সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মদন মোহন কলেজ। প্রায় নয় মাসের ব্যবধানে ক্যাম্পাসে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এ দুই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষে নিহত হয়েছেন ছাত্রলীগের দুই কর্মী। অথচ দুটি হত্যাকাণ্ডেরই দায় নিতে নারাজ ছাত্রলীগ। নিহত দুজনকে নিজেদের কর্মী বলে স্বীকৃতি দিতেও যে তাদের লজ্জা।
নিহত ওই দুই ছাত্রলীগ কর্মী হলেন সুমন চন্দ্র দাশ (২২) ও আবদুল আলী তালুকদার (১৯)। তাঁদের মধ্যে শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে গত বছর ২০ নভেম্বর ছাত্রলীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন সুমন। তিনি ছিলেন সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির বিবিএর শিক্ষার্থী। সে সময় একজন ‘বহিরাগত’ হিসেবে ক্যাম্পাসে এসে তাঁর নিহত হওয়ার ঘটনার দায় নেয়নি ছাত্রলীগ। তাঁকে কর্মী বলেও স্বীকার করেনি তারা। হত্যাকাণ্ডের দুদিন পর সিলেট জেলা ও নগর ছাত্রলীগের নেতারা সংবাদ সম্মেলন করে বলেছিলেন, ‘সুমন ছাত্রলীগের কেউ নন। খুনের দায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের।’
এ ঘটনার পর ১২ আগস্ট নিজ দলের কর্মীদের ছুরিকাঘাতে খুন হলেন মদন মোহন কলেজের শিক্ষার্থী ও ছাত্রলীগ কর্মী আবদুল আলী। এবারও ছাত্রলীগ আগের ভূমিকায়। ঘটনার দিনই কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসাইন গণমাধ্যমকে জানান, আলী ছাত্রলীগের কেউ নন।
জাকির হোসাইন প্রথম আলোকে বলেছিলেন, ‘মদন মোহন কলেজে প্রায় পাঁচ বছর ধরে ছাত্রলীগের কমিটি নেই। কার্যক্রমও নেই। এ অবস্থায় ছাত্রলীগের আধিপত্যের ঘটনা ঘটেছে, এটি আমরা মানছি না। যেখানে কমিটিই নেই, সেখানে ছাত্রলীগের নাম ব্যবহার করে কেউ কিছু করলে তার দায় ছাত্রলীগের নয়।’
কেন্দ্র থেকে শুরু করে ছাত্রলীগের স্থানীয় পর্যায়ের নেতৃত্ব সুমন চন্দ্র ও আবদুল আলীকে ছাত্রলীগ কর্মী বলে স্বীকার না করলেও প্রত্যক্ষদর্শী, নিজ নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, দুজনই ছিলেন সংগঠনটির সক্রিয় কর্মী। ভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী হলেও শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের একটি পক্ষের হয়ে সক্রিয় ছিলেন সুমন চন্দ্র। সাংগঠনিক সব কর্মসূচিতে তাঁর ছিল সরব উপস্থিতি। ফেসবুকে দলীয় প্রচারণার নানা ছবিও আপলোড করেছিলেন তিনি। সহপাঠীদের তিনি জানিয়েছিলেন, ২০ নভেম্বর ক্যাম্পাসে তাঁকে নেওয়া হয়েছিল ছাত্রলীগের ওপর আক্রমণ হতে পারে—এমন খবর দিয়ে।
সুমনের বাড়ি সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার শ্যামারচর গ্রামে। তাঁর মুক্তিযোদ্ধা বাবা হরিধন দাশ ছেলের কর্মী পরিচয় ছাত্রলীগ নেতারা অস্বীকার করায় ক্ষোভের সঙ্গে বিস্মিতও হয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘নেতারা না বললেও ছেলের কাছে আদর্শ ছিল ছাত্রলীগ।’
প্রায় নয় মাসের মাথায় সুমনের পর আলীর বেলাতেও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হওয়ায় ক্ষুব্ধ তাঁর পরিবার ও পরিচিত অনেকে। আলী হত্যাকাণ্ডে সিলেট কোতোয়ালি থানায় তাঁর বাবার দায়ের করা মামলায় ছেলেকে ছাত্রলীগ কর্মী পরিচয় দেওয়া হয়েছে। কলেজে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে পরিকল্পিতভাবে হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলেও এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
সিলেটের দক্ষিণ সুরমার নিজ সিলাম গ্রামের গৃহস্থ পরিবারের সন্তান আলী। বাবা আলকাস আলী বলেন, ‘ছেলে ছাত্রলীগ করত, ঘটনার দিন ছাত্রলীগের ছেলেরা আলীরে কলেজে নিছে। এই পরিচয় কেউ কইলেও লোকানোর না।’
একই এলাকার বাসিন্দা ও সদ্য বিলুপ্ত মহানগর ছাত্রলীগ কমিটির সাধারণ সম্পাদক এমরুল হাসান জানান, আলী একজন সক্রিয় ও একনিষ্ঠ কর্মী ছিলেন। সর্বশেষ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সম্মেলনে সিলেট নগর কমিটির পক্ষে যে দলটি গিয়েছিল আলী সেখানেও ছিলেন। তাঁর ফেসবুকে ওই ছবিসহ দলীয় কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত থাকার একাধিক ছবি রয়েছে। এ অবস্থায় আলীকে কর্মী বলে স্বীকার না করাটা দুঃখজনক।

বিজ্ঞাপন
রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন