বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

গতকাল সোমবার বেলা দুইটায় শহরের বাঁধন কমিউনিটি সেন্টারে সংবাদ সম্মেলন করেন শামীম ওসমান। সেখানে তিনি নিজেই বলেন, ‘অনেক চাপা কষ্ট নিয়ে বলছি, আমার জীবনের সবচেয়ে কষ্টের সংবাদ সম্মেলন এটা।...মনে অনেক কষ্ট ছিল, তাই যেভাবে নামা উচিত, সেভাবে নামতে পারিনি। আজ থেকে নামলাম।’

যদিও চাপে পড়ে এমন ঘোষণা দেওয়ার কথা স্বীকার করেননি শামীম ওসমান। এ বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি নিজের মুঠোফোনে রক্ষিত একটি ইংরেজি উক্তি তুলে ধরেন। যার অর্থ, ‘ভাগ্য যোদ্ধাকে বলছে তুমি ঝড়ের সামনে দাঁড়াতে পারবে না। যোদ্ধা ভাগ্যকে বলছে, আমি নিজেই ঝড়। সুতরাং এই ঝড়কে চাপ দেওয়ার ক্ষমতা কারও নেই।’

অবশ্য শামীমের এ সমর্থন বা মাঠে থাকার ঘোষণার ফল কী হয়, তা নিয়ে আইভীর প্রতি অনুগত নেতা–কর্মীদের অনেকে সন্দিহান। তাঁরা মনে করছেন, শামীমের সক্রিয় তৎপরতার চেয়ে আইভীর বেশি প্রয়োজন দলীয় সংহতি এবং নির্বাচন ঘিরে স্থানীয় নেতাদের অন্তর্ঘাতমূলক তৎপরতা থেকে নিবৃত্ত করা। সেটা কতটা নিবৃত্ত হবে, তা এখনো পরিষ্কার নয়।

তবে নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবদুল হাই মনে করেন, শামীম ওসমানের ঘোষণা ভোটের মাঠে প্রভাব ফেলবে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘তিনি (শামীম ওসমান) এত দিন প্রকাশ্যে নামেননি। এখন ঘোষণা দেওয়ার পর তাঁর লোকজন মাঠে নামবেন বলে আমরা আশা করি।’

দলীয় প্রার্থীর পাশে থাকার ঘোষণা দিলেও গতকালের সংবাদ সম্মেলনে শামীম ওসমানের শারীরিক ভাষা ও বক্তব্য ইতিবাচক নয় বলে মনে করছেন অনেকে। বরং তাঁর বক্তব্যে সেলিনা হায়াৎ আইভীকে হেয় বা তাচ্ছিল্য করার চেষ্টা লক্ষণীয় ছিল। যেমন আইভীর পক্ষে মাঠে নামার ঘোষণা দিয়ে শামীম ওসমান বলেন, ‘এখানে কে প্রার্থী, হু কেয়ারস। কলাগাছ, না আমগাছ—সেটা দেখার বিষয় না। এটা বঙ্গবন্ধুর নৌকা, শেখ হাসিনার নৌকা, এর বাইরে যাওয়ার কোনো উপায় নেই।’

এ ছাড়া আইভীকে ইঙ্গিত করে শামীম ওসমান বোঝানোর চেষ্টা করেছেন যে তিনি তাঁর সমকক্ষ নন। নারায়ণগঞ্জকে খুবই ক্ষুদ্র সিটি করপোরেশন এবং ভোটার সংখ্যা ‘মাত্র পাঁচ লাখ’, ‘সোয়া পাঁচ লাখ’ বলে একাধিকবার বিষয়টি সামনে আনেন তাচ্ছিল্যের স্বরে।

তবে শামীম ওসমানের বক্তব্য বা আইভীর পাশে থাকার ঘোষণা ভোটের মাঠে খুব একটা প্রভাব পড়বে না বলে মনে করেন নারায়ণগঞ্জ নাগরিক কমিটির জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি রফিউর রাব্বি। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, নারায়ণগঞ্জের বাস্তবতা অন্য জায়গার চেয়ে ভিন্ন। এখানে নির্বাচন সুষ্ঠু হলে আইভী জিতবেন। কারণ, মানুষ আইভীকে সরকারের লোক মনে করে না। আইভীর ওপর সাধারণ মানুষের সমর্থন আছে।

শামীম ও আইভীর দ্বন্দ্ব বা বিরোধের শুরু ২০১১ সালে। নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনে উন্নীত হওয়ার পর সেটা ছিল প্রথম ভোট। তাতে মেয়র পদে আওয়ামী সমর্থিত প্রার্থী ছিলেন শামীম ওসমান। তাঁকে বিপুল ভোটে পরাজিত করে মেয়র নির্বাচিত হন সেলিনা হায়াৎ আইভী। সেই থেকে দুজনের বিভেদ চলে আসছে—কখনো প্রকাশ্যে, কখনো গোপনে।

এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিএনপি ঘোষণা দিয়ে মাঠে নেই। তবে দলীয় নির্দেশ অমান্য করে নির্বাচনে আছেন দলের বহিষ্কৃত নেতা তৈমুর আলম খন্দকার। যিনি নির্বাচনে নেমে বিএনপির চেয়াপারসনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য, নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সদস্য পদ হারিয়েছেন। হাতি প্রতীক নিয়ে তিনি নির্বাচন করছেন।

স্থানীয় লোকজন জানান, এবারের নির্বাচনের শুরু থেকেই চুপচাপ ছিলেন শামীম ওসমান। তাঁর বিষয়ে প্রথম মুখ খোলেন সেলিনা হায়াৎ আইভী। গত শনিবার এক নির্বাচনী জনসংযোগে তিনি বলেন, তৈমুর গডফাদার শামীম ওসমানের প্রার্থী, তিনি ওসমান পরিবারের প্রার্থী।

এরপরই শামীম ও আইভীর পুরোনো বিতর্ক নতুন করে মাঠে গড়ায়। পরদিন আইভী অবশ্য বলেছেন, গডফাদার উপাধি তিনি দেননি। এটা শামীম ওসমানের গত ৩০ বছরের উপাধি।

অন্যদিকে আইভীর ওই বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় তৈমুর আলম খন্দকার বলেছেন, তিনি নিজের পায়ে হাঁটেন, শামীম ওসমানের পায়ে হাঁটেন না।

তবে গতকাল সংবাদ সম্মেলনে ‘গডফাদার’ আখ্যা দেওয়া প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলেও শামীম ওসমান জোরালো কোনো প্রতিক্রিয়া জানাননি। তিনি রসিকতার সুরে বলেন, ‘...ভাই কেউ যদি আজকে ফাদার, কালকে ব্রাদার, পরশু গডফাদার বলে, বলুক। ভাই যা-ই বলার বলেন গডমাদার বইলেন না।’

শামীম ওসমান নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের আওয়ামী লীগ দলীয় সাংসদ। তাঁর নির্বাচনী এলাকার ৯টি ওয়ার্ডে সিটি করপোরেশনের নির্বাচন হচ্ছে। প্রশ্ন উঠেছে, সংবাদ সম্মেলন করে দলীয় প্রার্থীর পক্ষে কাজ করার ঘোষণা দিয়ে শামীম ওসমান নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন করেছেন কি না। এ বিষয়ে তৈমুর আলম খন্দকার প্রথম আলোকে বলেছেন, এ ঘোষণায় আচরণবিধি লঙ্ঘন হয়েছে।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে রিটার্নিং কর্মকর্তা মাহফুজা আক্তারকে একাধিকবার ফোন দেওয়া হলেও তিনি ফোন ধরেননি। আর সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা মতিয়ুর রহমান এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি।

শামীম ওসমানের সংবাদ সম্মেলনের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি সেলিনা হায়াৎ আইভী। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি এখনই কিছু বলব না। কেন্দ্রীয় নেতারা আছেন, তাঁরা কথা বলবেন। আমি দুই দিন দেখব, তারপর বলব। এখন আমি ভোটারদের কাছে ছুটে বেড়াচ্ছি। কে পাশে আছে, কে নেই সেটা দেখছি না।’

রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন