বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

নিহত জাহিদুলের স্ত্রী ঢাকা দক্ষিণ সিটির সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলর ফারহানা ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। তবে তিনি কাউকে সন্দেহ করার কথা বলেননি। তিনি গতকাল শুক্রবার শাহজাহানপুর থানায় যে মামলা করেছেন, তাতেও কারও নাম উল্লেখ করেননি। তবে এজাহারে বলা হয়েছে, চার-পাঁচ দিন আগে অজ্ঞাতনামা দুষ্কৃতকারী জাহিদুলকে মুঠোফোনে হত্যার হুমকি দিয়েছিলেন।

জাহিদুল ইসলামকে গত বৃহস্পতিবার রাত ১০টার দিকে রাজধানীর শাহজাহানপুরের আমতলা মসজিদ এলাকায় গুলি করে হত্যা করা হয়। তিনি এ সময় নিজ গাড়িতে (মাইক্রোবাস) করে মতিঝিল এজিবি কলোনি থেকে খিলগাঁওয়ের বাগিচা এলাকার বাসায় যাচ্ছিলেন। যানজটে গাড়ি আটকে গেলে মোটরসাইকেলের পেছনে বসে আসা হেলমেট পরা এক যুবক জাহিদুলকে লক্ষ্য করে গুলি করেন। এ সময় দুর্বৃত্তের এলোপাতাড়ি গুলিতে জাহিদুলের গাড়িচালক এবং অদূরে রিকশারোহী সামিয়া আফনান জামাল গুলিবিদ্ধ হন। পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে জাহিদুল ও সামিয়াকে মৃত ঘোষণা করা হয়। চালক মনির হোসেন চিকিৎসাধীন।

দীর্ঘদিন পর ঢাকার রাজপথে এভাবে কাউকে গুলি করে হত্যা করা হলো। ফলে গতকাল দিনভর এটা রাজধানীতে আলোচিত বিষয় ছিল।

হত্যার ঘটনায় নানা আলোচনা, সন্দেহ

আওয়ামী লীগসহ স্থানীয় বিভিন্ন সূত্রের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জাহিদুল ইসলামকে হত্যার পর তাঁর সঙ্গে এলাকার রাজনীতি ও অপরাধজগতের (আন্ডারওয়ার্ল্ড) নতুন ও পুরোনো নানামুখী দ্বন্দ্ব ও বিরোধের কথা সামনে এসেছে। এর মধ্যে বেশি আলোচনায় আছেন শাহজাহানপুর-মতিঝিল-খিলগাঁও এলাকার পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী জাফর আহাম্মদ ওরফে মানিক।

স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, এর মধ্যে ক্রীড়া পরিষদের টেন্ডার নিয়ে মতিঝিল থানা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি শাহরিয়ার সোহেলের সঙ্গে জাহিদুলের দ্বন্দ্ব চলছিল। জাহিদুলের হাতে ক্রীড়া পরিষদের টেন্ডারের একক নিয়ন্ত্রণ চলে যাওয়ার কারণে শাহরিয়ার সুবিধা করতে পারছিলেন না। এই শাহরিয়ার একসময় ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়ার ঘনিষ্ঠ ছিলেন। ক্যাসিনো–কাণ্ডে গ্রেপ্তার আছেন খালেদ মাহমুদ। শাহরিয়ার সাম্প্রতিক কালে মানিকের ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন।

অন্যদিকে ক্রীড়া পরিষদে দরপত্র নিয়ন্ত্রণ খাত থেকে একসময় ভাগ পেতেন শীর্ষ সন্ত্রাসী মানিক। জাহিদুলের হাতে নিয়ন্ত্রণ চলে যাওয়ার পর মানিকের সঙ্গে তাঁর বিরোধ তৈরি হয়। মানিক বিদেশে বসে শাহজাহানপুর-মতিঝিল এলাকার অপরাধজগতের একাংশ নিয়ন্ত্রণ করেন। আবার যে এলাকায় জাহিদুল খুন হন, সেই এলাকায় খালেদ মাহমুদের অনুসারীদের এখনো তৎপরতা আছে।

ওই এলাকার সরকারি দলের সঙ্গে যুক্ত একাধিক সূত্র জানায়, জাহিদুলের মৃত্যুর আগে তাঁর সঙ্গে মানিক ছাড়াও ওই এলাকার আরও কয়েকজনের সঙ্গে স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে দ্বন্দ্ব ছিল। এর মধ্যে একজন ঢাকা দক্ষিণের আওয়ামী লীগের নেতা ও একটি ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর। অপর দুজন হলেন ঢাকা দক্ষিণের আরেকটি ওয়ার্ডের বর্তমান কাউন্সিলর ও যুবলীগ নেতা।

তবে এজিবি কলোনিকেন্দ্রিক তৎপরতার বিষয়ে ওয়াকিবহাল একাধিক সূত্র বলছে, এজিবি কলোনির সামনের সড়কে শতাধিক দোকানঘর তৈরি করা হয়েছে। আদালতের এক আদেশের পরিপ্রেক্ষিতে অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধা পরিবার কল্যাণ বহুমুখী সমবায় সমিতির নামে এসব দোকান করা হয়, যা সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করতেন জাহিদুল। সেখানে দোকান নিয়ে জাহিদুল একটি রেস্তোরাঁ করেন। ওই বাজারে তাঁর একটি ওষুধের দোকানও আছে। ওই কাঁচাবাজারে অনেক আগে থেকে যেসব দোকান ছিল, এমন ৭৪টি অবৈধ দোকানে সিটি করপোরেশন তালা ঝুলিয়ে দেয়। ওই সব দোকান নিয়ন্ত্রণকারীদের সন্দেহ, জাহিদুল এটা করিয়েছেন। তবে এসব বিরোধের কারণে তাঁকে হত্যা করা হয়েছে —সেটা মনে করেন না জাহিদুলের ঘনিষ্ঠ অনেকে।

ওই এলাকার অপরাধজগতের বিষয়ে জানাশোনা আছে, সরকারি দলের ঢাকা দক্ষিণের এমন একজন নেতা প্রথম আলোকে বলেন, একজন মানুষকে ছোটখাটো কোনো কারণে হত্যা করা হয় না। এর সঙ্গে অনেক পুরোনো দ্বন্দ্বের পাশাপাশি স্বার্থসংশ্লিষ্ট নতুন হিসাব-নিকাশও জড়িত থাকতে পারে।

এ ছাড়া ২০১৩ সালের ঢাকা মহানগর যুবলীগ দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক রিয়াজুল হক খানকে (মিল্কি) হত্যা মামলায় অন্যদের সঙ্গে জাহিদুলও আসামি ছিলেন। একসময় এই রিয়াজুল, যুবলীগ নেতা এইচ এম জাহিদ সিদ্দিক (তারেক) ও জাহিদুল ইসলাম মতিঝিল-শাহজাহানপুর এলাকার অপরাধজগৎ নিয়ন্ত্রণ করতেন। রিয়াজুলকে হত্যার পর পরদিনই র‌্যাবের এক ক্রসফায়ারে নিহত হন তারেক। জাহিদুল পরে এ মামলা থেকে অব্যাহতি পান।

অপরাধজগতের খোঁজ রাখে, এমন সূত্রগুলোর মতে, অপরাধজগতে রিয়াজুল হকের হত্যার অধ্যায় শেষ হয়ে যায় তারেক নিহত হওয়ার পর। এরপর একপর্যায়ে জাহিদুল ইসলাম এলাকায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি মূলত টাকাপয়সা আসে, এমন খাতগুলো নিয়ে বেশি আগ্রহী ছিলেন। তিনি মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের গভর্নিং বডির নির্বাচিত সদস্য ছিলেন। ওই স্কুলকেন্দ্রিক নানা বিষয়ের নিয়ন্ত্রণও তাঁর হাতে ছিল।

পুলিশের একটি সূত্র জানায়, ২০১৬ সালে এজিবি কলোনিতে যুবলীগের কর্মী রিজভী হাসান ওরফে বোঁচা বাবুকে গুলি করে হত্যা করা হয়, যিনি জাহিদুল ইসলামের ঘনিষ্ঠ ছিলেন। অভিযোগ আছে, জাহিদুলের পরামর্শে সেই সময় তাঁর প্রতিপক্ষ গ্রুপের কয়েকজনকে এ হত্যা মামলায় আসামি করে নিহত রিজভী হাসানের পরিবার, যাঁরা এখন জামিনে মুক্ত আছেন। এ বিরোধকেও তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বিবেচনায় রেখেছেন বলে জানা গেছে।

তবে পুলিশের মতিঝিল বিভাগের উপকমিশনার আবদুল আহাদ প্রথম আলোকে বলেন, হত্যার পেছনে একাধিক কারণ ধরে কাজ করছে পুলিশ। হামলাকারীদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

দেড় মিনিটেই হত্যা

বৃহস্পতিবার রাতে জাহিদুল ইসলাম যখন বাসায় ফিরছিলেন, তাঁর গাড়িতে চালক মনির হোসেন ছাড়াও ছিলেন দুই বন্ধু মিজানুর রহমান ও কালাম। চালকের পাশের আসনে বসে ছিলেন জাহিদুল। আর পেছনের আসনে দুই বন্ধু বসে ছিলেন।

মতিঝিল থেকে রওনা হয়ে সাত থেকে আট মিনিটের মধ্যে গাড়িটি শাহজাহানপুরের আমতলা মসজিদ এলাকায় এসে যানজটে আটকে যায়। এরপর একটি মোটরসাইকেলের পেছন থেকে হেলমেট পরা এক যুবক নেমেই জাহিদুলকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়তে থাকেন। জাহিদুলের শরীরে অনেকগুলো গুলি লাগে। চালকও গুলিবিদ্ধ হন। পেছনের আসনে বসা দুজন অক্ষত আছেন। তাঁদের একজন মিজানুর রহমান এই প্রতিবেদককে বলেন, গাড়িটি ঘটনাস্থলে আসা মাত্রই এক যুবক গুলি ছুড়তে থাকেন। পুরো ঘটনা ঘটেছে এক থেকে দেড় মিনিটের মধ্যে।

পুলিশ কর্মকর্তাদের ধারণা, খুনিরা মতিঝিল এজিবি কলোনি এলাকা থেকেই জাহিদুলের গাড়ি অনুসরণ করছিল। সিসি ক্যামেরার ফুটেজে হামলাকারী হিসেবে একটা মোটরসাইকেলে দুজনকে দেখা গেলেও আশপাশে তাদের এক বা একাধিক গ্রুপ ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।

‘চাচা, আপনাকে মেরে ফেলবে’

চার থেকে পাঁচ দিন আগে জাহিদুল ইসলামের মুঠোফোনে একটা কল এসেছিল। ফোনের অপর প্রান্ত থেকে জাহিদুলকে বলা হয়, ‘চাচা, আপনাকে মেরে ফেলবে’। তথ্যপ্রযুক্তি বিশ্লেষণে কথোপকথনের এ অংশ পেয়েছে পুলিশ। ওই ব্যক্তির সন্ধান পেলে হত্যার পেছনের আরও বিষয় জানা যাবে বলে মনে করছেন তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

এ ঘটনায় বেশ কিছু আলামত ও তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছে র‍্যাব। গতকাল র‍্যাবের আইন ও গণমাধ্যমে শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, দ্রুত সময়ে হত্যাকারীকে আইনের আওতায় আনা হবে।

লাশ হস্তান্তর, দাফন

ময়নাতদন্ত শেষে গতকাল বেলা দুইটার দিকে পরিবারের কাছে জাহিদুলের মরদেহ হস্তান্তর করা হয়। পৌনে তিনটার দিকে মতিঝিল সরকারি কলোনি ঈদগাহ মাঠে জাহিদুলের জানাজা হয়। পরে মরদেহ ফেনী সদর উপজেলার ফতেহপুরে তাঁর গ্রামের বাড়িতে নেওয়া হয়। রাত সোয়া নয়টায় পারিবারিক কবরস্থানে তাঁর লাশ দাফন করা হয়।

এদিকে গতকাল সন্ধ্যায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান তাঁর ধানমন্ডির বাসায় সাংবাদিকদের বলেছেন, এ হত্যার রহস্য উন্মোচনে ডিবি ও র‌্যাব তদন্ত শুরু করেছে। এতে জড়িত ব্যক্তিরা যে–ই হোক, কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। নেপথ্যে থেকে যদি কেউ কলকাঠি নেড়ে থাকে, তাদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন