default-image

চলমান অবরোধ-হরতালে শৈথিল্য দেখা দেওয়ায় আন্দোলন কর্মসূচির ধরন পাল্টাচ্ছে বিএনপি। এর অংশ হিসেবে কাল শনিবার সারা দেশে বিক্ষোভ মিছিলের কর্মসূচি দেওয়া হয়েছে। আন্দোলনের গতি বাড়াতে এ কর্মসূচি দেওয়া হয়েছে বলে বিএনপি ও ২০-দলীয় জোটের দায়িত্বশীল সূত্রগুলো জানিয়েছে।
বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া গত বুধবার বার্তা সংস্থা এএফপিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, চলমান সংকট থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ হলো সবার অংশগ্রহণে একটি অর্থপূর্ণ নির্বাচন। যত দ্রুত এই নির্বাচন করা সম্ভব হবে, ততই সবার জন্য মঙ্গল হবে। নির্বাচন যত দেরি হবে, চলমান সংকট ততই জটিল হবে।
এই সাক্ষাৎকারে বিএনপির চেয়ারপারসন নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন আয়োজনের পথ উন্মুক্ত করে দিতে সরকারের পদত্যাগের দাবি পুনর্ব্যক্ত করেন। তবে তিনি এ-ও বলেন, এ বিষয়ে আলোচনা ও সমঝোতার সুযোগ রয়েছে। এ জন্য সরকারের প্রতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও শক্তিশালী ও কার্যকর চাপ প্রয়োগ করা এবং আবারও জাতিসংঘের উদ্যোগ নেওয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি।
বিএনপিদলীয় একাধিক সূত্র জানায়, রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের জেলা, উপজেলা ও মহানগরের সব ওয়ার্ডে শনিবার শান্তিপূর্ণভাবে মিছিল করার জন্য নেতা-কর্মীদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। মিছিলে বাধা দিলে রোববার থেকে আবারও সারা দেশে ৭২ ঘণ্টার হরতাল ঘোষণা করা হতে পারে।
শনিবারের বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘোষণা করে গতকাল গণমাধ্যমে পাঠানো বিবৃতিতে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সালাহ উদ্দিন আহমদ বলেছেন, দাবি মানা না হলে রোববার থেকে চলমান অবরোধের সঙ্গে ‘সর্বাত্মক’ হরতালসহ আরও কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।
বিএনপি ও জোটের একাধিক নেতা জানান, ৩৮ দিনের টানা অবরোধের পাশাপাশি একের পর এক হরতাল সত্ত্বেও আন্দোলনে শিথিলতা ও একঘেয়ে ভাব দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে রাজধানীতে জনজীবন প্রায় স্বাভাবিক এবং অনেক জেলা শহরেও হরতালের প্রভাব কাটতে শুরু করেছে। এই অবস্থায় অবরোধ অব্যাহত রেখে হরতালের বিকল্প মাঠের কর্মসূচি গ্রহণের পরামর্শ আসে।
জোটের নীতিনির্ধারকেরা মনে করছেন, অবরোধ-হরতালে দেশের বিভিন্ন স্থানে সহিংসতা ও পেট্রলবোমা হামলায় নিরীহ মানুষের প্রাণহানি নতুন সংসদ নির্বাচনের ন্যায্য দাবির আন্দোলনকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। সরকার ও সরকার-সমর্থক সংবাদমাধ্যমগুলো সহিংসতার পুরো দায়ভার বিএনপি ও জামায়াতের ওপর চাপিয়েছে। এই অবস্থায় আন্দোলনকে রাজনৈতিক রূপ দিয়ে আবার মাঠে ফেরাতে বিক্ষোভ মিছিলের কর্মসূচি দেওয়া হয়েছে।
খালেদার কার্যালয়ে খাবার যায়নি: বিএনপির চেয়ারপারসনের গুলশান কার্যালয়ে গতকালও খাবার যায়নি। কার্যালয়ে অবস্থানরত তাঁর কর্মকর্তা ও নিরাপত্তারক্ষীরা শুকনো খাবার খেয়ে দিন কাটিয়েছেন।
কার্যালয়ে অবস্থানরত বিএনপির চেয়ারপারসনের প্রেস উইংয়ের সদস্য শামসুদ্দিন দিদার প্রথম আলোকে বলেন, বুধবার রাতে খাবার নিতে বাধা দেওয়ার ঘটনা শুনে খালেদা জিয়া তাঁর কার্যালয়ে অবস্থানরত ব্যক্তিদের খোঁজখবর নিয়েছেন। তিনি নিজে সবাইকে খোরমা-খেজুর ও মুড়ি দিয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বুধবার রাত আটটায় ওই কার্যালয়ে অবস্থানরত ব্যক্তিদের জন্য খাবার এলেও পুলিশ খাবারের ভ্যানটি ফেরত পাঠিয়ে দেয় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এরপর গতকাল সকালের নাশতা, দুপুর ও রাতের খাবারও ভেতরে নিতে দেওয়া হয়নি। তবে পুলিশ খাবার পাঠিয়ে দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
দলীয় সূত্র জানায়, পুলিশ খাবার নিতে বাধা দেওয়ার পর গতকাল কার্যালয়ের ভেতরেই সাদামাটা রান্নার ব্যবস্থা করা হয়। এ ছাড়া কার্যালয়ে গতকাল বিকেলে আরাফাত রহমান কোকোর রুহের মাগফিরাত কামনা করে দোয়ার পর তবারক দেওয়া হয়। অনেকে সেটা খেয়েছেন।
বিএনপির চেয়ারপারসনের প্রেস সচিব মারুফ কামাল খান বলেন, ‘শুকনো খাবার, ফলমূল, জুস ইত্যাদি খেয়ে এ পর্যন্ত আছি। এই কার্যালয়ে যাঁরা আছেন, তাঁরাও একইভাবে শুকনো খাবার খেয়ে আছেন।’
সালাহ উদ্দিন আহমদ গতকাল বিবৃতিতে অভিযোগ করেন, বুধবার রাতে বিএনপির চেয়ারপারসনের কার্যালয়ের খাবার ও পানি সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে পুলিশ। ভাতে মারার, পানিতে মারার নীতি অবলম্বন করে বিদ্যুৎ, টেলিফোন, ইন্টারনেট, কেব্লসহ সব যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে শেখ হাসিনা নিষ্ঠুর কায়দায় খালেদা জিয়াকে হত্যার ষড়যন্ত্র করে যাচ্ছেন।
নিহত ছাত্রদল নেতার মা-বাবা ও স্ত্রীকে আটক: গতকাল রাত সাড়ে আটটার দিকে খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে পুলিশের হাতে আটক হন রাজধানীর খিলগাঁওয়ে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত ছাত্রদল নেতা নুরুজ্জামানের (জনি) পরিবারের তিন সদস্য। কার্যালয়ের সামনে থেকে নুরুজ্জামানের বাবা ইয়াকুব আলী এবং মা ও স্ত্রীকে পুলিশ আটক করে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান।
গুলশান থানার কর্তব্যরত কর্মকর্তা ফেরদৌস প্রথম আলোকে জানান, ওই তিনজনকে গোয়েন্দা পুলিশ গুলশান থানায় নিয়ে গেলেও পরে ছেড়ে দেওয়া হয়। এর আগে কার্যালয়ের সামনে থেকে ছাত্রদল নেত্রী সেলিনা সুলতানাকে পুলিশ আটক করে।
এ ছাড়া রুহুল আমিন গাজী এবং এম এ আজিজের নেতৃত্বে বিএনপিপন্থী সাংবাদিক নেতাদের একটি দল খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করতে চাইলে পুলিশ ঢুকতে দেয়নি।
ঘেরাও: গতকাল খালেদা জিয়ার গুলশান কার্যালয় ঘেরাও কর্মসূচি পালন করেছেন ‘আমরা মুক্তিযোদ্ধার সন্তান’ নামের একটি সংগঠনের ঢাকা মহানগর কমিটির নেতা-কর্মীরা। দুপুর ১২টার দিকে সংগঠনটির ৩০-৪০ জন নেতা-কর্মী কার্যালয়ের সামনের রাস্তায় দাঁড়িয়ে হরতাল, অবরোধ ও নাশকতার প্রতিবাদ জানান। এ ছাড়া ওই কার্যালয়ের আধা কিলোমিটার দূরে গুলশান ২ নম্বর মোড়ে সমাবেশ করে স্বেচ্ছাসেবক লীগ।

বিজ্ঞাপন
রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন