কুমিল্লা দক্ষিণ আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক কমিটি নয় বছর আগের। আর উত্তরের কমিটি ১৮ বছরের। দলীয় কর্মসূচিতেও নেতাদের তেমন উপস্থিতি থাকে না। সর্বশেষ ২৩ জুন দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে দক্ষিণ জেলার আলোচনা সভায় কমিটির অর্ধশত সদস্যের মধ্যে মাত্র চারজন উপস্থিত ছিলেন। আর উত্তর জেলা কমিটির কোনো কর্মসূচিই ছিল না। দলের এমন অবস্থায় হতাশ তৃণমূল পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা। দীর্ঘদিন কমিটি না হওয়ায় তাঁদের মধ্যে রয়েছে ক্ষোভ ও অসন্তোষ।
আদর্শ সদর, সদর দক্ষিণ, বরুড়া, লাকসাম, চৌদ্দগ্রাম, নাঙ্গলকোট, বুড়িচং, ব্রাহ্মণপাড়া ও মনোহরগঞ্জ উপজেলা নিয়ে দক্ষিণ জেলা কমিটি। আর উত্তর জেলা কমিটিভুক্ত উপজেলাগুলো হলো মুরাদনগর, চান্দিনা, দেবীদ্বার, দাউদকান্দি, হোমনা, মেঘনা ও তিতাস।
কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা: দলীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০০৬ সালের ১২ মে আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা ৫৪ সদস্যবিশিষ্ট কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা আহ্বায়ক কমিটির অনুমোদন দেন। এতে বর্তমান পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালকে আহ্বায়ক এবং রেলমন্ত্রী মো. মুজিবুল হক ও শহর আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সফিকুল ইসলাম শিকদারকে যুগ্ম আহ্বায়ক করা হয়। দল ক্ষমতায় এলে ২০০৯ সালের শুরুতে আফজল খানকে যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ফলে আহ্বায়ক কমিটির সদস্যসংখ্যা ৫৫ জনে দাঁড়ায়। এঁদের মধ্যে পাঁচজন মারা গেছেন। শারীরিকভাবে অসুস্থ দুজন, ঢাকায় অবস্থান করছেন ছয়জন। কমিটির বেশির ভাগ সদস্য উপজেলা পর্যায়ের নেতা।
দলীয় সূত্রগুলো বলছে, দলের আহ্বায়ক আ হ ম মুস্তফা কামাল বড় কর্মসূচি থাকলে দলীয় কার্যালয়ে আসেন। ২০১২ সালের ৮ ডিসেম্বর এবং চলতি বছরের ১৭ জানুয়ারি তাঁর গ্রামের বাড়ি সদর দক্ষিণ উপজেলার বাগমারা উত্তর ইউনিয়নে দলের বর্ধিত সভা হয়। দিবসভিত্তিক কিছু কর্মসূচি ছাড়া এখানে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কোনো কার্যক্রম নেই। আর দিবসভিত্তিক কর্মসূচি পালিত হয় দায়সারাভাবে। তার একটা বড় উদাহরণ দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী অনুষ্ঠানে জেলা আহ্বায়ক কমিটির মাত্র চারজন নেতার উপস্থিতি।
এ বিষয়ে আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠান মহানগর কমিটি করবে। যেহেতু মহানগর কমিটি নেই, তাই জেলা কমিটির কয়েকজন সদস্য ওই কর্মসূচি পালন করেন। শিগগিরই মহানগর কমিটি গঠন করা হবে। এরপরই জেলা কমিটি হবে। তিনি বলেন, ‘যাঁরা দলের মধ্যে গ্রুপিং করেন, তাঁদের এখন দৈন্যদশা। তাঁরা দেউলিয়া। দলকে সাংগঠনিকভাবে চাঙা করার জন্য সব ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।’
দলের তৃণমূল পর্যায়ে সক্রিয় অন্তত ১৫ জন নেতা-কর্মীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, একসময় কুমিল্লা-৬ (আদর্শ সদর) আসনের সাংসদ আ ক ম বাহাউদ্দিন ও দলের যুগ্ম আহ্বায়ক আফজল খানের মধ্যে দ্বন্দ্ব ছিল। এরপর জেলা ছাত্রলীগের কমিটি নিয়ে মো. মুজিবুল হকের সঙ্গে বাহাউদ্দিনের দ্বন্দ্ব শুরু হয়। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি সংসদ নির্বাচনে বাহাউদ্দিনের বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন আফজল খানের ছেলে জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য মাসুদ পারভেজ খান। বাহাউদ্দিনের দাবি, তাঁকে ঠেকানোর জন্য আফজল খানের ছেলেকে নির্বাচনে দাঁড় করান রেলমন্ত্রী। এরপর থেকে ওই দ্বন্দ্ব বাড়তে থাকে। বাহাউদ্দিনের অনুসারীরা আফজল খানের দুই ছেলের বিরুদ্ধে একাধিক মামলাও দেন। আফজল খানও সাংসদের অনুসারীদের বিরুদ্ধে পাল্টা মামলা দেন। দুই পক্ষের দ্বন্দ্বের জের ধরে গত ১১ এপ্রিল নিহত হন বাহাউদ্দিনের অনুসারী কুমিল্লা শহর ছাত্রলীগের সভাপতি সাইফুল ইসলাম। এ ঘটনায় আফজল খানের দুই ছেলের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দেওয়া হয়েছে। দলীয় সাংসদ বাহাউদ্দিনকে এখনো জেলার সদস্য করা না হলেও নগরের রামঘাটে দলের কার্যালয় তাঁরই নিয়ন্ত্রণে। সন্ধ্যার পর তাঁর কিছু কর্মী সেখানে বসেন।
এসব বিষয়ে বক্তব্য জানতে মুঠোফোনে সাংসদ আ ক ম বাহাউদ্দিনের কাছে সময় চাইলে তিনি জানিয়ে দেন, প্রথম আলোর সঙ্গে কোনো কথা বলবেন না। সাক্ষাৎও দেবেন না তিনি। তবে তাঁর অন্যতম অনুসারী দক্ষিণ জেলার যুগ্ম আহ্বায়ক সফিকুল ইসলাম শিকদার বলেন, জেলা ও মহানগর কমিটি দ্রুত হওয়া দরকার। কমিটি না হওয়ায় হতাশ কর্মীরা।
এদিকে শহর ছাত্রলীগের সভাপতি সাইফুল ইসলাম হত্যার পর থেকে যুগ্ম আহ্বায়ক রেলমন্ত্রী মো. মুজিবুল হক শহরের নজরুল অ্যাভিনিউয়ের ব্যক্তিগত কার্যালয়ে যান না। আগে তাঁর সমর্থিত নেতা-কর্মীদের ভিড়ে সব সময় সরব থাকত এ কার্যালয়।
মুজিবুল হক সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন থাকায় তাঁর সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি। তবে তাঁর ঘনিষ্ঠ ও আহ্বায়ক কমিটির সদস্য শাহিনুল ইসলাম দাবি করেন, কুমিল্লায় দলকে সাংগঠনিকভাবে ধরে রেখেছেন মুজিবুল হক।
উত্তর জেলা: কুমিল্লা উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সর্বশেষ সম্মেলন হয় ১৯৯৭ সালে। ওই সম্মেলনে কুমিল্লা-৭ (চান্দিনা) আসনের সাংসদ মো. আলী আশরাফ সভাপতি এবং মুরাদনগর উপজেলার বাসিন্দা জাহাঙ্গীর আলম সরকারকে সাধারণ সম্পাদক করে ৬৮ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি গঠন করা হয়। ইতিমধ্যে এ কমিটির তিনজন মারা গেছেন।
আলী আশরাফ ২০০০ সালে ডেপুটি স্পিকার হওয়ার পর সভাপতির পদ ছেড়ে দেন। এরপর জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি আবদুল আউয়াল সরকার ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব পান। কিন্তু তিনি থাকেন ঢাকায়।
আলী আশরাফ প্রথম আলোকে বলেন, ‘উত্তরে দলের কমিটি গঠনের জন্য বেশ কয়েকবার তাগাদা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা আর হয়নি।’
সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম সরকার টানা ২৩ বছর সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে আছেন। তিনি চারবার জাতীয় সংসদ নির্বাচন করে প্রতিবারই হেরেছেন। বর্তমানে কুমিল্লা উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কার্যক্রম চলে চান্দিনা থেকে। চান্দিনা তরকারি বাজারের লাগোয়া একটি ভবনে উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সাইনবোর্ড ঝোলানো আছে। সেখানে নিয়মিত বৈঠক হয় না। গত ২৩ জুন দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে কোনো কর্মসূচি ছিল না বলে জানিয়েছেন দপ্তর সম্পাদক নির্মল চন্দ্র দাস।
জাহাঙ্গীর আলম সরকার প্রথম আলোকে বলেন, কমিটির অধিকাংশ সদস্য নিষ্ক্রিয়। কেউ মারা গেছেন, কেউ বিদেশে চলে গেছেন। এ অবস্থায় কমিটি গঠনের বিকল্প নেই।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন