বিজ্ঞাপন

প্রতিষ্ঠানগুলো ভেঙে পড়ছে, জবাবদিহির তেমন কোনো বালাই নেই, স্বনির্বাচিত সংসদ এবংআরও অনেক অভিযোগ আমাদের সবার। দুর্নীতি, লুটপাট, ক্ষমতার দম্ভ ও অপব্যবহার—এসব তো আছেই। সাংবাদিকেরা বিনা কারণে কারাগারে আটক আছেন মাসের পর মাস, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা পেছাতে পেছাতে এখন এমনকি দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যেও স্থান ঠেকেছে তলানিতে। কিন্তু এত কিছু হতাশা ও নিরাশার মধ্যে হঠাৎ করে ভীষণ আশার আলো দেখা যাচ্ছে।

অত্যাচারী যখন শোষণ-প্রেষণ করে, তখন জনগণ পিছু হটতে বাধ্য হয়। মাঝেমধ্যে পিছু হটতে হটতে পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেলে নিতান্ত নিরীহ মানুষেরাও দলবদ্ধ হয়ে প্রতিরোধে নেমে পড়ে। এর সাম্প্রতিক উদাহরণ আমরা দেখেছি ছাত্রছাত্রীদের সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার আন্দোলনে। আরও নবীন ছাত্রছাত্রীদের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সময় তারা যেভাবে রাষ্ট্রযন্ত্র মেরামতের দায়িত্ব নিজেদের হাতে তুলে নিয়েছিল, তা দেখে গর্বে বুক ভরে উঠেছিল। পিঠ ঠেকে গিয়ে রুখে দাঁড়ানোর আন্দোলন দেখেছি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ভ্যাটবিরোধী আন্দোলনে।

গত কয়েক বছরে অত্যাচার–অন্যায়ের শিকার হয়ে পিছু হটতে হটতে সংবাদমাধ্যম এবং সংবাদকর্মীদেরও পিঠ এখন দেয়ালে ঠেকে গেছে। পিছু হটার আর কোনো জায়গা নেই। তাই ১৭ মে সোমবার বিকেল থেকে আজ ১৯ মে বুধবার বিকেলে এই লেখা যখন লিখছি, তখন স্পষ্ট দেখছি, গত ৪৮ ঘণ্টাই সারা দেশ প্রতিবাদমুখর হয়ে উঠেছে। সংবাদমাধ্যমের ওপর যে অন্যায় ও অত্যাচার করা হচ্ছে, এতে এখন শুধু সংবাদকর্মীরা নন, রাজনৈতিক মতাদর্শনির্বিশেষে দেশের প্রায় সব মানুষই ধিক্কার দিচ্ছে। ধিক্কার দিচ্ছে শুধু রোজিনা ইসলামকে হেনস্তায় জড়িত আমলাদেরই নয়, বরং সরকারের ঘনিষ্ঠ বহু ব্যক্তিকে, গোষ্ঠী-উপগোষ্ঠীকে। প্রতিবাদে, মিছিলে, মানববন্ধনে এবং বিবৃতি-বক্তব্যে দেশ এখন সয়লাব। ইতিমধ্যে এ প্রতিবাদের ঢেউ গিয়ে লেগেছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে ও সংগঠনেও। এ সবকিছুই ঘটেছে গত ৪৮ ঘণ্টায়।

২.

রোজিনা ইসলামকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একটি কক্ষে ৫-৬ ঘণ্টা আটকে রেখে হেনস্তা, মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন করার ঘটনার কথা জানা যাচ্ছে। সময়টা নেওয়া হয়েছিল হেনস্তা, নির্যাতন করার জন্য এবং অন্য সংবাদকর্মীদের মধ্যে ভয়ভীতি আরও দৃঢ়ভাবে সঞ্চার করার জন্য। পরদিন এত বেশিসংখ্যক পুলিশি প্রহরায় রোজিনাকে আদালতে হাজির করা থেকে এটা আবারও স্পষ্ট হলো যে সরকার স্বাধীন সংবাদমাধ্যমকে কত ভয় পায়। সরকারের ভয়ই আমাদের আশা। এখন আমরা সবাই এ আশাকে কেন্দ্র করেই জড়ো হচ্ছি।

৩.

রোজিনা ইসলামকে হয়রানি, হেনস্তা, নির্যাতন ও বানোয়াট মামলার জন্য দায়ী কর্মকর্তাদের বদলি না করে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য তদন্ত শুরু করতে হবে। দ্বিতীয়ত, এক বছরের বেশি সময় ধরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধে যেসব অদক্ষতা, অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম, দুর্নীতি ও লুটপাটের অভিযোগ এসেছে, সেগুলোর তদন্ত করার জন্য দ্য কমিশন অব এনকোয়ারি অ্যাক্ট, ১৯৫৬–এর আওতায় নিরপেক্ষ তদন্ত করে সরকারের জন্য সুচিন্তিত সুপারিশমালা প্রয়োজন। করোনা মহামারিতে ১২ হাজারের বেশি মানুষ মারা গেছে, আক্রান্ত হয়েছে প্রায় ৮ লাখ। সরকারি এই হিসাবের বাইরেও আরও অনেক ভুক্তভোগী আছে। রোজিনা ইসলামের সাম্প্রতিক অনেক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে যে মোদ্দা কথাটি উঠে এসেছে তা হলো, করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে ঘাটতি ও সমন্বয়হীনতার জন্য বহুলাংশে দায়ী স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতি ও লুটপাট–বাণিজ্য। এর পরিপ্রেক্ষিতে সরকার যদি এখনো রোজিনা ইসলামকে আক্রোশের বশবর্তী হয়ে শায়েস্তা করতে চায়, তাহলে শেষ বিচারে মূল্য দিতে হবে সরকারকেই। কারণ, তখন সরকার হয়ে যাবে জনগণের চরম শত্রু।

ড. শাহদীন মালিক, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের শিক্ষক।

প্রতিক্রিয়া থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন