default-image
>
  • জামায়াতে দুটি ধারা
  • মুক্তিযুদ্ধে জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়ার প্রশ্নে মতবিরোধ
  • সংস্কারপন্থী হিসেবে পরিচিত নেতারা চাপে

একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকা এবং জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়ার প্রশ্নে মতবিরোধের জেরে দলটির সংস্কারপন্থীরা চাপে পড়েছেন। সংস্কারের পক্ষে থাকা দলের কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুর রাজ্জাক পদত্যাগের পর সাবেক কেন্দ্রীয় মজলিশে শুরার সদস্য মুজিবুর রহমানকে (মঞ্জু) বহিষ্কার করা হয়েছে। আবার, জামায়াতকে স্বাধীনতাবিরোধী দল উল্লেখ করে পদত্যাগ করেছেন দিনাজপুরের এক জামায়াত নেতা।

দলীয় সূত্র জানায়, মুক্তিযুদ্ধের সময়কার ভূমিকার জন্য ক্ষমা চাওয়া এবং জামায়াতকে বিলুপ্ত করে নতুন নামে দল করার বিষয়ে যে আলোচনা উঠেছে, সেটার জেরে দলে পক্ষে-বিপক্ষে দুটি ধারা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। গত শুক্রবার আবদুর রাজ্জাকের মতো গুরুত্বপূর্ণ নেতার পদত্যাগের পর দলটিতে সংস্কারপন্থী হিসেবে পরিচিত নেতারা চাপে পড়েছেন। যার বহিঃপ্রকাশ ঘটে জামায়াতের সাবেক কেন্দ্রীয় মজলিশে শুরার সদস্য ও ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি মুজিবুর রহমানকে বহিষ্কারের মধ্য দিয়ে।

শুক্রবার রাতে বহিষ্কারের এই বিষয় গতকাল শনিবার মুজিবুর রহমান নিজে এক ফেসবুক পোস্টে জানান। তাতে তিনি লিখেছেন, ‘গতকাল শুক্রবার রাত সাড়ে সাতটার দিকে জামায়াতে ইসলামীর আমির মকবুল আহমাদের পক্ষ থেকে নির্বাহী পরিষদের একজন সদস্য আমাকে জানান যে, আমার দলীয় সদস্যপদ বাতিল করা হয়েছে।’

মুজিবুর রহমান জানান, তিনি ১৯৮৮ সালে ছাত্রশিবিরে ও ২০০৪ সালে জামায়াতের রাজনীতিতে যোগ দেন। বিভিন্ন সময় তিনি দলের অভ্যন্তরীণ কিছু বিষয়ে তাঁর মতভিন্নতার কথা প্রকাশ করেন। আবদুর রাজ্জাকের মতো তিনিও মনে করেন, একাত্তর সালে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করার জন্য দেশের মানুষের কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত। তিনি এ-ও মনে করেন, জামায়াতের ক্ষমা না চাওয়া ছিল বড় রকমের রাজনৈতিক ভুল এবং এ বিষয়ে দলের অবস্থান অস্বচ্ছ ও বিভ্রান্তিকর।এই অবস্থায় সংস্কারপন্থীরা চাপে পড়ে গেল কি না—জানতে চাইলে মুজিবুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘চাপে পড়েছি বলে মনে করি না। কারণ, আমি যে কথাগুলো বলেছি, তা দলের অনেকের মনের কথা। কিন্তু পরিস্থিতির কারণে তাঁরা বলতে পারেন না। আমি মনে করি, জামায়াত একদিন বাস্তবতা উপলব্ধি করবে।’

বহিষ্কার হওয়ার আগের দিন ১৪ ফেব্রুয়ারি মুজিবুর রহমান তাঁর ফেসবুক পেজে ‘দীর্ঘ ফোনালাপ ফাঁস...’ শিরোনামে একটি স্ট্যাটাস দেন। তাতে তিনি লেখেন, ১৯৭১ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধে জামায়াত অংশ নেয়নি, বরং বিরোধিতা করেছে। এটা কি জামায়াত সঠিক করেছে? না ভুল করেছে? তারা বিষয়টির সুরাহা না করে জামায়াত বিভিন্ন সময়ে বক্তৃতায় বিভিন্ন কথা বলেছে। যেমন মরহুম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বাধীন বাংলাদেশের ‘স্বপ্নদ্রষ্টা’ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের ‘জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান’ হিসেবে স্বীকার করে নিয়েছে। অথচ মুক্তিযুদ্ধকালে তাদের বিবেচনায় শেখ মুজিব ছিলেন ‘ষড়যন্ত্রকারী’, ‘দেশদ্রোহী’ এবং মুক্তিযোদ্ধারা ছিলেন ‘ভারতের দালাল’।

মুজিবুর রহমান আরও লেখেন, ‘একই নেতৃবৃন্দের কাছে আমরা কখনো শুনি, মুক্তিযুদ্ধকালীন আমাদের ভূমিকা ছিল আবেগনির্ভর ও বাস্তবতাবিবর্জিত। আবার কখনো তাঁরা বলেন, একাত্তরে আমরা যে ভূমিকা নিয়েছিলাম, তা যে সঠিক ছিল, এখন জাতি বুঝতে পারছে। মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গে মুরব্বিদের মুখ থেকে দুই ধরনের পাঠ পাওয়াটা খুবই দুর্ভাগ্যজনক। এতে বোঝা যায় তাঁরা পরিস্থিতি বুঝে একবার এক রকম বলছেন, দলের সুস্পষ্ট কোনো স্ট্যান্ড নেই।’

মুজিবুর রহমানের মতে, জামায়াত যদি ’৭১ সালের ভূমিকার জন্য দুঃখ প্রকাশ করত, ক্ষমা চাইত এবং দলীয় কর্মীদের সে বিষয়ে দীক্ষা দিত, তাহলে কোনো সমস্যা ছিল না। অবশ্য গতকালের ফেসবুক স্ট্যাটাসে মুজিবুর রহমান যুদ্ধাপরাধের দায়ে ফাঁসি হওয়া জামায়াত নেতাদের ‘শহীদ’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, ‘শত শত শহীদের রক্ত একদিন কথা বলবে।’

মুজিবুর রহমান লিখেছেন, ‘জামায়াতে রাজনৈতিক সংস্কারের যৌক্তিকতা, ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতাযুদ্ধে ভূমিকা প্রসঙ্গে আমার সুস্পষ্ট মত ছিল যে জামায়াতে প্রয়োজনীয় সংস্কার না হলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে জামায়াতের ভবিষ্যৎ অন্ধকার। আমার এরূপ খোলামেলা মত নিয়ে জামায়াতের সম্মানিত নেতৃবৃন্দের মধ্যে বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি হয়।’

আবদুর রাজ্জাকের পদত্যাগের বিষয়ে শুক্রবার জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল শফিকুর রহমান দ্রুত গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে দলের প্রতিক্রিয়া জানান। তবে গতকাল মুজিবুর রহমান তাঁর সদস্যপদ বাতিলের ব্যাপারে ফেসবুকে যে বক্তব্য দিয়েছেন, সে ব্যাপারে দল কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি। প্রথম আলোর পক্ষ থেকে যোগাযোগের চেষ্টা করেও কাউকে পাওয়া যায়নি।

ইউনিয়ন নেতার পদত্যাগ
প্রথম আলোর বিরামপুর (দিনাজপুর) প্রতিনিধি জানান, দিনাজপুরের খানসামা উপজেলার ভেড়ভেড়ী ইউনিয়ন জামায়াতের সাধারণ সম্পাদক বখতিয়ার উদ্দীন দল থেকে পদত্যাগ করেছেন। তিনি গতকাল উপজেলা জামায়াতের আমিরের কাছে পদত্যাগপত্র পাঠান।

পদত্যাগপত্রে বখতিয়ার উদ্দীন বলেছেন, বিভিন্ন গণমাধ্যমে ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাকের পদত্যাগের খবর দেখে তিনি বুঝতে পারেন যে জামায়াতে ইসলামী স্বাধীনতাবিরোধী দল। তাই এ দেশের নাগরিক হয়ে দেশের স্বাধীনতাবিরোধী দলের সঙ্গে থাকতে চান না। তিনি জামায়াতকে জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানান।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন