থেকে বাঁচাতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিলেন তিনি।

কমরেড ফরহাদ তরুণদের মনে বিপ্লবের যে রোমান্টিক স্বপ্ন এঁকেছিলেন, তা–ও কি বিলীন হয়ে যাবে ইতিহাসের পাতা থেকে! হয়তো নয়। কারণ, সমাজে সাম্য প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা মানুষের চিরন্তন। সুন্দর সমাজ গঠনের আকাঙ্ক্ষা মরে না কখনো।

তাঁর নেতৃত্বে কমিউনিস্ট পার্টির নেতা-কর্মীরা ১৯৭১ সালের ১৫ এপ্রিল আগরতলায় পৌঁছেন। গোপন কমিউনিস্ট পার্টি পরিচালনায় অভিজ্ঞ কমরেড ফরহাদ সেখানে মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ ক্যাম্প স্থাপন করে ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি-ছাত্র ইউনিয়নের বিশাল গেরিলা বাহিনী গড়ে তোলেন। সশস্ত্র প্রতিরোধ সম্পর্কে গভীর অধ্যয়ন, বাস্তব উপলব্ধি, যুদ্ধক্ষেত্রের খুঁটিনাটি খতিয়ে দেখা এবং নিষ্ঠুর প্রতিকূলতায় অবিচল থাকার বিরল সক্ষমতা ছিল তাঁর। মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়েও তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন তিনি।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিশেষ আস্থাভাজন ছিলেন মোহাম্মদ ফরহাদ। ১৯৭৩ সালে কমিউনিস্ট পার্টির দ্বিতীয় কংগ্রেসে বঙ্গবন্ধু ছিলেন প্রধান অতিথি। এই কংগ্রেসেই ফরহাদ পার্টির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।

ঐতিহাসিক সত্য হলো, ১৯১৭ সালে বলশেভিক বিপ্লবের মাধ্যমে যে সোভিয়েত রাষ্ট্রের জন্ম, ৭৪ বছর পর ১৯৯১ সালের ২৫ ডিসেম্বর তা ভেঙে গেল। সমাজ বিশ্লেষকেরা মনে করেন, ইতিহাসের ধারাবাহিকতা ও রুশ সমাজের সুপ্রাচীন ঐতিহ্য উপেক্ষা করেছিল সে দেশের পার্টি। সোভিয়েত সমাজে অমীমাংসিত জাতিগত সমস্যা, জাতিগত নিপীড়ন, পার্টির অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি, সুবিধাভোগী আমলাতন্ত্র, ব্যক্তিস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ আর একনায়কতান্ত্রিক স্বৈরশাসন পার্টির ভেতরেই ক্রিয়াশীল ছিল। পার্টিতে সুবিধাবাদীদের অবস্থান, সম্পদের অপচয়, অস্ত্র ও মহাকাশ প্রতিযোগিতা, শীতল যুদ্ধ এবং সবশেষে আফগান যুদ্ধ—এসবই সোভিয়েত রাশিয়া ভেঙে যাওয়ার অন্যতম কারণ।

অতঃপর বাংলাদেশেও কমিউনিস্ট পার্টির ভেতরে সুবিধাপ্রত্যাশী নেতারা দল ভাঙা, এমনকি দল বিলোপের খেলায় নামলেন, পুরানা পল্টনের লাল দুর্গ ভেঙে দুই টুকরো করলেন। ফলে পার্টির হাজারো তৃণমূল কর্মী হলেন দিশেহারা। তিলে তিলে গড়ে তোলা পার্টি–শৃঙ্খলার অহংকার ধুলায় লুটিয়ে গেল। নব্বইয়ের দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর কমরেড ফরহাদবিহীন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টিও যেন মুখ থুবড়ে পড়ল।

এখন প্রশ্ন হলো, কমরেড ফরহাদ তরুণদের মনে বিপ্লবের যে রোমান্টিক স্বপ্ন এঁকেছিলেন, তা–ও কি বিলীন হয়ে যাবে ইতিহাসের পাতা থেকে! হয়তো নয়। কারণ, সমাজে সাম্য প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা মানুষের চিরন্তন। সুন্দর সমাজ গঠনের আকাঙ্ক্ষা মরে না কখনো। ইতিহাসের ধারাবাহিকতা থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর সমাজ বিকাশের ধারায় আমাদের গ্রামনির্ভর সমাজের সম্পর্কসূত্র বিশ্লেষণ, পর্যবেক্ষণ ও গভীর অধ্যয়নের মাধ্যমে নতুন সমাজের উপযোগী কর্মসূচি নির্ধারণ, পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে আধুনিক বাংলাদেশ গঠনের সংগ্রামকে এগিয়ে নেওয়াই হবে কমরেড ফরহাদের স্বপ্নের সফল বাস্তবায়ন।

জাহাঙ্গীর মোহাম্মদ লেখক ও চলচ্চিত্রকার। [email protected]

স্মরণ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন