default-image

গত ছয় বছরে রাজনৈতিক হত্যার শিকার হয়েছেন ২৯ জনপ্রতিনিধি। এঁদের মধ্যে ২২ জন আওয়ামী লীগের। এই ২২ জনের ১৮ জন খুন হয়েছেন নিজেদের দলীয় কোন্দলে। বাকি চারজনের মধ্যে দুটি খুনের সঙ্গে বিএনপির জড়িত থাকার অভিযোগ আছে। অপর দুটি খুনের কারণ অজ্ঞাত। এই সময়ে বিএনপি-সমর্থক পাঁচজন জনপ্রতিনিধি খুন হয়েছেন।
নিহত ব্যক্তিরা উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদের জনপ্রতিনিধি ছাড়াও সরকারি দলের স্থানীয় পর্যায়ে জনপ্রিয় অথবা প্রভাবশালী নেতা ছিলেন। তাঁরা খুন হওয়ার পর স্বজনদের মামলার ভিত্তিতে অভিযুক্ত খুনিদের রাজনৈতিক পরিচয় বের করা হয়েছে।
প্রথম আলোর জেলা প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্য, প্রথম আলোয় প্রকাশিত এ-সংক্রান্ত খবর এবং সার্চ ইঞ্জিন গুগলের সহায়তায় পাওয়া তথ্য যাচাই-বাছাই করে এ চিত্র পাওয়া গেছে।
তিন থেকে পাঁচ বছর ধরে বেশির ভাগ মামলার কথিত তদন্ত চলছে। ২৯টি মামলার মধ্যে এ পর্যন্ত অভিযোগপত্র হয়েছে চারটির, একটি মামলা উচ্চ আদালত স্থগিত করেছেন। বিচার শেষ হয়েছে দুটির।
দলীয় কোন্দলে প্রাণ গেল একরামুলের: এ বছরের ২০ মে ফেনীর ফুলগাজী উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি একরামুল হককে হত্যা করা হয়। সরকারি দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে তিনি মারা যান বলে অভিযোগ রয়েছে। জনপ্রিয় এই জনপ্রতিনিধিকে হত্যার পর নৃশংসভাবে পোড়ানো হয়।
ঘুরপাক খাচ্ছে বিথার হত্যা মামলা: মামলার তথ্য অনুযায়ী, খুলনার ওয়ার্ড কমিশনার ও যুবলীগের কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান শহীদ ইকবাল ওরফে বিথার ২০০৯ সালের ১১ জুলাই দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে নিহত হন। সাড়ে পাঁচ বছর ধরে মামলাটি পুলিশ, ডিবি, এসবি এবং সিআইডি তদন্ত করে। স্থানীয় সাংসদ মিজানুর রহমান ও যুবলীগের নেতা এস এম মেজবাহ হোসেনকে অব্যাহতি দেওয়ায় মামলার বাদী নারাজি আবেদন দেন। বিথারের স্ত্রী রুনু রেজা বলেন, ‘ওই আসামিদের নাম বাদ দিলে আমরা উচ্চ আদালতে যেতে বাধ্য হব।’
খুলনায় তিন চেয়ারম্যান খুন: দলীয় কোন্দলের জের ধরে ২০১১ সালের ২ নভেম্বর খুলনার দিঘলিয়া উপজেলার সেনহাটি ইউপি চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের নেতা গাজী আবদুল হালিম এবং গত ৩ জানুয়ারি আওয়ামী লীগের নেতা ও ডুমুরিয়া ধামালিয়া ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত ইউপি চেয়ারম্যান শহীদুল ইসলাম বিশ্বাস খুন হন। ২০১০ সালের ১৬ আগস্ট ফুলতলা উপজেলার দামোদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু সাঈদ বাদলকে হত্যা করা হয়।
বাগেরহাটে দুই আ.লীগ নেতার করুণ পরিণতি: ২০১৩ সালের ১৮ মে বাগেরহাটের ফকিরহাট সদরের ইউপি চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক খান জাহিদ হাসান ও তাঁর মোটরসাইকেলচালক মুন্না শিকদারকে গুলি করে হত্যা করা হয়। স্থানীয় আওয়ামী লীগের বিরোধে খুন হন তিনি। এ মামলার একজন আসামি ছিলেন ফকিরহাট উপজেলা চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগের নেতা সরদার নিয়ামত হোসেন। গত ফেব্রুয়ারিতে উপজেলা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে একজন ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সরদার নিয়ামতকে পিটিয়ে আহত করেন। কিছুদিন পর তিনি মারা যান।
খান জাহিদ হত্যা মামলার প্রায় সব আসামিই স্থানীয় আওয়ামী লীগের। স্থানীয় আওয়ামী লীগের একাংশের অভিযোগ, হত্যা মামলার অর্থ জোগানদাতা ও মদদদাতা কয়েকজনকে বাদ দিয়ে অভিযোগপত্র দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে গোয়েন্দা পুলিশ। জানতে চাইলে জাহিদের স্ত্রী ও উপনির্বাচনে বিজয়ী ইউপি চেয়ারম্যান শিরীনা আক্তার বলেন, ‘হত্যাকারী যেই হোক, আমরা বিচার চাই।’
যশোরে চার খুনের পেছনে আ.লীগ: ছয় বছরে যশোরে চারজন জনপ্রতিনিধি খুন হয়েছেন। এঁদের মধ্যে তিনজনই সরকারি দলের, খুনও হয়েছেন দলীয় কোন্দলে। আরেকজন বিএনপির নেতা হলেও অভিযোগ আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে।
২০১৩ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর চৌগাছা উপজেলার সিংহঝুলি ইউপি চেয়ারম্যান ও যুবলীগের নেতা জিল্লুর রহমান মিন্টু খুন হন। নিহতের স্ত্রী জাকিয়া সুলতানা বলেন, ‘আওয়ামী লীগের সরকার ক্ষমতায় থাকলেও আজ আমরা বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে অসহায়।’
ওই বছরের ২৪ মার্চ শার্শা উপজেলার পুটখালী ইউপি চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহসভাপতি আবদুর রাজ্জাককে ও গত ২৩ নভেম্বর নওয়াপাড়া পৌরসভার কাউন্সিলর ও আওয়ামী লীগের নেতা ওলিয়ার রহমানকে হত্যা করা হয়।
লোকমান হত্যা মামলা স্থগিত: ২০১১ সালের ১ নভেম্বর নরসিংদীর পৌর মেয়র ও শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক লোকমান হোসেনকে হত্যা করা হয়। মামলার এজাহারে উল্লেখ করা ১৪ আসামির মধ্যে ১২ জনই আ.লীগের নেতা-কর্মী। পুলিশ এজাহারভুক্ত ১১ আসামিকে বাদ দিয়ে অভিযোগপত্র দিলে বাদী রিট আবেদন করেন। মামলার কার্যক্রম স্থগিত করেছেন হাইকোর্ট।
কুষ্টিয়ায় তিন ইউপি চেয়ারম্যান খুন: গত ছয় বছরে কুষ্টিয়ার কুমারখালীর কয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জামিল হোসেন ও জগন্নাথপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মুন্সী রশিদুর রহমান খুন হয়েছেন। ২০১২ সালের ২৮ আগস্ট খোকসার আমবাড়িয়া ইউপি চেয়ারম্যান ও খোকসা উপজেলা কৃষক লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক নুরুল ইসলাম এবং তাঁর দুই সঙ্গীকে হত্যা করা হয়। নুরুল ইসলামের মাথা আজও পাওয়া যায়নি।
আরও যাঁরা খুন হয়েছেন: ময়মনসিংহের ধোবাউড়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ফোরকান উদ্দিন সেলিম মৃধা ওরফে পাহাড়ি সেলিম ২০১৩ সালের ১ সেপ্টেম্বর আওয়ামী লীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে নিহত হন।
ক্ষমতায় থেকেও খুনোখুনিনরসিংদীর আলোকবালী ইউনিয়ন পরিষদের ছয়বারের চেয়ারম্যান আবদুর রাজ্জাক সরকার ২০১২ সালের ১৫ এপ্রিল নিহত হন। গত ১৬ জুন ঝিনাইদহ সদর উপজেলার নলডাঙ্গা ইউপি চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগের নেতা রুহুল আমিন বিশ্বাসকে গুলি করে হত্যা করা হয়। গত ২৩ মার্চ আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের ঘটনায় মুন্সিগঞ্জের গজারিয়া উপজেলার বালুয়াকান্দি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সামছুদ্দিন প্রধান নিহত হন। এ বছরের ২১ নভেম্বর রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান ও জেলা কৃষক লীগের সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা মুন্সি নাদের হোসেন নিহত হন।
চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার নলুয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নুরুল আবছার খুন হয়েছেন। ২০১২ সালের ১৪ ডিসেম্বর পিরোজপুরের গৌরীপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আক্তারুজ্জামান খুন হন। এ বছরের ১৮ জানুয়ারি নাটোরের সিংড়া উপজেলার কলম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ফজলুর রহমানকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
লক্ষ্মীপুর সদরের দত্তপাড়ার ইউপি চেয়ারম্যান নুর হোসেনকে ২০১২ সালে হত্যা করা হয়। ২০১০ সালের ১১ অক্টোবর চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদার নাতিপোতা ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মিজানুর রহমানকে স্ত্রী-সন্তানের সামনে কুপিয়ে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা।
{প্রতিবেদনে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন: আবু তাহের (ফেনী), আহাদ হায়দার (বাগেরহাট), মনিরুল ইসলাম (যশোর), তৌহিদী হাসান (কুষ্টিয়া), এম জে আলম (লক্ষ্মীপুর), আজাদ রহমান (ঝিনাইদহ), তানভীর হাসান (মুন্সিগঞ্জ), এজাজ আহম্মেদ (রাজবাড়ী), আরিফ মোস্তফা (পিরোজপুর), শাহ আলম (চুয়াডাঙ্গা) ও পান্না বালা (ফরিদপুর)}

বিজ্ঞাপন
রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন