আবরার আমাদের বন্ধু

বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বন্ধুদের সঙ্গে আবরার আহমেদ চৌধুরী (ডান থেকে তৃতীয়)। ছবি: সংগৃহীত
বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বন্ধুদের সঙ্গে আবরার আহমেদ চৌধুরী (ডান থেকে তৃতীয়)। ছবি: সংগৃহীত
আবরার আহমেদ চৌধুরী। বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। তুখোড় মেধাবী, হাসিখুশি, প্রাণবন্ত আবরার এখন শুধুই স্মৃতি। ১৯ মার্চ সুপ্রভাত পরিবহনের একটি বাসের চাপায় ঢাকার রাস্তায় তিনি প্রাণ হারান। আবরারকে স্মরণ করেছেন শোকে বিহ্বল তাঁরই তিন বন্ধু ও সহপাঠী।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বসন্তবরণ অনুষ্ঠানে আবরার। ছবি: আবরারের ফেসবুক প্রোফাইল
বিশ্ববিদ্যালয়ের বসন্তবরণ অনুষ্ঠানে আবরার। ছবি: আবরারের ফেসবুক প্রোফাইল

রোল ৫৯ তোর জন্যই থাকবে
অনিক হাসান

সবাই সুন্দর করে হাসতে পারে না, আবরার পারত। দুনিয়ার অতি বিরল কিছু মানুষ হয়তো আছে, যাদের কেউ অপছন্দ করে না—আবরার ছিল সেই রকম একজন মানুষ।
আবরার আমার বন্ধু। আমাদের পরিচয়, বন্ধুত্ব বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে এসে। কত দিনের আর জানাশোনা, সবে তো প্রথম বর্ষ চলছে। তাতেই আবরারকে আমার মতো অনেকে চিনে ফেলেছিল। নিরেট দিলখোলা একজন মানুষ ছিল আবরার। আমরা তাকে ‘সিজি–ফোর’ বলে ডাকতাম, সায় ছিল শিক্ষকদেরও। অর্থাৎ সিজিপিএ ৪-এর মধ্যে ৪ পাওয়ার সম্ভাবনা ছিল আবরারের। পড়াশোনায় তুখোড় ছিল। কিন্তু ওর সঙ্গে আমার কখনোই পড়াশোনা নিয়ে কথা হতো না। এ জন্য অবশ্য আবরার খুশিই হতো। স্রোতের বাইরের একজন হিসেবে আবরার আমাকে প্রায় বলত, ‘দোস্ত, সবাই আমাকে পড়াশোনার জন্য নক দেয়। তুই আর কয়েকটা বন্ধুই একটু আলাদা, তোদের সঙ্গেই একটু কথা বলে আনন্দ পাই।’ আবার অনেক সময় বলত, ‘তুই অনেক ফানি, দোস্ত!’

তুই অনেক ফানি, দোস্ত—আমি অনেক কৌতুকপ্রবণ মানুষ কি না জানি না, তবে আবরারের মুখে কথাটা ভালো লাগত, সেই কথাটা আবরারের মুখে আর কোনো দিন শুনব না। আবরার মাঝেমধ্যে বলত, ‘দোস্ত, আমি না অনেক বোকাসোকা মানুষ। আমাকে একটু চালাক বানিয়ে দে।’ শুনে আমি হাসতাম। আবরারের কথায় ছেলেমানুষি ছিল। সব ক্লাসে ওর প্রশ্ন, হঠাৎ হঠাৎ বিউপির আপার প্লাজায় আবরারকে আর পাব না, আর দেখা হবে না প্রতিদিন সামনের বেঞ্চে বসা সরল চেহারার দৃপ্তমান ছেলেটাকে। প্রিয় বন্ধু আবরার, তোকে আমার আর চালাক বানানো হবে না!

আবরারের সঙ্গে একটা বিষয়ে আমার ভীষণ মিল ছিল। সেটা হলো, স্বপ্ন। দুজনের স্বপ্ন ছিল আমরা সশস্ত্র বাহিনীর কর্মকর্তা হব। স্বপ্নপূরণে আমরা দুজনই এগিয়ে ছিলাম। আবরার বিমানবাহিনী থেকে আইএসএসবির (আন্তঃবাহিনী নির্বাচন পর্ষদ) জন্য টিকে আছে, আর আমি নৌবাহিনীর জন্য। চাকরি হলে হয়তো আমরা কোর্সমেট হতাম। হয়তো একসঙ্গে বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমিতে প্রশিক্ষণে প্রথম তিন মাস কাটাতাম। কিন্তু আজ সেসব শুধুই, ‘হয়তো’। আমাদের একসঙ্গে প্রশিক্ষণ নেওয়ার, কোর্সমেট হওয়া হয়নি আর কোনো দিন হবেও না।

কিন্তু আবরারকে ভুলে থাকাও তো সম্ভব নয়। আবরারের পরেই আমার রোল। ওর ৫৯, আমার ৬০। প্রতিদিন আবরারের ‘প্রেজেন্ট স্যার’ শোনার পরই মনে পড়ত এখন আমার রোল ডাকবে। কিন্তু এখন?
আবরার, ভালো থাকিস বন্ধু। রোল নম্বর ‘ফিফটি নাইন’ তোর জন্য সংরক্ষিত থাকবে। আইআর–ফাইভ (আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের পঞ্চম ব্যাচ) তোকে মনে রাখবে। তুই যে সবার মণিকোঠায়।

লেখক: প্রথম বর্ষ, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, বিইউপি

আবরার এখন শুধুই ছবির মানুষ। ছবি: সংগৃহীত
আবরার এখন শুধুই ছবির মানুষ। ছবি: সংগৃহীত

আবরার বেঁচে থাকবে আমাদের মধ্যে
আরাফাত হোসেন
সেদিন আমাদের ক্লাস ছিল সকাল সাড়ে আটটায়। আমি একটু আগেই ক্যাম্পাসে চলে এসেছিলাম। আগের দিনের ক্লাসের রেশ তখনো ছিল। তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, সামনের বেঞ্চে আবরারের সঙ্গেই বসব।
এটা নতুন কোনো ঘটনা নয়। আবরারের সঙ্গে আমি সামনের বেঞ্চে পাশাপাশিই বসতাম। বসতাম বলছি এই জন্য, কিছুদিন ধরে পেছনের দিকটায় জায়গা করে নিয়েছিলাম। কারণটা হলো, পেছনের দিকে বসলে একটু আরাম করে ক্লাস করা যায়। ১৮ মার্চ, সেটা ছিল আমাদের শেষ ক্লাস। মিতুল ম্যাডাম (বিইউপির ইংরেজি বিভাগের প্রভাষক সিদারাতুল মুনতাহা) জিজ্ঞেস করেছিলেন, কিছুদিন আমরা আলাদা বসেছি কেন? আমি বলেছিলাম, ‘আবরার অনেক বন্ধু পেয়েছে তো, তা-ই।’ ম্যাম তখন অনেকটা কৌতুক করে বলেছিলেন, ‘আবরার বন্ধু পেয়েছে, নাকি তুমি বান্ধবী পেয়েছ?’ সেই দিনের ঘটনাটি এখন খুব করে মনে পড়ছে। কারণ, সেদিন পুরোটা ক্লাস ছিল আবরারময়।
শেষ ক্লাস শুরুর আগেই সেই দুর্ঘটনার খবর পেলাম। রাজধানীর নর্দ্দা এলাকার যে জায়গা থেকে আবরার বাসে উঠত, সেখান থেকে আমাদের আরও কয়েকজন সহপাঠী নিয়মিত যাতায়াত করত। তারাই জানিয়েছিল আমাদের। অনেকের মতো আমিও ছুটে গেলাম। ভেবেছিলাম চোট পেয়েছে, হাসপাতালে নিতে হবে। কিন্তু সেখানে পৌঁছার পর যা জানলাম, যা দেখলাম—শোকের সেই ধাক্কা এখনো কাটেনি। হয়তো কাটবেও না কোনো দিন।
আবরারের সঙ্গে পরিচয়, বন্ধুত্বের সময়টা মাত্র তিন মাসের। কিন্তু আমার মতো অনেকেই বলবে, ও তো আমাদের কত দিনের চেনা। আবরার ঠিক জলের মতো সহজ একজন মানুষ। প্রত্যেকের সঙ্গে মিশে যাওয়ার অসম্ভব এক ক্ষমতা ছিল ওর মধ্যে। আমাদের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের দুটি শাখা। বিচ্ছিন্নভাবে দুই শাখার অনেকের সঙ্গে আমাদের পরিচয় আছে, বন্ধুত্ব আছে। তবে আবরারের ছায়া ছিল দুই শাখাতেই।
ক্লাসের একটি গুরুদায়িত্ব নিজেই কাঁধে তুলে নিয়েছিল আবরার। সেটা ছিল ঘরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ! এসির (শীতাতপ নিয়ন্ত্রণযন্ত্র) রিমোটটা ওর হাতেই থাকত। সবার প্রয়োজনমতো বাড়ানো-কমানোর কাজটা করত আবরার!
এমন চূর্ণ চূর্ণ ঘটনার মধ্যে খুঁজে পাওয়া যায় আবরারকে। এভাবেই আবরার বেঁচে থাকবে আমাদের মধ্যে।

লেখক: প্রথম বর্ষ, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, বিইউপি

ঘুড়ির মতোই উড়ত যেন আবরারের মনটা!
ঘুড়ির মতোই উড়ত যেন আবরারের মনটা!

ওর ছিল পাখির মতো মন
নূর-ই-জান্নাত
দুর্ঘটনার আগের দিন, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমরা একসঙ্গে ফিরেছি। প্রায়ই আমরা একসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাতায়াত করতাম। একসঙ্গেই রাস্তা পার হতাম। যে যার মতো বাসা থেকে এসে এখানেই দাঁড়াতাম। আমিই আগে পৌঁছাতাম, আবরার হয়তো একটু পরই চলে আসত। কেন জানি না, সেদিন আবরার আগে পৌঁছেছিল। তবে আমি জানতাম না, সে চলে এসেছে। সময় গড়িয়ে যাচ্ছিল বলে তাকে মুঠোফোনে চেষ্টা করছিলাম বারবার। কিন্তু ফোনটা বলছিল বন্ধ।
তখনই নজরে এল কিছুদূরের সেই মানুষের জটলা। কোনো দুর্ঘটনার কারণে যে এত ভিড়, সেটা বুঝতেও আমার কিছুটা সময় লেগেছে। কিন্তু যখন জানলাম, জটলাটা আবরারকে ঘিরে, তখন কেমন যেন শূন্য শূন্য লাগছিল সবকিছু। তখন দুঃখবোধ চেপে বসেছিল, আহা সেদিন আমি যদি আগে এসে পৌঁছাতাম, হয়তো আবরারের এমন নির্মমতার শিকার হতো হতো না!
আবরারকে আমরা পেয়েছি ভীষণ হাসিখুশি, শান্তশিষ্ট, বন্ধুবৎসল আর সাহায্যকারী একজন মানুষ হিসেবে। ক্লাসের কেউ কোনো বিষয়ে না বুঝলে আবরার বুঝিয়ে দিত। কোর্সের বা পরীক্ষা–সম্পর্কিত যেকোনো বিষয়ে আমরা সবাই ওর কাছেই ছুটে যেতাম। মাঝেমধ্যে আমাদের শিক্ষক কোনো বিষয় নিয়ে কিছু বলা শুরু করতেই আবরার আগে দাঁড়িয়ে নিজেই অনেকটা বলে ফেলতে পারত। এতটাই জানার পরিধি ছিল আবরারের।
আমরা দেখেছি, আবরার ওর মায়ের খুব কাছের বন্ধু ও প্রিয় মানুষ ছিল। তিনি আবরারকে একা ছাড়তে চাইতেন না। এ নিয়ে মাঝেমধ্যেই মায়ের ওপর রাগ করত সে। কারণ, ওর ছিল পাখির মতো মন। অন্য সবার মতো একা একা পথ চলতে চাইত। রিকশায় যেতে চাইত, ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার করতে চাইত না।

লেখক: প্রথম বর্ষ, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, বিইউপি
অনুলিখন: সজীব মিয়া ও তানজিনা আকতারী