default-image

সাবেক পররাষ্ট্রসচিব মো. তৌহিদ হোসেন গত ৩১ মার্চ প্রথম আলোর মতামত পাতায় ‘বাংলাদেশের দুই অদ্ভুত কূটনৈতিক কাণ্ড’ শিরোনামে একটি লেখা লিখেছেন। লেখাটি নিয়ে মূল আলোচনায় যাওয়ার আগে সংক্ষেপে ঘটনাগুলো নিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ব্যাখ্যাগুলো জেনে নেওয়া যাক। মানবাধিকার কাউন্সিলে শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে আনীত প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দেওয়া প্রসঙ্গে মন্ত্রী জানান আলোচিত তামিল বিরোধী অভিযান নিয়ে শ্রীলঙ্কা তদন্ত করবে। জাতিসংঘে কোনো দেশের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব আনা হলে বাংলাদেশ নাকি তা সমর্থন করে ভোট দেয় না। এ ছাড়াও এই প্রস্তাবে কোনো 'বিশেষ উদ্দেশ্যে' আছে কি না, সেই প্রশ্নও তুলেছেন তিনি, যদিও সেই 'বিশেষ উদ্দেশ্য' তিনি খোলাসা করে বলেননি।

মিয়ানমারের সশস্ত্র বাহিনী দিবসে সামরিক জান্তার অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ নিয়ে জনাব মোমেনের ব্যাখ্যা হচ্ছে সেখানে বাংলাদেশ একা যায়নি, গেছে আরও আটটি দেশ। আর ইউরোপ-আমেরিকার না গেলেও তারা নাকি এখনো মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে। আমার মনে হয় না, একজন সচেতন পাঠকের কাছে এই ব্যাখ্যাগুলো আদৌ যৌক্তিক মনে হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

এবার আসা যাক জনাব হোসেনের কলাম প্রসঙ্গে। দেখলাম, তিনি ওই দুই ঘটনায় বাংলাদেশের আচরণ যদি 'সুচিন্তিত' হয়, তাহলে সেটা নিয়ে স্রেফ দ্বিপক্ষীয় লাভালাভের বিষয় মাথায় রেখে কথা বলছেন। প্রশ্ন হচ্ছে এই দু'টি ঘটনায় বাংলাদেশ শুধু ওই দুই দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বিষয়ই বিবেচনায় রাখছে সেটা কেন মনে করছি আমরা? পৃথিবীর সকল আন্তরাষ্ট্রীয় ঘটনা কি শুধু দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ভিত্তিতেই ঘটে? বিশ্বের, বিশেষ করে এই মুহূর্তের সবচেয়ে অস্থির এশিয়া-প্রশান্ত অঞ্চলের ভূ-রাজনীতি কি এখন এতটাই সরল?

আমরা মনে করতে পারব ট্রাম্প সরকারের শেষ দিকে গত বছর মার্কিন সরকারের উপ পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্টিফেন ই. বিগান ঢাকায় এসে সরাসরি ইন্দো প্যাসিফিক স্ট্রাটেজিতে (আইপিএস) বাংলাদেশকে যোগদানের আহ্বান জানিয়েছিলেন। এই বছরও কিছুদিন আগে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আমেরিকা সফরের সময় অনানুষ্ঠানিকভাবে তাকে আইপিএসে যুক্ত হওয়ার কথা বলা হয়েছে বলে তিনি নিজেই জানিয়েছিলেন। প্রতিবারই বাংলাদেশ বলেছিল এই ধরনের জোটে যাওয়ার ব্যাপারে বাংলাদেশ আগ্রহী নয়। আবার কখনো এও বলেছে এর অধীনে অর্থনৈতিক বিষয়গুলোতে অংশীদারত্ব চাইতে পারে বাংলাদেশ, কিন্তু সামরিক কোনো বিষয়ে নয়।

আইপিএসের আনুষ্ঠানিক কৌশলপত্রে নানা রকম কথা বলা হলেও বেশ কিছু ক্ষেত্রে সরাসরি এবং অনেক ক্ষেত্রে ‘রিডিং বিটুইন দ্য লাইনস’ আমাদের বলে এটা তৈরিই হয়েছে চীনের উত্থান মোকাবিলা করার জন্য। ‌এখন এটা আর রাখঢাক করছে না তেমন কেউ। বরং এক কাঠি বেড়ে কেউ একে রীতিমতো 'এশিয়ান ন্যাটো' বলে ডাকতে শুরু করেছেন। বাইডেন প্রশাসন এই অঞ্চলে তার মনোযোগ অনেক বেশি দেবেন তার প্রমাণ কিছুদিন আগেই তিনি দিয়েছেন, প্রতিষ্ঠার পর এই প্রথম আদতে চীনবিরোধী চারদেশীয় (আমেরিকা, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, ভারত) জোট কোয়াডের শীর্ষ নেতারা বৈঠকে বসেছিলেন।

চীনকে নিয়ে বর্তমান প্রতিষ্ঠিত শক্তিগুলোর এমন দুশ্চিন্তার একটা প্রেক্ষাপট আছে। অল্প কয়েকটি কথায় সেটি বলে নেওয়া যাক। বহু পুরোনো নাইন ড্যাশ লাইনকে সামনে এনে দক্ষিণ চীন সাগরের ৯০ শতাংশ নিজের দাবি করে কয়েকটি দেশের সঙ্গে সামুদ্রিক সীমান্ত সংঘাতে জড়িয়েছে চীন। সেই সব দেশ এবং স্থল সীমান্ত নিয়ে সমস্যা হিসাব করলে চীনের সঙ্গে অন্তত ১৫টি দেশের সীমান্ত সংঘাত আছে।

সড়কপথে অনেকগুলো দেশকে যুক্ত করার চীনা প্রকল্প বেল্ট রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) এবং বিনিয়োগের মাধ্যমে অনেকগুলো সমুদ্রবন্দরে নিজের প্রভাব তৈরি করা নিয়ে বর্তমান পৃথিবীর প্রতিষ্ঠিত শক্তিগুলোর ধারণা, ক্রমেই আধিপত্যবাদী হয়ে উঠছে চীন । বহু দেশের সরকারকে অবকাঠামো তৈরির নামে ঋণ দিয়ে নিজের নিয়ন্ত্রণের বলয়ে নিয়ে আসছে চীন। এটি এখন 'চেকবই কূটনীতি’' নামে পরিচিত হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি ইরানের সঙ্গে স্বাক্ষরিত হওয়া ৪০০ বিলিয়ন ডলারের (যা আরও বাড়বে বলে বলা হচ্ছে) ২৫ বছরের কৌশলগত চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্যে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসাবে দেখা হচ্ছে। কিছু দেশে এই ঋণ আবার এক ধরনের ঋণ ফাঁদও তৈরি করার ঝুঁকি সৃষ্টি করছে, যার ফলশ্রুতিতে দেশগুলো পুরোপুরি চীনের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

চীন-আমেরিকার সম্পর্কের মিথস্ক্রিয়া আলোচনায় গ্রাহাম এলিসনের ডেস্টিনড ফর ওয়র: ক্যান আমেরিকা অ্যান্ড চায়না এস্কেপ থুসিডাইডিস'স ট্র্যাপ? বইটি সাম্প্রতিককালে খুবই আলোচিত। এই বইয়ে গ্রিক ইতিহাসবিদ থুসিডাইডিসের বয়ানে একটি প্রাচীন ঘটনা তুলে আনেন এলিসন। সম্পদে এবং রাজনৈতিক শক্তিতে বেশি শক্তিশালী স্পার্টার সামনে যখন এথেন্স মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছিল তখন উভয়ের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়, শেষ তক এটি যুদ্ধ পর্যন্ত গড়ায়। প্রতিষ্ঠিত শক্তি আর উদীয়মান শক্তির মধ্যকার এই সংঘাতের ইতিহাস অতি প্রাচীন। লেখক উদাহরণ দিয়ে দেখান প্রাচীনকাল থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ১৬টি এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যার মধ্যে ১২টি ক্ষেত্রেই যুদ্ধ হয়েছে। তিনি যৌক্তিকভাবে আমেরিকা এবং চীনের মধ্যে একটি 'থুসিডাইডিসের ফাঁদ’ দেখতে পেয়েছেন। বলা বাহুল্য চীন-আমেরিকার মধ্যকার এই ফাঁদের প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে নানাদিকে, ভবিষ্যতে যা আরও বাড়বে।

শ্রীলঙ্কার ক্ষমতাসীন রাজাপক্ষে ভাইয়েরা তামিল বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে অভিযানের পূর্ণ দায়ভার নিতে বাধ্য কারণ তখন মাহিন্দ্রা ছিলেন প্রেসিডেন্ট আর গোতাবায়া প্রতিরক্ষামন্ত্রী। রাষ্ট্রীয় নীতিতে চীনের পক্ষে থাকা নিয়ে কোনো রাখঢাক করেন না এই দুই ভাই। এ কারণেই বাংলাদেশ ছাড়া যে ১০টি দেশ শ্রীলঙ্কার পক্ষে ভোট দিয়েছে, তাদের নামটা একটু দেখে নিলেই যে কেউ বুঝবে এরা সবাই চীনের খুব শক্ত মিত্র।

মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকা দেশগুলোর মধ্যে চীনের সঙ্গে সংঘাত আছে, এমন দেশও আছে। তবে সেখানে বাংলাদেশ উপস্থিত কেন থাকল, সেটা বুঝতে হলে মিয়ানমারের সঙ্গে এই দফার রোহিঙ্গা সমস্যা শুরুর সময়ের তথাকথিত চুক্তিটির প্রেক্ষাপট খেয়াল করতে হবে (তখন এটাকে অ্যারেঞ্জমেন্ট বা ব্যবস্থা বলা হয়েছিল)। এই চুক্তি নিয়ে জনাব তৌহিদ হোসেনও বলেছেন এতে বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষিত হয়নি। সেই ব্যবস্থাটি যে চীনের প্রভাবে হয়েছিল তার পারিপার্শ্বিক প্রমাণ হচ্ছে সেই চুক্তির আগে বাংলাদেশ সফরে এসে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছিলেন তারা চান এই সংকট দ্বিপক্ষীয় পদক্ষেপের মাধ্যমে সমাধান করা হোক। চীনা মন্ত্রী এরপর মিয়ানমার যান, আর তার কয়েক দিনের মধ্যেই স্বাক্ষরিত হয় সেই তথাকথিত অ্যারেঞ্জমেন্ট।

এই আলোচনার প্রেক্ষাপটে আমার ব্যাখ্যা হচ্ছে চীনের প্রভাবে বাংলাদেশ এই দুই 'অদ্ভুত কূটনৈতিক কাণ্ড' করেছে, এখানে আলোচিত দুই দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় কোনো বিষয় গুরুত্বপূর্ণ ছিল না।

বাংলাদেশ কি আসলেই চীনের প্রভাবে এমন 'কাণ্ড' করেছে? করে থাকলে কেন করল যেটাকে আমাদের রাষ্ট্রীয় স্বার্থের প্রতিকূল বলে মনে হয়? চীন আমেরিকার মধ্যে স্নায়ুযুদ্ধ শুরু হয়ে গিয়ে থাকে কিংবা যদি নিকট ভবিষ্যতে শুরু হয়, তাহলে তাদের নিজস্ব বলয় তৈরির মরিয়া চেষ্টায় আমাদের অবস্থান কী হবে? অনাগত দিনে কোনো পক্ষে না গিয়ে জাতীয় স্বার্থ নিশ্চিত করা কতটুকু সম্ভব কিংবা আদৌ সম্ভব কি? একের পর এক প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় থাকা সরকারটি এসব ক্ষেত্রে দর-কষাকষি করে এই রাষ্ট্রের পূর্ণ স্বার্থ রক্ষা করতে কি আদৌ সক্ষম, নাকি তার যাবতীয় দর কষাকষি হবে যে কোনো মূল্যে স্রেফ তার ক্ষমতাকে দীর্ঘায়িত করাকে কেন্দ্র করে?

যত দূর জানি জনাব তৌহিদ হোসেন একজন ক্যারিয়ার ডিপ্লোম্যাট। তাঁর মতো দীর্ঘকাল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাজ করা, মন্ত্রণালয়ের সর্বোচ্চ পদে যাওয়া মানুষদের উচিত ছিল সাম্প্রতিক ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে এই আলোচনাগুলো জন পরিসরে নিয়ে এসে খোলামেলা কথা বলা। অবসরের পর অনেক ক্ষেত্রেই এখন খোলামেলা কথা বললেও এই ক্ষেত্রে একজন 'ডিপ্লোম্যাট’ই হয়ে থাকলেন তিনি।

ডা. জাহেদ উর রহমান শিক্ষক ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি অফ বাংলাদেশ

প্রতিক্রিয়া থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন