ইসি কতটা পারবে নির্ভর করছে নির্বাচনী সরকারের ওপর

জাতীয় ঐকমত্য ছাড়া আগামী জাতীয় নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার না করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশিষ্টজনদের অনেকে।

কাজী হাবিবুল আউয়াল

নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সংলাপে দেশের বিশিষ্টজনেরা বলেছেন, আইন ও সংবিধানে দেওয়া ক্ষমতা ইসি ব্যবহার করতে পারবে কি না, তা অনেকখানি নির্ভর করে নির্বাচনকালীন সরকারের ওপর। কিন্তু দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। তাঁদের মতে, সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে আইন ও সংবিধানে পরিবর্তন প্রয়োজন হলে ইসি সরকারকে সেটা করার প্রস্তাব করতে পারে। সুষ্ঠু নির্বাচন করা সম্ভব নয়, এমনটি মনে হলে পদত্যাগ করার মানসিকতাও থাকতে হবে।

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে গতকাল মঙ্গলবার নির্বাচন ভবনে দেশের বিশিষ্টজনদের সঙ্গে এই সংলাপ করে ইসি। এতে ৩৯ জনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে ১৯ জন অংশ নেন। অবশ্য এর মধ্যে দুজন দেশের বাইরে আছেন।

গতকালের সংলাপে জাতীয় ঐকমত্য ছাড়া নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার না করা, জাতীয় নির্বাচনের চার মাস আগে থেকে ফলাফলের পরের দুই মাস পর্যন্ত প্রশাসনকে ইসির নিয়ন্ত্রণে আনা, ভোটের আগে সংসদ অকার্যকর রাখা, ভোটারদের বাধাহীনভাবে ভোটদানের অধিকার নিশ্চিত করা, ভোটের আগে-পরে ভোটারদের বিশেষ করে নারী ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, নির্বাচনে ধর্মের ব্যবহার বন্ধ করা, রাজনৈতিক দলের নিবন্ধনের শর্ত শিথিল করাসহ বিভিন্ন সুপারিশ এসেছে।

সংলাপ শেষে সিইসি কাজী হাবিবুল আউয়াল সাংবাদিকদের বলেন, বিশিষ্টজনদের পরামর্শগুলো ইসি পর্যালোচনা করবে। এখান থেকে নতুন কিছু আইন, কর্মপদ্ধতি তাঁদের কর্মপরিকল্পনায় সংযোজন করা গেলে এবং এতে যদি নির্বাচন আরও অধিক গ্রহণযোগ্য, অবাধ ও স্বচ্ছ হয়, তাহলে সফলতা আসবে।

সংলাপে অংশ নিয়ে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, নির্বাচন কমিশন গঠনে করা অনুসন্ধান কমিটি যদি ১০ জনের নাম প্রকাশ করত, তাহলে এই কমিশনের ওপর জনগণের আস্থা বাড়ত। বর্তমান কমিশনের কেউ কেউ তাঁদের ‘কানেকশনের’ কারণে প্রশ্নবিদ্ধ। যেমন নির্বাচন কমিশনার মো. আলমগীর চরম ব্যর্থ কমিশনের সচিব ছিলেন। নির্বাচন কমিশনার আনিছুর রহমানের শ্বশুর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি।

নির্বাচনের সময় এমন একটি সরকার থাকতে হবে, যারা নির্বাচনের ফলাফলের ব্যাপারে নিস্পৃহ হবে।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, বিশেষ ফেলো, সিপিডি

‘দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়’ এবং ‘নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার না করা ভালো’ বলে মন্তব্য করেন জাফরুল্লাহ চৌধুরী। তিনি গণসংহতি আন্দোলন ও নাগরিক ঐক্যকে নিবন্ধন দেওয়ার পরামর্শ দেন। একই সঙ্গে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া নির্বাচন করতে পারবেন কি না, সেটা জানতে চান।

নির্বাচনকালীন সরকারের গুরুত্ব তুলে ধরে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনের অভিজ্ঞতা হলো; নির্বাচন কমিশন আইন ও সংবিধানে দেওয়া ক্ষমতা ব্যবহার করতে পারবে কি না, তা অনেকখানি নির্ভর করে নির্বাচনকালীন সরকার কী হবে, তার ওপর। নির্বাচনের সময় এমন একটি সরকার থাকতে হবে, যারা নির্বাচনের ফলাফলের ব্যাপারে নিস্পৃহ হবে।

নির্বাচন কমিশনের ওপর মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা বড় চ্যালেঞ্জ উল্লেখ করে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, সংবিধান ও আইনে দেওয়া ক্ষমতা ইসিকে কার্যকরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। ইসিকে দেখতে হবে, সরকার নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক বিবেচনায় যেভাবে পুলিশ ও প্রশাসনে নিয়োগ পদায়ন করে, ইসি তা বদলাতে পারবে কি না, বিদেশি পর্যবেক্ষকেরা আসতে পারবেন কি না। তিনি নির্বাচনপূর্ব ও নির্বাচনোত্তর সহিংসতার বিষয়ে নজরদারি বাড়ানো, সংখ্যালঘু, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী ও দুর্গম এলাকার ভোটারদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করার পরামর্শ দেন।

নির্বাচন কমিশনকে ভোটারদের সামনে একটি অঙ্গীকারনামা দেওয়ার পরামর্শ দেন দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন যদি কাজ করতে না পারে, তাহলে তাদের পদত্যাগ করার সাহস থাকতে হবে।’

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, নির্বাচনকালীন সরকারের আচরণের ওপর নির্ভর করে ভোট কতটা সুষ্ঠু হবে। নির্বাচনকালীন সরকারের আচরণ এমন হতে হবে, যা সবার কাছে গ্রহণযোগ্য। এটি করতে আইন, সংবিধানের পরিবর্তন আনার প্রয়োজন আছে কি না, সংসদ বহাল রেখে নির্বাচন করা বর্তমান বাস্তবতায় কতটা যৌক্তিক—এসব দেখতে হবে। ইসির উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আপনারা যদি মনে করেন, কনভিন্সড হন যে এই পরিবর্তনগুলো না হলে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়, তাহলে ইস্তফা দিন। দৃষ্টান্ত স্থাপন করুন। অংশীজনদের ওপর চাপ সৃষ্টি করুন। জনগণ আপনাদের পাশে দাঁড়াবে।’

নির্বাচন কমিশন এখন সরকারি প্রতিষ্ঠানে রূপ নিয়েছে। এটি এখন আর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান নেই। তাদের আনুগত্য সরকারের প্রতি, রাষ্ট্রের প্রতি নয়।
ইফতেখারুজ্জামান, নির্বাহী পরিচালক, টিআইবি

ইফতেখারুজ্জামান বলেন, যে কারণেই হোক নির্বাচন কমিশন এখন সরকারি প্রতিষ্ঠানে রূপ নিয়েছে। এটি এখন আর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান নেই। তাদের আনুগত্য সরকারের প্রতি, রাষ্ট্রের প্রতি নয়।

‘ইভিএম সব সময় সব দেশে বিতর্কিত’ মন্তব্য করে আগামী জাতীয় নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার না করার ‘জোর সুপারিশ’ করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ফরাসউদ্দিন। তিনি বলেন, ভোটের সময় মূল ভরসা হলো মাঠ প্রশাসন। জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করার চার মাস আগে থেকে ভোটের দুই মাস পর পর্যন্ত প্রশাসনে নিয়োগ-বদলি ইসির নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। ২০২৩ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে চার মাসের জন্য সংসদ অকার্যকর রাখতে সরকারকে পরামর্শ দেওয়ার জন্য ইসিকে প্রস্তাব করেন তিনি।

ভারতের উদাহরণ দিয়ে সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার বলেন, দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন সম্ভব। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে গত দুটি নির্বাচন এটি প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছে।

ভালো নির্বাচনের জন্য সাহসী নির্বাচন কমিশন দরকার বলে মনে করেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক নজরুল ইসলাম। তিনি বলেন, ইচ্ছা থাকলে ভালো নির্বাচন করা সম্ভব, তা নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দেখা গেছে।

সিপিডির বিশেষ ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, নির্বাচন পর্যবেক্ষকেরা যাতে কাজ করতে পারেন, তা নিশ্চিত করতে হবে। ভোটের আগে-পরে ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, দলীয় সরকারের অধীনে সর্বশেষ সুষ্ঠু নির্বাচন হয়েছে ১৯৫৪ সালে। যারা ক্ষমতায় থাকে, তারা যদি নির্বাচনে অংশ নেয়, তাহলে সে নির্বাচন অবাধ হয় না।

মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম বলেন, প্রত্যেক নাগরিক যেন নির্ভয়ে ভোট দিতে পারেন, তা নিশ্চিত করতে হবে। নারী, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, প্রতিবন্ধী, দুর্গম এলাকার ভোটারদের বিষয়ে বিশেষ নজর দিতে হবে।

লিডারশিপ স্টাডিজ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান সিনহা এম এ সাঈদ বলেন। নির্বাচনকালীন সরকারের সহায়তা না থাকলে ভালো নির্বাচন করা সম্ভব নয়।

আলোচনার সারসংক্ষেপ তুলে ধরে সিইসি কাজী হাবিবুল আউয়াল বলেন, শতভাগ সাফল্য হয়তো আসবে না, কেউ কেউ বলেছেন ৫০-৬০ শতাংশও যদি গ্রহণযোগ্য হয়, তাহলে সেটাও বড় সাফল্য। তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশনের বিধিবিধানের অভাব নেই। কিন্তু বাস্তব প্রয়োগে ঘাটতি আছে। ‘এনফোর্সমেন্ট ক্যাপাসিটি’ আরও বাড়াতে তাঁরা সচেষ্ট হবেন। এটি করা গেলে তৃণমূলে ভোটারদের মধ্যে আস্থা সৃষ্টি হবে। ইভিএমের প্রতি আস্থা নিয়ে কথা উঠেছে। ইভিএমে ভালো দিক রয়েছে, দ্রুত গণনা হয়ে যায়। কিন্তু পুনর্গণনার সমস্যা রয়েছে। ইভিএমে কোনো অসুবিধা আছে কি না, মেশিনের মাধ্যমে ভোটে কোনো ডিজিটাল কারচুপি হয় কি না—এগুলো ইসিকে দেখতে হবে।

সংলাপে আরও যাঁরা বক্তব্য দেন তাঁদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক সচিব মহিউদ্দিন আহমেদ, আবদুল লতিফ মণ্ডল ও আবু আলম মো. শহীদ খান, নিজেরা করির সমন্বয়ক খুশী কবির, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস, অধ্যাপক শামীম রেজা, অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং, গভর্নেন্স অ্যান্ড রাইট সেন্টারের সভাপতি জহুরুল আলম। সংলাপে যেতে না পারলেও নিজের মতামত লিখিতভাবে ইসিকে পাঠিয়ে দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এম এম আকাশ।

সিইসি কাজী হাবিবুল আউয়ালের সঙ্গে ছিলেন নির্বাচন কমিশনার আহসান হাবিব খান, রাশেদা সুলতানা ও মো. আলমগীর।

আমন্ত্রিত হয়েও আসেননি যাঁরা

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এম হাফিজউদ্দিন খান, ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ, মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম, রোকিয়া আফজাল রহমান, সুলতানা কামাল, আবদুল মুয়ীদ চৌধুরী, রাশেদা কে চৌধূরী ও হোসেন জিল্লুর রহমান, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের বঙ্গবন্ধু চেয়ার সৈয়দ আনোয়ার হোসেন, সিপিডির সম্মানিত ফেলো অধ্যাপক রওনক জাহান, ঢাকা স্কুল অব ইকোনমিকসের চেয়ারম্যান কাজী খলীকুজ্জমান, আইনজীবী শাহদীন মালিক, স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ তোফায়েল আহমেদ, সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবুল বারকাত, বাংলাদেশ হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ওয়ালিউর রহমান, সাবেক রাষ্ট্রদূত এ এফ এম গোলাম হোসেন, অধ্যাপক আমেনা মহসিন, অধ্যাপক কাবেরী গায়েনকে ইসি গতকালের সংলাপে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। তবে তাঁরা সংলাপে অংশ নেননি।

জাতীয় নির্বাচন সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য করার লক্ষ্যে অংশীজনদের পরামর্শ নিতে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে এই সংলাপ করছে ইসি। এর আগে ১৩ মার্চ শিক্ষাবিদদের সঙ্গে সংলাপ করে ইসি। আগামী এ মাসের শেষে জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকদের সঙ্গে সংলাপ হবে বলে ইসি সূত্রে জানা গেছে।