প্রসঙ্গক্রমে তিনি বিসিএস সাধারণ ক্যাডারে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, কৃষিবিদ গেলেও কোনো ক্ষতি নেই মর্মে তাঁর নিজস্ব অভিমত ব্যক্ত করেছেন। উদাহরণ হিসেবে তিনি ভারতীয় সিভিল সার্ভিসের প্রসঙ্গ টেনেছেন। ভারতীয় সিভিল সার্ভিসেও নাকি এ রকম ঘটনা ঘটছে। কিন্তু ভারতের সাথে আমাদের পার্থক্যের জায়গাটি হলো—অনুকূল পরিবেশের কারণে প্রবাসী ভারতীয় চিকিৎসক, প্রকৌশলী ও কৃষিবিদেরা স্বদেশে ফিরে আসেন এবং দেশের মানুষের কাজে লাগেন। কিন্তু বিশেষ একটি ক্যাডারের খামখেয়ালির কারণে আমাদের দেশে ঠিক উল্টোটা ঘটছে।

আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে পাস করা চিকিৎসক, প্রকৌশলী ও কৃষিবিদেরা দেশ থেকে শুধু বেরিয়েই যাচ্ছেন; কেউ আর ফিরে আসছেন না! ইদানীং কেউ কেউ হয়তো বিবেকবোধ বিসর্জন দিয়ে বিসিএস প্রশাসন, পুলিশ ক্যাডারে ঢুকে নিজেদের যোগ্যতার প্রমাণ দিচ্ছেন। কিন্তু এটা মোটেই স্বাভাবিক কোনো ঘটনা নয়। প্রশ্ন হলো—দেশ কী এসব ক্ষেত্রে বঞ্চিত হচ্ছে না; ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না দেশের জনগণ? আমাদের শিক্ষা-দর্শনের মৌল উদ্দেশ্যই কী ব্যর্থতাই পর্যবসিত হচ্ছে না? ক্যাডার বৈষম্য কমানোর নিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সুস্পষ্ট বক্তব্য থাকার পরেও কোনো এক অজানা কারণে সেটার বাস্তবায়িত হচ্ছে না। ফলে আমরা সাম্প্রতিককালে বিসিএসে এমন প্রবণতা দেখতে পাচ্ছি। একজন চিকিৎসক, যাঁর পেছনে রয়েছে রাষ্ট্রের জনগণের কষ্টার্জিত অর্থের বিনিয়োগ। যিনি চিকিৎসক হয়ে যেখানে দেশের জনগণের কাঙ্ক্ষিত স্বাস্থ্যসেবা দেবেন—সেটা না করে তিনি দেশের প্রশাসন যন্ত্রের কর্তাব্যক্তি হতে চান! কেন, কী আছে বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারে? আমাদের খুবই গুরুত্ব দিয়ে বিষয়টি ভাবতে হবে—কেন চিকিৎসা, প্রকৌশল ও কৃষিবিদ্যার স্নাতকেরা তাদের পেশাগত বিদ্যার বলয় ছেড়ে বেরোতে চান?

এখানে আসল কারণ হচ্ছে পেশাগত জীবনে চরম আন্তঃক্যাডার বৈষম্য। এই বৈষম্যই আজকের এই অস্বস্তিকর ও অনভিপ্রেত এক পরিস্থিতি ও দৃশ্যের অবতারণা করেছে—যা সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব তাঁর বক্তব্যের শুরুতেই স্বীকার করেছেন। তাহলে কেন আমরা এই বৈষম্য নিরসনে কোনো পদক্ষেপ না নিয়ে এ ধরনের অসামঞ্জস্যপূর্ণ চিত্রকে বাহবা দেব? কেন রাষ্ট্রের এত বড় ক্ষতিকে আমরা মেনে নেব? সংশ্লিষ্ট নীতি নির্ধারকদের এখুনি বিষয়টি নিয়ে ভাবতে হবে। না হলে একসময় এমন একটা ‘হ-য-ব-র-ল’ পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে যখন সিভিল সার্ভিসের কাঠামোটাই ভেঙে পড়বে। বৈষম্য লালন না করে বৈষম্য নিরসনকল্পে সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিদের অবশ্যই সরকারের কাছে বাস্তবসম্মত কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরতে হবে এবং কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

একমাত্র আন্তঃক্যাডার বৈষম্য সম্পূর্ণরূপে নিরসন করলেই এই প্রবণতা আর থাকবে না। তখন চিকিৎসাবিদ্যা পড়াশোনা করে একজন চিকিৎসকই হবেন; প্রকৌশলবিদ্যা পড়াশোনা করে একজন প্রকৌশলীই হবেন এবং কৃষিবিদ্যা পড়াশোনা করে মেধাবী একজন শিক্ষার্থী কৃষিবিদই হবেন এবং দেশ ও দেশের জনগণের সত্যিকারের কাজে আসবেন। তা না হলে শুধুমাত্র পেশাগত জীবনে হাজারও বৈষম্যের কারণে হাজার হাজার বিসিএস কর্মকর্তা তাঁদের মেধা ও মনন চর্চার ক্ষেত্র থেকে বঞ্চিত হয়ে চাকরিজীবনে কর্মস্পৃহা হারিয়ে ফেলবেন। এটা মেনে নেওয়া যায় না।

শেখর শরিফ
ঝিনাইদহ
ই-মেইল: [email protected]

প্রতিক্রিয়া থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন