default-image

১৯৬৭ সালে প্রথম গল্পের বই নানকুর বোধির শেষ গল্পটা ‘বোধি’। অনুজ তৌফিক পানিতে ডুবে মারা গিয়েছিল। যেন–বা সে স্মৃতির জখম জন্ম দিয়েছে গল্পটার। স্বপ্নে কালো পোশাকের কেউ এসে গল্পকথক ঢাকাবাসী অগ্রজকে বলে, ‘আমি তোমায় কিছু জ্ঞান দান করব।’ তারপর বাবার জরুরি টেলিগ্রামে পাবনার বাড়িতে ফেরার পথে সে বাড়ির বয়স্কদের মৃত্যু থেকে শুরু করে নিজের বিয়ের সম্বন্ধের কথা পর্যন্ত ভাবতে থাকে। কিন্তু হায়, যা ছিল ভাবনারও বাইরে, বাড়িতে এসে দেখে তেমন কিছু একটা হয়ে গেছে। পানিতে ডুবে মারা গেছে তার আদরের ছোট ভাই। শোকস্তব্ধ মুহূর্তে গল্পকথকের মনে পড়ল আগের রাতের স্বপ্নে কালো পোশাকে আসা কারও কথাটা, ‘আমি তোমায় কিছু জ্ঞান দান করব।’ স্বপ্নের কালো পোশাক আর বাস্তবে অনুজের গায়ে জড়ানো মৃতের সাদা পোশাক যেন রঙের ধারণা বদলে দিল তার।

অকালে হারিয়ে যাওয়া অনুজের স্মৃতিকে যেমন এভাবে গল্পের পটে ভাস্বর করে রাখলেন রশীদ হায়দার, তেমনি ব্যক্তি ও সমষ্টিজীবনের মূল্যবান স্মৃতিকে সব সময়ই তিনি তাঁর লেখা ও সক্রিয়তার কেন্দ্রভাগে রেখেছেন।

বিজ্ঞাপন

সিনে পত্রিকা চিত্রালী থেকে কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকে কাজ করার অভিজ্ঞতা, বাংলা একাডেমিতে নানা পদে প্রায় তিন দশকের কর্মজীবন, কিছুকাল উত্তরাধিকার সাহিত্যপত্রের নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে অনন্যতার স্বাক্ষর, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র আর নজরুল ইনস্টিটিউটের গুরুদায়িত্ব পালন, নাটক বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক পাঠ ও অভিনয়ের পাশাপাশি নাট্যরচনা-নির্দেশনা-অনুবাদ (নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের সাড়া জাগানো তৈল সংকট তো তাঁরই সৃষ্টি, শেক্‌সপিয়ার দ্য সেকেন্ড কিংবা কাফকার উপন্যাসের আদ্রে জিদ, জ্য লুই জারকৃত নাট্যরূপের অনুবাদ কাঠগড়া), গল্প-উপন্যাস-শিশুসাহিত্য-প্রবন্ধ-আত্মকথা-সম্পাদনাকীর্তি ছাপিয়ে গেছে যেন স্মৃতি নিয়ে তাঁর সংবেদ ও সংগ্রাম।

আত্মজীবনী কিংবা স্মৃতিকথা লেখেননি রশীদ হায়দার, তবে এবেলা ওবেলা (সন্ধানী প্রকাশনী, ১৯৯৪) বইয়ে মেলে ধরেছেন নিজের রূপছবিময় শৈশব-কৈশোর৷ স্মৃতির দখিন দুয়ার দিয়ে পাঠককে নিয়ে গেছেন তাঁর ছোটমার সিনেমা দেখার গল্পে। উঠোনে খড়ি শুকাতে দিয়ে, বাড়ির কর্তাগোছের কাউকে না জানিয়ে, ছেলেপুলে নিয়ে মা গিয়েছিলেন পাবনার বিখ্যাত বাণী সিনেমা হলে। সিনেমার মাঝপথে বৃষ্টি এলে মা সেই শব্দ পেয়ে আতঙ্কে আর্তচিৎকার করে উঠলেন ‘ওরে, আমার খড়ি ভিজে গেল!’ হলভর্তি দর্শকের মধ্যে হাসির ফোয়ারা ছুটল।

একাত্তরের নগর ও গ্রামবাংলার স্মৃতিচিত্র তো উপন্যাসের অবয়ব পেয়েছিল তাঁরই খাঁচায় এবং অন্ধ কথামালার পরিসরে। যথাক্রমে ১৯৮৪ ও ১৯৮৫ সালে বাংলা একাডেমির তৎকালীন মহাপরিচালক মনজুরে মওলার উদ্যোগে এবং রশীদ হায়দারের সুদক্ষ সম্পাদনায় প্রকাশ পেল একাত্তরের শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মৃতিকে জনমানসে চিরজাগরূক রাখার দুটো সংকলন শহীদ বুদ্ধিজীবী কোষগ্রন্থশহীদ বুদ্ধিজীবী স্মারকগ্রন্থ। তারই ধারাবাহিকতায় পরবর্তী মহাপরিচালক আবু হেনা মোস্তফা কামালের কার্যকালে রশীদ হায়দারের সম্পাদনায় প্রকাশিত হতে শুরু করল একাত্তরের স্বজনহারাদের রক্তের অক্ষরে লেখা স্মৃতিসাহিত্যের যেন–বা অশ্রু ও অগ্নিময় একেকটি খণ্ড স্মৃতি: ১৯৭১

বিজ্ঞাপন

রশীদ হায়দারের ভাষায়, ‘হেনা সাহেব ৬ নভেম্বর ১৯৮৮ আমাকে ডেকে বললেন, “এবারে ১৪ ডিসেম্বর শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে নতুন কিছু করা যায় না?”

“আপনি কিছু চিন্তা করেছেন?”

“আমি চিন্তা করছি, শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে বুদ্ধিজীবীদের নিকটাত্মীয়দের লেখা নিয়ে একটা সংকলন করা যেতে পারে।”

“কতগুলো লেখা নেওয়া যায়?”

“২০–২৫টি লেখা হলেই চলবে।”

আমি রাজি হলাম। কিন্তু তখনো চিন্তা করিনি কাকে কাকে লেখার কথা বলব। হাতে সময় নেই। ৮ নভেম্বর প্রথমেই গেলাম ড. জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতার স্ত্রী বাসন্তী গুহঠাকুরতার বাসায়। শুরু হলো স্মৃতি: ১৯৭১-এর কাজ। অবিশ্বাস্য সত্য হলো, প্রথম খণ্ডেই আমরা লেখা পেলাম ৩৯টি। ১৪ ডিসেম্বর যে বই বেরোনোর কথা, সেটি তৈরি হয়ে গেল ১০ ডিসেম্বরের মধ্যেই। আবু হেনা মোস্তফা কামাল ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, এই সংকলন মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের বিশেষ সহায়ক হবে। স্মৃতি: ১৯৭১-এ (১৩ খণ্ড) সম্পাদক হিসেবে আমার নাম থাকলেও আমি নিজেকে বলি “সংগ্রাহক”।’

(রশীদ হায়দার, আমার বাংলা একাডেমি; বাংলা একাডেমি বার্তা, জুলাই-সেপ্টেম্বর ২০১৯)

১৯৮৮ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত এক যুগে প্রকাশিত এই সংকলনের ১৩টি খণ্ড আর সম্প্রতি বাংলা একাডেমি কর্তৃক এর নববিন্যস্ত চারটি বৃহৎ খণ্ডের পাতা ওলটালে রশীদ হায়দারের কথাকে বিনয়বচনই বলতে হবে। নেহাত ‘সংগ্রাহক’ হলে কারও পক্ষে তিন শতাধিক ব্যক্তিকে দিয়ে স্বজনহারানোর দুঃসহ স্মৃতিকথা লেখানো সম্ভব নয়, যাঁদের অনেকেরই লেখার অভ্যাস ছিল না।

বিজ্ঞাপন

এখানেই শেষ নয় রশীদ হায়দারের স্মৃতির সন্ধান ও তা সংরক্ষণের সংগ্রাম। ১৯৮৯ সালের বিজয় দিবসে জাতীয় সাহিত্য প্রকাশনী প্রকাশ করে তাঁর আর এক অমর সম্পাদনাকর্ম ১৯৭১: ভয়াবহ অভিজ্ঞতা। এই সংকলনে একাত্তরের মার্চ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত পাকিস্তানি হানাদার ও তাদের দোসরদের মাসওয়ারি গণহত্যা ও নির্যাতনের ভয়াল চিত্র উঠে এসেছে ৫০ প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণে। কালীরঞ্জন শীলের ‘জগন্নাথ হলেই ছিলাম’, নাজিম মাহমুদের ‘যখন ক্রীতদাস ছিলাম’, মন্টু খানের ‘অত্যাচারের পরীক্ষা-নিরীক্ষা’, হুমায়ূন আহমেদের ‘কিছু মনে পড়ে না’, কানন সরকারের ‘মর্মান্তিক ধর্মান্তর’ কিংবা নীলিমা ইব্রাহিমের ‘আমি ক্ষমাপ্রার্থী’র মতো অনেক লেখা এ বইকে সমৃদ্ধ করেছে।

রশীদ হায়দারের স্মৃতির সম্ভারে ফিরে ফিরে এসেছে রক্তঝরা একাত্তর। তাই তো এই সব বই—অসহযোগ আন্দোলন: একাত্তর, মুক্তিযুদ্ধের গল্প, যুদ্ধ ও জীবন, শোভনের স্বাধীনতা। বিস্মৃতির অতল থেকে বাংলার ভাষাবীর, মুক্তিযুদ্ধের শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে উদ্ধার করে আনতে আনিসুজ্জামান ও অন্যান্যের সঙ্গে তিনিও যুক্ত থেকেছেন নিবিড় নৈকট্যে।

তাঁর স্মৃতির সুধায় ভাষা পেয়েছে আরও বহু কিছু। শিশুসাহিত্যের ক্যানভাসে জসীমউদ্‌দীন ও তাঁর হারানো নক্সী কাঁথাকে সজীব করে রেখেছেন জসীমের নক্সী কাঁথা নামে বই লিখে। নিজের শিক্ষাসময়কে সতীর্থদের বয়ানে স্মরণীয় করে রাখলেন দুই খণ্ডে স্মৃতিময় ১৯৬৫: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সম্পাদনা করে। অবিস্মরণীয় হাসান হাফিজুর রহমানের জীবনী লিখেছেন, তেমনি অকালগত অভিনেত্রী ডলি আনোয়ারকে নিয়ে অদ্বিতীয়া ডলি সংকলন সম্পাদনা করে রশীদ হায়দার সৃজনমুখর আট দশকের জীবনে যেন বারবার বলতে চেয়েছেন: লেখকের প্রাণ বিস্মৃতির বিরুদ্ধে স্মৃতির সংগ্রাম।


পিয়াস মজিদ: কবি ও প্রাবন্ধিক

মন্তব্য পড়ুন 0